শিশুর মাত্রাতিরিক্ত চঞ্চলতা

শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯

ডা. লুনা পারভীন

‘আপা, বইলেন না, এই বাচ্চা নিয়া যে কি পেরেশানিতে আছি। ঘরের সব কাচের জিনিস, ছুরিকাঁচি, দামি জিনিস লুকায়ে রাখতে হয় না হলে হাতের নাগালের বাইরে রাখি। তাও চেয়ার দিয়া নামায়া আনে। ঘরে যাও চড়-থাপ্পড় দিয়া সামলায়া রাখি, কারো বাসায় গেলে লজ্জায় পড়তে হয়। কি ধরবে, কি ভাঙবে, অস্থির করে ফেলে। পরিচিত কেউ সহজে এখন আর দাওয়াত দিতে চায় না, স্কুলের টিচাররা কমপ্লেইন করে। চিকিৎসার কথা বলেন? শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমারে দোষ দেয়, আমি বলে বাচ্চা সামলাইতে পারি না, এ বয়সে বাচ্চারা নাকি এমন করেই, আমি খারাপ তাই বাচ্চারে পাগলের চিকিৎসা করাইতে চাই। কত কষ্ট কইরা মিথ্যা বইলা যে হাসপাতালে আনছি দেখাইতে?’

এটাই বাস্তব চিত্র। সবাই মনে করে একটা বয়সে বাচ্চারা চঞ্চল থাকবেই কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত চঞ্চলতা যে শিশুর এক ধরনের আচরণগত সমস্যা যা চিকিৎসা না করালে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে তা তারা বুঝতে চান না। আসলে এই অতিচঞ্চলতা বা হাইপার এক্টিভিটি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক না যা অঃঃবহঃরড়হ উবভরপরঃ ঐুঢ়বৎধপঃরারঃু উরংড়ৎফবৎ (অউঐউ) নামের একটা রোগের লক্ষণ।

অউঐউ কি? কেন হয়?

এটা শিশুর মানসিক বিকাশগত সমস্যা যার কারণ নির্দিষ্ট নয়। ধরে নেয়া হয় এটা জিনগত ও পরিবেশের প্রভাবও বিদ্যমান। বাবা-মায়ের যে কারো অউঐউ থেকে থাকলে বাচ্চার বেলায় ৫০% চান্স আছে এ রোগ হওয়ার। সাধারণত মেয়েদের চেয়ে ছেলে বাচ্চাদের বেশি হয় (৪ঃ১)। এ ছাড়া মস্তিষ্কের রোগ, থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য, গর্ভকালীন মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা, বিষাক্ত কেমিক্যাল, কীটনাশক, লোহা ও সিসার সংস্পর্শে আসা, অপুষ্ট ও সময়ের আগে বাচ্চা হলেও পরবর্তী সময়ে এই রোগ হতে পারে। ৭-১২ বছর বয়সের আগে বেশিরভাগ বাবা-মা’ই বুঝতে পারে না, সময়ে ঠিক হয়ে যাবে মনে করে নেন।

কি দেখে বুঝবেন বাচ্চার অউঐউ আছে?

এ রোগের তিনটা ধরন থাকে।

১. শুধুই অমনোযোগিতা

২. অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও অযাচিত আচরণ

৩. উপরের দুটোই একসঙ্গে হওয়া, যা বেশির ভাগ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

লক্ষণসমূহ :

১. নিজের মনমতো কাজ করা ও নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেয়া।

২. কোনো কাজ সুশৃঙ্খলভাবে না করা ও শেষ পর্যন্ত লেগে না থাকা। দ্রুত মনোযোগ সরে যাওয়া।

৩. হঠাৎ করে রেগে যাওয়া, জিদ করা বা বিষণœ হয়ে যাওয়া কারণ ছাড়াই।

৪. এক জায়গায় স্থির হয়ে না বসা, সারাক্ষণই ছুটোছুটি করা।

৫. চুপচাপ কোনো কাজ না করা, অযথাই চিৎকার করা, অপ্রয়োজনে ও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা। অন্যের কথার মাঝে কথা বলা ও তাদের কথায় কান না দেয়া।

৬. যেভাবে করতে বলা হয় তা মেনে না নেয়া, গুছিয়ে কোনো কাজ না করতে পারা, প্রায়ই কাজে ভুল করা যেমন, হোমওয়ার্ক না করা, জিনিসপত্র হারানো।

৭. কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা, উদাস হয়ে যাওয়া, অবাস্তব কল্পনা করা, অন্যদের এড়িয়ে চলা বা মিশতে না পারা, হঠাৎ মারামুখি হওয়া।

অটিজম আর অউঐউ কি একই রোগ?

না, দুটো একই রোগ না। অটিজমে অমনোযোগিতা, সঙ্গবিমুখ হওয়া, কমান্ড ফলো না করার মতো কিছু লক্ষণ আছে অউঐউ এর মতো, তবে তা অটিজমের অংশ নয়।

রোগ নির্ণয়ের উপায় :

মাত্রাতিরিক্ত ও ধ্বংসাত্মক চঞ্চলতাকে অবহেলা বা প্রশ্রয় না দিয়ে তার মধ্যে রোগের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে নিকটস্থ শিশু বিকাশ কেন্দ্র বা নিউরোলজির বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

বিভিন্ন আচরণগত, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও বিকাশের ধাপগুলো যাচাই করেই তাকে রোগী বলা হবে, অযথা নয়।

চিকিৎসা না করালে কি ক্ষতি?

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হলে বাচ্চা ঠিক হয়ে যাবে এমন আশা করে লাভ নেই। কারণ ৩০%-৭০% ক্ষেত্রে এ রোগ বড়বেলাতে দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। এরা পরিবারে, সমাজে, কার্যক্ষেত্রে কোথাও খাপ খাওয়াতে পারে না।

চিকিৎসা :

অতিরিক্ত চঞ্চলতা কমানোর জন্য ওষুধ দেয়ার আগে কিছু উপায় আছে যা পালনে এ রোগ আস্তে আস্তে ভালোও হয়ে যেতে পারে। যেমন,

১. বাচ্চার এনার্জিকে ভালো কাজে লাগানো, যেমন, সাঁতার কাটা, সাইক্লিং করা, ক্যারাটে বা মার্শাল আর্ট শেখানো।

২. সহজ ভাষায় বাচ্চাকে বুঝাতে হবে, অল্প কথায় কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে। তার মেজাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সহানুভূতির সঙ্গে তাকে শেখাতে হবে।

৩. ছোট ছোট কাজের লিস্ট দিতে হবে যাতে সে অল্প সময়ে মনে করে সব কাজ করতে পারে এবং সময় বেঁধে দিতে হবে। কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারলে তাকে প্রশংসা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।

৪. ঘরে টিভি, ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে বাইরে খোলা মাঠে সবুজ প্রকৃতিতে খেলতে দিতে হবে।

৫. হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে গেলে মনোযোগ সরিয়ে নেয়া, জোরে জোরে শ্বাস নিতে বলা এবং সহানুভূতির সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

৬. স্কুলে টিচার, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে যেন ক্লাসে ওর দিকে মনোযোগ দেয়া হয়, ওকে পড়া তৈরি করতে সাহায্য করা, প্রশংসা করা, কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা সবই স্কুল ও বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিয়ে পালন করতে হবে।

খাবারের সঙ্গে অউঐউ এর সম্পর্ক :

সাধারণত গম, ভুট্টা, চকোলেট, টমেটো, আঙুর, সিমজাতীয় খাবার দিতে মানা করা হয়। চিনি বা কোনো এলার্জিক খাবারের সঙ্গে অউঐউ বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক গবেষণায় বলা হয় যে, ভিটামিন বি, সি, ডি-থ্রি, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড, ম্যাগনেসিশান জাতীয় ভিটামিন ও মিনারেলস ভালো কাজ দেয় চিকিৎসায়।

আমাদের দেশে কি চিকিৎসা আছে?

বাইরের দেশে এসব বাচ্চার জন্য আলাদা স্কুল, হসপিটাল, চিকিৎসক এমনি কি পরিচর্যাকারী, শিক্ষক নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে চিকিৎসা করা হয়। আমাদের দেশে গুটিকয়েক স্কুল, ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রতিটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র আছে যেখানে অভিজ্ঞ চাইল্ড নিউরোলজিস্ট এদের চিকিৎসা ও থেরাপি দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া এসব বাচ্চার অভিভাবককেও কাউন্সেলিং করা হয় প্যারেন্টিং বা কীভাবে এদের সঙ্গে কথা বলবে, মেজাজকে সামলে চলবে ও বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। স্কুলে শিক্ষকদেরও ট্রেনিং দেয়া হয় কীভাবে অল্প পড়া দিয়ে, চাপ না দিয়ে সহজ ভাষায় এদের পড়াতে হবে।অনেক সময় থেরাপিতে উন্নতি না হলে, মুখে ওষুধ খেতে দেয়া হয়।

শিশুর মাত্রাতিরিক্ত ধ্বংসাত্মক চঞ্চলতাকে স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাবেন না। বরং একে প্রশ্রয় না দিয়ে একটু সচেতন হওয়া।

শিশু বিশেষজ্ঞ

আবাসিক মেডিকেল অফিসার

বহির্বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল

শ্যামলী।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj