ডেসটিনির সম্পদ বারো ভূতের দখলে!

সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

আর্থিক খাতে তোলপাড় সৃষ্টিকারী কয়েকটি ‘পুকুর চুরি’র ঘটনা এখনো অমীমাংসিত। দায়ী ব্যক্তিরা সাজা পায়নি। ক্ষতিগ্রস্থরাও পায়নি কোনো ক্ষতিপূরণ। এই নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন >>

মরিয়ম সেঁজুতি : ডেসটিনি, বিতর্কিত বহুস্তর (এমএলএম) কোম্পানি। প্রায় আট বছর আগে বন্ধ হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হতে চলেছে। এর মধ্যে ডেসটিনির ঢাকাসহ সাতটি বিভাগীয় শহরে অব্যবহৃত থাকা জমি ও ফ্ল্যাটগুলোর কোনোটিতে থাকছে পুলিশ; কোনোটি প্রভাবশালীদের দখলে; বাকিগুলোও বেদখলের পথে। এ ছাড়া চার তারকা হোটেল, কোল্ডস্টোরেজ, পাটকল ও ফুড ইন্ডাস্ট্রি অবহেলায় পড়ে আছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব সম্পদের বাইরে জব্দ থাকা ডেসটিনি গ্রুপের ৫৩৩ ব্যাংক হিসাবে পড়ে আছে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা।

এদিকে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রাহকরা। ডেসটিনির এসব প্রতারিত গ্রাহকরা এক টাকাও ফেরত পাননি। প্রতারণা করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালে দুদকের করা মামলায় ঘুরপাক খাচ্ছে ডেসটিনির কার্যক্রম। এ অবস্থায় প্রায় ৪৫ লাখ বিনিয়োগকারীর ভাগ্যে কী ঘটবে, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। ২০১২ সালের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় ডেসটিনির ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধ দুটি মামলা করে দুদক। ২০১৪ সালের ৪ মে দাখিল করা অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় ৫১ জনকে। ৪ হাজার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ৯৬ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। সেই মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন। ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন কারাগারে রয়েছেন। বাকিরা রয়েছেন জামিনে।

বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে, ডেসটিনি গ্রুপের আয়-ব্যয় এবং দায়সহ সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরে গ্রুপটির অর্থ ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক রণজিত চক্রবর্তী গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ডেসটিনি গ্রুপ সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্যাবলি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেসটিনি গ্রুপের মোট ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মূলধন ৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরুর পর ২০১২ সালের মে পর্যন্ত ডেসটিনি-২০০০, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি (ডিএমসিএসএল) ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের (ডিটিপিএল) মোট আয় ৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকে কমিশন ব্যয় ১ হাজার ৪৫৬ কোটি, ট্যাক্স ও ভ্যাট পরিশোধ খাতে ৪১০ কোটি টাকা, পণ্য ক্রয়ে ৪২৫ কোটি টাকা, লভ্যাংশ ও সুদ পরিশোধে ২৬৪ কোটি, ২০০ অফিসের প্রশাসনিক ব্যয় ৪৩৭ কোটি, বৃক্ষরোপণে বিনিয়োগ ২২৩ কোটি, সম্পদ ক্রয় ও বিনিয়োগ খাতে ১৮৯০ কোটিসহ মোট ব্যয় হয়েছে ৫১০৫ কোটি টাকা। ডেসটিনি গ্রুপের এই তিনটি কোম্পানির মোট জমির পরিমাণ ৯৬৮ একর, ঢাকা শহরে অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮ বর্গফুট। এ ছাড়া বাণিজ্যিক অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে ২৪ হাজার ৫৪৭ বর্গফুট। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেসটিনি গ্রুপের মোট সম্পদের বর্তমান মূল্য ৯ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেসটিনির ৫৮টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১৬টি বেদখল। ডেসটিনির নামে ঢাকায় যেসব সম্পদ রয়েছে তার রিসিভার হিসেবে কাজ করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর বাইরে জেলা পর্যায়ের সম্পদগুলোও আংশিকভাবে দেখাশোনা করছেন জেলা পুলিশ সুপার। ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার তিনটি সিনেমা হল, অর্ধশতাধিক ফ্ল্যাট ও অর্ধশত গাড়ির মালিকানা এখন পুলিশের। তবে ডিএমপি বলছে, তারা শুধু রিসিভার। ফ্ল্যাটের ভাড়া ও সিনেমা হলের আয় সবই জমা হচ্ছে ব্যাংক হিসাবে। ঢাকার বাইরে অন্তত দেশের ২২টি জেলায় ডেসটিনির বিভিন্ন ধরনের সম্পদ রয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এসব সম্পদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকের নামে রয়েছে। তবে গ্রুপভুক্ত ৩৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডেসটিনি-২০০০, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের নামেই বেশির ভাগ সম্পদ। অভিযোগ রয়েছে, ডেসটিনির নামে থাকা রাজধানীর বাইরের সম্পদ পুরোপুরি রক্ষণাবেক্ষণ করছে না পুলিশ। বেশ কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএমপির কোনো নির্দেশনা নেই তাদের কাছে। ফলে সম্পদগুলোও অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

জানা গেছে, ডেসটিনি গ্রুপের একটি বড় বিনিয়োগ ছিল ট্রি-প্লান্টেশনে। ডেসটিনি ট্রি-প্লান্টেশনের বড় অংশই হয়েছে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। এর মধ্যে ইয়াংছা এলাকার কয়েকটি বাগান ছাড়া সবই এখন বৃক্ষশূন্য। ৯টি বাগানের ৫৫০ একর জমি সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে গেছে। জানতে চাইলে ডেসটিনির অর্থ ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক রণজিত চক্রবর্তী ভোরের কাগজকে বলেন, শুধু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই লুটপাট হয়ে যাচ্ছে ডেসটিনির সব সম্পদ। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যেন দেখার কেউ নেই।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj