গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা : নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতে সুষ্ঠু বণ্টন ও সুশাসনের অভাব

সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : নিরাপদ পানি সরবরাহ ও মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশে পর্যাপ্ত আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা সর্বোপরি সুশাসনের অভাবে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের অর্জন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। তবে টেকসই উন্নয়ন ‘অভীষ্ট ছয়’ অর্জনে ক্রমবর্ধনশীল বৈষম্য, প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস, পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

গতকাল রবিবার দুপুরে ভোরের কাগজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে ওয়াটার ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্কের (ডব্লিউআইএন) সহায়তায় এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ ও ভোরের কাগজ যৌথভাবে আয়োজিত ‘ওয়াশ গভর্নেন্স এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

প্রসঙ্গত, টেকসই উন্নয়নে ২০৩০-এর ১৭টি অভীষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘অভীষ্ট-৬’, যার উদ্দেশ্য হলো- সবার জন্য নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের নির্বাহী পরিচালক এস এম এ রশীদ। বক্তব্য রাখেন সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড. আনোয়ার জাহিদ, ভিইআরসির নির্বাহী পরিচালক মো. ইয়াকুব হোসেন, এসআইএমএভিআইয়ের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর অলোক মজুমদার, ইউএসটির নির্বাহী পরিচালক শাহ মো. আনোয়ার কামাল, ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুর-এর পরিচালক মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান, ব্র্যাকের মো. রফিকুল ইসলাম, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের পরিচালক (পলিসি এডভোকেসি) ড. আবদুল্লাহ আল মুয়িদ, টিআইবির এম জাকির হোসেন খান, ওয়াটার ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্কের কনসালট্যান্ট সিফাত-ই-রাব্বি প্রমুখ।

মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আগে পানির প্রাপ্যতাকে গুরুত্ব দেয়া হতো। এখন আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি নিরাপদ পানি প্রাপ্যতাকে। অর্থ বরাদ্দের চেয়ে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অপচয়। অপচয় রোধ এবং এ ক্ষেত্রে জনগণকে আরো বেশি সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

শ্যামল দত্ত বলেন, এসডিজিতে সবার জন্য নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ওয়াটার গভর্নেন্স একান্ত অপরিহার্য। তবুও অনেক দেশেই ওয়াশ গভর্নেন্স কাঠামো সবল এবং সমন্বিত নয়। এ জন্য শক্তিশালী ওয়াশ গভর্নেন্সের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।

সাইফুর রহমান বলেন, দেশের ৬১টি জেলায় আর্সেনিক সমস্যা রয়েছে। অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, আর্সেনিক সমস্যা সমাধান, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং গ্রামীণ এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে সরকার বড় বড় বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি সহায়তায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। শিগগিরই এসব প্রকল্প একনেকের সভায় পাস হতে যাচ্ছে।

এস এম এ রশীদ বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যে প্রক্রিয়ায় সেবা দেয়া উচিত তা তারা দিতে পারছে না। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে এখনো আমরা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে সবার কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে পারছি না।

ইয়াকুব হোসেন বলেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশে পর্যাপ্ত আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে এসডিজি অর্জন করতে হলে এখন থেকেই পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। আর্সেনিক সমস্যার সমাধান এবং এ ক্ষেত্রে আরো বেশি বাজেট বরাদ্দের পরামর্শ দেন তিনি।

অলোক মজমুদার বলেন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হলে ওয়াটার গভর্নেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় ও আন্তঃবিভাগের সমন্বয় দরকার।

সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেশি সমন্বিতভাবে একসঙ্গে কাজ করার দরকার বলে মন্তব্য করেন শাহ মো. আনোয়ার কামাল। মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান বলেন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ওয়াটার গভর্নেন্স একান্ত অপরিহার্য। গভর্নেন্স এবং এসডিজির মধ্যে সমন্বয় দরকার।

মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিতে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। তবে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কী কাজ করছে এই জবাবদিহিতার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গবেষণারও প্রয়োজন আছে।

ড. আবদুল্লাহ আল মুয়িদ বলেন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশে পর্যাপ্ত আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে এসডিজির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগুলোর পরিবর্তন প্রয়োজন। এই জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন এনজিওর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা এসডিজি অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এম জাকির হোসেন খান বলেন, সমন্বয়ের পাশাপাশি আমাদের এই সেক্টর থেকে দুর্নীতি দূর করতে হবে। দুর্নীতি থাকলে পানির প্রাপ্যতা আরো বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ডিজিটাল গভর্নেন্সের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

আনোয়ার জাহিদ বলেন, কোন এলাকায় কোন প্রযুক্তিতে কাজ করলে সুফল পাওয়া যাবে সে বিষয়ে আমাদের এখন ধারণা আছে। পর্যাপ্ত তথ্যও রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে এবং সেই মাফিক বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj