বিশ্ব বিবেকে মানবিক মূল্যবোধ জেগে উঠুক

বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এসব নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এসব নীতির ভিত্তিতে। পৃথিবীতে আজ আধুনিক বিশ্বের সভ্যতার জয়জয়কার। এ সভ্যতারও একদিন পতন হয়ে যাবে যদি বিশ্ব বিবেক মানবিক মূল্যবোধহীন হয়ে পড়ে। বিশ্ব বিবেকে মানবিক মূল্যবোধ জেগে উঠুক- শেখ হাসিনা ন্যাম সম্মেলনের ভাষণেও সে মেসেজটি দিয়েছেন। বাংলাদেশ আজ বিভিন্ন পর্বের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। আবার এই এগিয়ে চলার মধ্যে নানা শঙ্কাও কাজ করছে। তাই সমন্বিত সৃজনমুখী আন্দোলনের ওপর জোর দিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। আগ্রাসী মনোভাব দূর করে মানুষকে আরো শান্তিপ্রিয় হয়ে উঠতে হলে কী পদক্ষেপ নিতে হবে সে মূলমন্ত্রকে প্রতিপাদ্য বিষয় করেই ন্যাম সম্মেলন সমাপ্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক বার্তা বহন করেই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে অংশগ্রহণ করে আসছেন। ন্যাম সম্মেলনেও এর ব্যতিক্রম করেননি। তিনি তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রোহিঙ্গা সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট। এ সংকট যে কেবল বাংলাদেশের সংকট না, তার ব্যাখ্যাও প্রদান করেন। তার বক্তৃৃতায় উঠে আসে যে এ সংকটের জন্য মিয়ানমারই দায়ী। তাই এর সমাধানও মিয়ানমারের হাতেই রয়েছে। এমনকি রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মিয়ানমারের প্রতি ন্যায়সঙ্গত চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান। রোহিঙ্গা সংকট যদি সম্মানজনকভাবে সমাধান না হয়, তবে বাংলাদেশের বাইরেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যার প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দায় খুবই নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে।

সম্প্রতি ন্যাম সম্মেলনে সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মাহাথির মোহাম্মদ, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি ও নেপালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ভিন্ন ভিন্ন বৈঠকগুলোতে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করেন। মানবিক কারণে মিয়ানমারের প্রায় ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেন। কিন্তু আশ্রয়দানের ফলে বাংলাদেশ যে চরম সংকটে নিপতিত হয়, তা অনেকটাই অভাবনীয়। আজকের বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের যদি মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণভাবে পাঠানো না যায়, তবে সুদূরপ্রসারী একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রভাবে সারা বিশ^ই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা নিশ্চিত বলা যায়। এ বোধ থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য কামনা করে আসছেন বিভিন্ন ফোরামের বৈঠকে। তিনি সদ্যসমাপ্ত জাতিসংঘ অধিবেশনেও এ বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন, যা সারা বিশ্বের নেতাদেরও গ্রহণ করেছেন।

মিয়ানমার এক সময় পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধিশালী দেশ ছিল। ভারতবর্ষের মানুষ রেঙ্গুনে কর্মসংস্থান করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করত। সেই মিয়ানমার প্রায় ৭০ বছরের বেশি সময় টানা সামরিকতন্ত্রে দেশ পরিচালিত হয়ে আসছিল। এমনকি অং সান সু কির নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিকতন্ত্রেরই আধিপত্য। গণতন্ত্রের মোড়কে সামরিক আইনই বলবত রয়েছে মিয়ানমারে। দীর্ঘকাল বিশ্ব বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্র ছিল মিয়ানমার। তবে বর্তমানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকলেও তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পররাষ্ট্রনীতি আছে বলে মনে হয় না। যদি থাকত, তবে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সসম্মানে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিক মর্যাদা দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমাজ গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চাইত। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসামান্য এক সৃজন-প্রতিভাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যিনি তার আপন সত্তায় বাংলাদেশের সংস্কৃতি, দর্শন ও বাঙালি জাতীয়তাবোধের বৈশিষ্ট্যকে সামগ্রিকভাবে মূর্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ব দরবারে।

তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে মানব-প্রগতি সম্বন্ধে সার্বিক বিষয়টিকেও স্থান দেয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা জনগণ কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা প্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কী ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি জনকল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সেটি স্থান পেয়েছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এটাকে নতজানু নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুস্থ ও সফল সমাজ গড়তে হলে সঙ্ঘবদ্ধ ও সমবায়ী মনোবৃত্তির প্রয়োজন রয়েছে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব নিয়ে কোনো সমৃদ্ধি আসবে না- শেখ হাসিনা বিভিন্ন ফোরামে সে বার্তাই দিয়ে যাচ্ছেন। সম্পূর্ণ একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনটি মূল্যবোধ জাগাতে কাজ করতে হবে। এ তিনটি মূল্যবোধ হচ্ছে প্রচুর কাজ, দক্ষ কাজ ও সম্মিলিত কাজ। নারী-পুরুষকে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তিমূলক যৌথ আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রাচারে মনোযোগী হওয়ার উৎসাহ ও প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোনো দেশের জাতীয় নীতির একটি অংশ হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রের জাতীয় নীতির যে অংশটুকু বহির্বিশে^র সঙ্গে সুদৃঢ় ও ন্যায় ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মানবীয় স্বার্থগুলো সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়, সেটাই পররাষ্ট্রনীতি। আধুনিক বিশ্ব সভ্যতায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল কিন্তু শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবলে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে এবং বিশ্বের আরো বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ এই ¯েøাগানকে সামনে রেখে বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটাই জাতির প্রত্যাশা।

রায়হান আহমেদ তপাদার

রায়হান আহমেদ তপাদার : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj