বেসিকের টাকার হদিস নেই, বাচ্চুকে ‘বাঁচানোর’ চেষ্টা!

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯

আর্থিক খাতে তোলপাড় সৃষ্টিকারী কয়েকটি ‘পুকুর চুরি’র ঘটনা এখনো অমীমাংসিত। দায়ী ব্যক্তিরা সাজা পায়নি। ক্ষতিগ্রস্তরাও পায়নি কোনো ক্ষতিপূরণ। এই নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন

মরিয়ম সেঁজুতি : রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির যিনি প্রধান অভিযুক্ত, তার বিরুদ্ধে ৯ বছরেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)! যদিও ঋণ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও নিরীক্ষা প্রতিটি পর্যায়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর নাম এসেছে। প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তিনিই নাটের গুরু। এদিকে দুদকের ৬১ মামলায় কারাগারে আছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা। দুদক বলছে, ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংকটির টাকা এখনো খুঁজছে কমিশন। তদন্ত বা অনুসন্ধানে তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। বিভিন্ন স্তরে টাকার লেয়ারিং হওয়ায় সমাধানে সময় লাগছে।

জানা গেছে, ২০০৯ সালে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান করে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে সরকার। সে সময় এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কাজী ফখরুল ইসলামকে। ওই সময় থেকে মডেল এই ব্যাংকটিতে দুর্নীতি বাসা বাধতে থাকে। ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকটির ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আবদুল হাই বাচ্চু। চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত (চার বছর তিন মাসে) ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়। আর তখনই ব্যাংকটির দিলকুশা, গুলশান ও শান্তিনগর শাখা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়। ঘটনা ঘটার চার বছর পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়। প্রথমে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে শোকজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে ওই বছরের ২৯ এপ্রিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ভেঙে দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বিতর্কিত চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপর বিভিন্ন মহলের সমালোচনা এবং উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পাঁচ দফা বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। এরপর ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর আরেকটি মামলা করে দুদক। রাজধানীর বংশাল থানায় দায়ের করা ওই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সাত কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এ পর্যন্ত রাজধানীর তিনটি থানায় ১৫৬ জনকে আসামি করে সর্বমোট ৬১টি মামলা করেছে কমিশন।

দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান ও তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে কমিশন নিয়ে সমালোচনা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনার মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করে চার্জশিট দিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করেছে দুদক। তবে গত গত ১৫ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সাংবাদিকদের জানান, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর জড়িত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দুদক বলছে, ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংকটির টাকা এখনও খুঁজছে কমিশন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকটির পর্ষদে একজন বাজে লোককে চেয়ারম্যান পদে বসানোর কারণে এই ব্যাংকটি এখন সবচেয়ে খারাপ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। বেসিক ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আলম বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে ব্যাংকে যারা অনিয়ম করেছেন, আমরা তাদের চিহ্নিত করেছি। এখন ওইসব ঋণ আদায়ের চেষ্ট চলছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বেসিক ব্যাংক পরিদর্শন করে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। ওই দিন তিনি সাংবাদিকদের জানান, এক সময় বেসিক ব্যাংক ভালো ব্যাংক ছিল। অথচ ব্যাংকটি এখন তলানিতে পৌঁছেছে। এখন আপনাদের (কর্মকর্তাদের) সামনে দুটি অপশন আছে চালু রাখা অথবা বন্ধ করা। সরকার ও দেশের জনগণ যেখানে মালিক, সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান বসে যাক, সেটা কেউ চাইবে না।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj