দেশীয় টিভি চ্যানেল থাকবে না হারিয়ে যাবে

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯

আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস। ১৯২৬ সালের এই দিনে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি (লজি) বেয়ার্ড (ঔড়যহ খড়মরব ইধরৎফ) টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। যদিও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই কয়েকজন বিজ্ঞানীর গবেষণা এবং মৌলিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে টেলিভিশন আবিষ্কারের পথ তৈরি হতে থাকে এবং ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর সফলতা পায়। দিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত এক ফোরামে ২১ নভেম্বরকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘এই যে আকাশ নীল হল আজ/এ শুধু তোমার প্রেম’ গানটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে। সে সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো ডিআইটি ভবন, বর্তমানের রাজউক ভবন থেকে। নাম ছিল পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন। চলতি শতকের শূন্য দশকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত টেলিভিশননির্ভর বিনোদনের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করত বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি। তবে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সে সময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিলে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। সত্তরের দশকে সারাদেশে যেখানে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি টিভি সেট ছিল, বর্তমানে সেখানে ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত টিভি সেটের সংখ্যাই প্রায় ৪ কোটি। এ খাতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে লক্ষাধিক মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের। সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের ভোক্তা বাজারের বাংলাদেশে টেলিভিশন খাতের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদীয়মান অর্থনীতি ও শিল্পায়নের এ সময়ে পণ্যের পরিচিতি ও ব্র্যান্ড তৈরিতে টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, পণ্যের প্রচারে টেলিভিশনের ওপর উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরতাও বাড়ছে।

টিভি চ্যানেলের আয়ের উৎস দুটি। ১. সাবসক্রিপশন বাবদ আয়। এবং ২. বিজ্ঞাপন বাবদ আয়। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো সাবসক্রিপশন বাবদ কোনো টাকা পায় না। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় চ্যানেলের আয় শতভাগ বিজ্ঞাপননির্ভর। কিন্তু নানান কারণে বিজ্ঞাপনের বাজার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। দেশের ভোক্তাবাজার বড় হলেও নিয়ন্ত্রণ করছে গুটি কয়েক বড় বড় শিল্প গ্রুপ। এই শিল্প গ্রুপগুলোর অধিকাংশের আবার টিভি চ্যানেলের মালিকানা রয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রচার বাবদ নির্ধারিত বাজেটের একটি বড় অংশই নিজের চ্যানেলে দিচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে অন্যান্য চ্যানেল। আবার চ্যানেলের মালিকানা নেই এমন অন্যান্য বড় কোম্পানি তাদের পণ্যের প্রচারে বিনিয়োগ বাড়ালেও যে হারে চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে তার তুলনায় পণ্যের প্রচারে বিনিয়োগ বা বাজেট বেড়েছে খুবই নগণ্য। আগে যে টাকা ৫টি চ্যানেল পেত, সেই টাকা এখন ভাগ হয়ে যাচ্ছে ৩৪টি চ্যানেলে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশের ভোক্তাদের টার্গেট করে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। অথচ ‘ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন ২০০৬’ ১৯ ধারার ১৩ উপধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, দেশের মানুষকে লক্ষ্য করে ভিনদেশি কোনো চ্যানেলে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও আইনের আওতায় আনার নজির দেখছি না। এ রকম নানান কারণে দেশের চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনের বাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, চ্যানেলগুলোর আয় কমছে। যার অনিবার্য অভিঘাত হিসেবে চ্যানেলগুলো ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে, কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

বহুমুখী সংকটের ঘেরাটোপে আটকে পড়া দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচাতে হলে এর বিজ্ঞাপনের বাজারকের যেমন সুরক্ষা দিতে হবে, তেমনি চ্যানেলগুলোর আয় কেবল বিজ্ঞাপননির্ভর না রেখে আয়ে বৈচিত্র্য আনতে হবে। এর জন্য যে উদ্যোগগুলো নেয়া দরকার : প্রথমত, ফ্রি চ্যানেলের ধারণা থেকে বেরুতে হবে। এ ছাড়া বিতরণ ডিজিটাইজকরণ; বিজ্ঞাপন নীতিমালায় গুরুত্ব দেয়া; সাবসক্রিপশন ফি বৈষম্য দূরীকরণ; বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ; দেশীয় চ্যানেলে বিদেশি কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ; অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য ও মানবৃদ্ধি করা; আইনের প্রয়োগ; দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপক বন্দোবস্ত করতে হবে এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের যে ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অস্বীকার করলে বরং সংকট আরো গভীর হবে। সমাজতাত্তি¡ক ও গবেষকরা মনে করছেন এই অবক্ষয়ের পেছনে বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে, আমরা আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোকে ভিনদেশি টিভি চ্যানেল আর ডিজিটাল প্লাটফর্মের আগ্রাসনের মুখে ছেড়ে দিয়ে তামাশা দেখব না-কি নিজেদের সভ্যতা, সমাজ, শিল্প-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির স্বতন্ত্র বিকাশের স্বার্থে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার পদক্ষেপ নেব। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে টেকাতে না পারলে, সঠিক পথে বিকাশের সুযোগ করে দিতে না পারলে, দর্শকদের দেশীয় টিভি চ্যানেলের প্রতি আকৃষ্ট করতে না পারলে; দেশের শিল্প-সংস্কৃতি-কৃষ্টি যেমন পথ হারাবে, তেমনি অনিশ্চিয়তার মুখে পড়বে এ খাতের ওপর প্রত্যক্ষ নির্ভরশীল ১৪-১৫ হাজার কর্মী, জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ।

সৈয়দ আশিক রহমান : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, আরটিভি।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj