এই প্রাণহানির দায় কার : চট্টগ্রামে ভবনে বিস্ফোরণে নিহত ৭

সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

বিধি মেনে ভবন নির্মিত হয়নি। গ্যাসের রাইজার রাস্তার সঙ্গে লাগানো >>

সমরেশ বৈদ্য, চট্টগ্রাম অফিস : গ্যাসের লাইনের প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের দায় কার? কার অবহেলা ও দায়িত্বহীনতায় ঝরে গেল সাতটি তাজাপ্রাণ। চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিধি মেনে ভবন নির্মিত হয়নি। গ্যাস পাইপলাইনের রাইজারও ছিল রাস্তার সঙ্গে লাগানো। গাড়ি চলাচলের সময় কাঁপুনিতেও গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে কেজিডিসিএল বলছে, গ্যাসলাইন লিকেজ বা বিস্ফোরণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরই ভবন ‘গ্যাস চেম্বার’ হওয়ার কারণ জানা যাবে।

চট্টগ্রাম নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ পাথরঘাটা এলাকার গ্যাসলাইন থেকে লিকেজ হওয়া গ্যাসে আগুন ধরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে দেয়াল ধসে শিশু-নারীসহ ৭ জন মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। আহত হন আরো কমপক্ষে ১০ জন। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল রবিবার সকাল ৯টার দিকে নগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের পাঁচতলা ভবন ‘বড়–য়া ভবন’র নিচতলায় বিস্ফোরণের এই ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- কক্সবাজারের উখিয়ার (রং মিস্ত্রি) নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়ার মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়–য়া (৪০), পাথরঘাটার ফারজানা আক্তার (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮), পটিয়ার রিকশাচালক আব্দুর শুক্কুর, মহেশখালী ভ্যানচালক মো. সেলিম। একজনের নাম পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে বড়–য়া ভবনের নিচতলার দেয়াল ও সীমানা প্রাচীর ধসে রাস্তার ওপর পড়লে পথচারী ও চলতিপথের যাত্রীরাই হতাহত হন। ওই ভবনের পাশাপাশি উল্টো দিকের জসীম বিল্ডিংয়ের নিচতলার দোকানও বিস্ফোরণের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে আশপাশে বেশ কয়েকটি ভবনের জানালার কাচ ভেঙে গেছে। বড়–য়া ভবনের দুপাশের ভবনের সীমানা প্রাচীরও ভেঙে যায়। ঘটনাস্থলের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন বাড়ি কেঁপে ওঠে। বিস্ফোরণের সময় রাস্তায় প্রচুর মানুষ আর রিকশা ছিল।

পাঁচতলা বড়–য়া ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন প্রয়াত ধর্মপ্রাণ বড়–য়া। বিল্ডিংয়ের বর্তমান মালিক অমল বড়–য়া ও টিটু বড়ুয়া থাকেন ভবনের পঞ্চম তলায়। নিচতলার বাসিন্দা সন্ধ্যা রানী দেবী, তার ভাতিজি অর্পিতা নাথ ও ভাতিজা অর্ণব নাথ। নগরীর মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অর্ণব ঘটনার সময় সকালের নাশতা আনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এ সময় নগরীর অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী অর্পিতা পড়ছিল। আর সন্ধ্যা রানী পূজা দিচ্ছিলেন। অর্পিতা দেয়াশলাই জ্বালালে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। চমেক বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক জানিয়েছে, অর্পিতার ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে এবং শ^াসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসে ভর্তি হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বড়–য়া বিল্ডিংয়ের নিচতলার একটি রুম বিশাল গ্যাস বোমায় তৈরি হয়েছিল। আর সেখানে ম্যাচের কাঠি জ্বালাতেই বিকট শব্দে গ্যাস চেম্বারটির বিস্ফোরণে মর্মান্তিকভাবে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (চউক) আরো অনেকেই বলছেন গ্যাসের পাইপলাইন থেকেই লিকেজ হয়ে নিচতলার ওই রুমটি গ্যাসপূর্ণ বিস্ফোরকে পরিণত হয়। তা ছাড়া ভবনটি নির্মাণ করার ক্ষেত্রে চউকের নির্ধারিত নকশা অনুসরণ করা হয়নি। পাশাপাশি গ্যাস পাইপলাইনের রাইজারও ছিল রাস্তার সঙ্গে লাগানো। গাড়ি চলাচলের সময় কাঁপুনিতেও গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তা ছাড়া পাইপগুলোও দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ। রাস্তার সঙ্গেই গ্যাস পাইপলাইনের রাইজার, রান্নাঘর ও ভবনটির সেফটিক ট্যাঙ্ক- সব কিছু মিলিয়ে পুরো ভবনটিই দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ মো. আবদুর রউফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আহতদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে ওই বাসায় কোনোভাবে গ্যাস জমেছিল। সে কারণেই বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে।’ একই ধরনের কথা বলেছেন ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দী। তিনি বলেন, হয়তো রাইজারে কোনো সমস্যা ছিল, হয়তো লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়ে জমে গিয়েছিল। সকালে বাসায় কেউ আগুন ধরালে তাতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তা ছাড়া ওই ভবনের তিনতলাতেও গ্যাসের গন্ধ পেয়েছি। তার মানে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে বলেই মনে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জসীম উদ্দিনও ভোরের কাগজকে বলেন, গ্যাস লাইনটি অনেক পুরনো, জরাজীর্ণ ছিল। ওই লাইনে লিকেজ থাকায় ভবনের একটি ঘরে গ্যাস চেম্বার হয়ে যায়। দেয়াশলাই জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর ভবনের দুটি বাসার দেয়াল, ভবনের সীমানা দেয়াল, গেট ছিটকে অন্য ভবনে গিয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে দেয়ালের বিভিন্ন স্পিøন্টারের মতো কাজ করেছে। তিনি বলেন, এরপরও পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।

চউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান ভোরের কাগজকে বলেন, ভবনটি ইমারত বিধি অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। অবৈধভাবে সড়কের জায়গা দখল করে ভবনের সামনের অংশ বাড়ানো হয়েছে। ভবনের সেপটিক ট্যাঙ্ক করা হয়েছে সড়কের পাশে, বাইরে। গ্যাসলাইনটি জরাজীর্ণ ছিল। সেপটিক ট্যাঙ্কের পাশে কিচেন, গ্যাসের রাইজার।

এদিকে কেজিডিসিএল গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেন (জিএম, ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস) গতকাল ভোরের কাগজের কাছে দাবি করেন তাদের গ্যাস পাইপলাইন থেকে লিকেজ হওয়ার কোনো আলামত পাননি। সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে এই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন সকাল থেকেই দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজে থাকা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দী, সহকারী পরিচালক মো. জসীম উদ্দিন এবং চউকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান। তাদের সন্দেহ, গ্যাস পাইপলাইন থেকেই গ্যাস লিক হয়ে রুমের মধ্যে জমেছিল। আর সেখানে দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতেই প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

৩ তদন্ত কমিটি : চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বড়–য়া বিল্ডিংয়ের নিচতলায় গতকাল সকালে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে বিকট শব্দে দেয়াল উড়ে যাওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসন, নগর পুলিশ ও কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পক্ষ থেকে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত কমিটিগুলোর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়ার পরই এ ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী তা জানা যাবে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বলেন, বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জে এম শরিফুল হাসানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরও ওই কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকছেন। তদন্ত কমিটি ৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। এ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার্থে যাবতীয় সহায়তা দেয়া হবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি করেছে, যার নেতৃত্বে আছেন উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মঞ্জুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা। তদন্ত শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসলাইন থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় কারো অপরাধ থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেবা সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যদি কারো অপরাধ থাকে তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj