জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সাম্যসমাজ

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯


২০০৮ সাল থেকেই ঘোষিতভাবে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির সঙ্গে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুসারে আমরা ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব। ২০১৯ সালে এসে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্নের অংশবিশেষ পূরণ হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদও স্বপ্নের পুরোটা পূরণ হবে না। তাই ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের এই দ্বিতীয় স্তরটির শুরুটা তো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০২৩ সালের ইশতেহারেই রয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যটা যেহেতু ২০৪১ সালের সেহেতু ২০২১ সালের পর পুরো বিশটি বছরকে বিবেচনায় রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হচ্ছে। আমি ২০১৯ সালে বসে একটি খসড়ার কথাই ভাবতে পারি। একদম শর্তহীনভাবে আমি বলতে পারি যে, এর আমূল পরিবর্তন অনিবার্য। এমনকি পুরোটাই ছুড়ে ফেলে দেয়া হতে পারে বা এমন কিছু যুক্ত হতে পারে, যা আমরা এখন ভাবতেই পারি না। তবে দুনিয়াতে কিছু বিষয় সব সময়েই থাকে যা বদলায় না, বদলাতে পারে না।

আমরা এখন থেকে বাইশ বছর পরের ২০৪১ সালের একটি সভ্যতার কল্পিত রূপরেখা তুলে ধরতে পারি। এই রূপরেখায় যেসব বিষয় থাকতে পারে সেগুলোর মাঝে কয়েকটির আলোচনায় আসতে পারে। আমার আলোচনাটিকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী মনে করতে পারেন। আমার তাতে ভালোই লাগবে। ১৯৮৭ সালে আমি শিশার হরফবিহীন সভ্যতার কথা বলেছিলাম। ২০৯৭ সালে ট্যাপবিহীন মিডিয়া জগতের কথা বলেছিলাম। ৩২ বছরে শিশার হরফ থেকে মুক্ত হয়েছি আর ২২ বছরে ট্যাপ বিদায় হয়েছে। সেগুলো এখন আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। আমি এটাও মনে করি যে, আমার কথাগুলো অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। অনেকে হাসি-ঠাট্টা বা তামাশাও করতে পারেন। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই- কেননা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা করার সময়ও এমন মশকরা করা হয়েছে। এটি বাস্তবতা যে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা উচ্চ শিক্ষিত মানুষদের পক্ষেও আন্দাজ করা কঠিন যে, কেমন একটি সভ্যতায় পা দিয়েছি আমরা। মানব সভ্যতা এমন কোনো সভ্যতার ধারণাও কোনো কালে পায়নি। আমরা যেন ভুলে না যাই যে এই সময়টি চতুর্থ বা পঞ্চম শিল্প বিপ্লব বা সোসাইটি ৫.০-এর সময়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ধারণার জনক কার্লস সোয়াব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, প্রথম থেকে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে যারা যুক্ত ছিলেন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তাদেরই সবচেয়ে বেশি সহায়তা করবে। তবে তিনি আমাদের মতো যারা তিনটি শিল্প বিপ্লব মিস করেছি তাদের জন্যও সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি যে, আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো অকল্পনীয়। শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য যা হয়তো অতি সহজ কাজ তা আমাদের জন্য প্রায় অসাধ্য মনে হতে পারে। এগুলো মোকাবেলা করার বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর কর্মসূচি রচনা করব।

লক্ষ্য : জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সাম্যসমাজ

আমাদের আলোচনায় আমরা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোচনা করেছি। এটি ২০৩০ সালে অর্জন করার কথা। সেখানে খুবই স্পষ্ট করে কিছু বিষয় উল্লেখ করা আছে। জাতিসংঘ ২০০৩ সালে জেনেভা ঘোষণাতে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। ২০১৫ সালে সেটি অর্জিত হওয়ার কথা ছিল। সেটি এখনো দুনিয়ার কোথাও অর্জিত হয়নি। বরং মনে হচ্ছে জাতিসংঘ এসডিজি গোলের কথা বলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা চাপা দিতে চলেছে। আমরা সেটি করিনি, করতে চাই না। ২০০৩ সালে আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বোধের মতো ২০০৬ সালে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। জেনেভা থেকে ফিরে ২০০৬ সালের ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ওই শব্দটি আর উচ্চারণও করেননি। অন্যদিকে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৪১ সালে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বা আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে সাম্যসমাজ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিটি গ্রহণ করে ২০৪১ সালে জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সাম্যসমাজ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নেয়ার প্রস্তাব করছি। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজটি সর্বজনীন। দেশের সব মানুষকে সম্পৃক্ত করে সরকার, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও জীবনধারার সম্মিলিত রূপান্তর করেই এই সমাজ গড়তে হবে। মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সমাজও এর লক্ষ্য। এসবই বস্তুত ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর মূল লক্ষ্য।

ক) কাগজবিহীন সভ্যতা : যেসব খাত পুরোই কাগজবিহীন হবে সেগুলোর মোটা দাগের তালিকাটি হচ্ছে- ১. কাগজবিহীন ডিজিটাল সরকার : সরকারের ফাইলপত্র, প্রশাসনের কাজকর্ম, জনগণের জন্য সেবাসহ সব কিছু ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে বলে কাগজ নামক বস্তুটি সরকারের জাদুঘরে থাকবে, কাজে থাকবে না। ২. কাগজবিহীন ডিজিটাল শিক্ষা : শিক্ষার কোনো স্তরে কাগজ ব্যবহৃত হবে না। পাঠ্যবই বা সহায়ক বই তো বটেই পরীক্ষা পদ্ধতিও কাগজবিহীন হবে। কালি দিয়ে লেখার কলম নামক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকবে না। এমনকি কিবোর্ড নামক বস্তুটিও থাকবে না। মানুষ মুখে কথা বলবে বা ইশারায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করবে এবং যন্ত্র সেটি লিখিতরূপে, শব্দে বা চিত্রে রূপান্তর করবে। শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং মানবসভ্যতার সব জ্ঞান ডিজিটাল রূপে সংরক্ষিত থাকবে। শিক্ষার সব স্তরের সব উপাত্ত ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টে রূপান্তরিত হবে। ৩. কাগজবিহীন ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-কৃষি-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা : আমাদের প্রচলিত ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি বা স্বাস্থ্যসেবায় বড় ভূমিকা পালন করে কাগজ। আমরা পরস্পর লেনদেনের জন্য, তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বা সংরক্ষণের জন্য কাগজ ব্যবহার করে আসছি। সভ্যতার বিকাশে কাগজের ব্যবহার বেড়েইে এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে এসব খাতকে কাগজবিহীন করা। এসব খাতের তথ্যাদি কাগজে না থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমা হবে এবং সব কর্মকাণ্ড কাগজ ছাড়া পরিচালিত হবে। আমরা একে কাগজবিহীন জীবনধারা বলেও গণ্য করতে পারি।

খ) ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সভ্যতা : ডিজিটাল বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্তরে আমাদের চারপাশের সব প্রযুক্তির রূপান্তর হবে। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব চলাকালে যেসব সর্বাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির জন্ম হয়েছে যেমন- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, আইওটি, বিগ ডাটা, ব্লুক চেইন, সেন্টিমেন্ট এনালাইসিস, স্পিচ-ভয়েস রিকগনিশন ইত্যাদির আমরা কোনোটাই এখনো প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের মানবসম্পদ তৈরি করাও শুরু হয়নি। আমাদের শিল্প কল-কারখানা, উৎপাদন ব্যবস্থার কোনোটাতেই এসবের প্রয়োগ করা হয়নি। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার এমনভাবে করতে হবে যাতে এর ফলে বেকারত্ব তৈরি না হয় এবং আমরা আমাদের তরুণ মানবসম্পদ নিয়ে বিপন্ন না হই। এসব ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিত্তিতে প্রচলিত ব্যবসা-বাণিজ্য পাল্টাবে ও নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা ও শিল্প কল-কারখানা গড়ে ওঠবে, সেটাই স্বাভাবিক।

গ) ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ডিজিটাল যুদ্ধ : বিশ্ব যখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হবে তখন ব্যক্তি, সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাবে। ব্যক্তিগত তথ্য থেকে, নিরাপত্তা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এরই মাঝে ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি যুদ্ধ-বিগ্রহও হবে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। অপরাধের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলে সেটি মোকাবেলাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে- এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রকে নিজস্ব, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রকে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রযুক্তি উন্নয়ন, সংগ্রহ ও প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহায়তা গড়ে তুলতে হবে।

ঘ) ডিজিটাল সংযুক্তি : আমার বিবেচনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০-এর অন্যতম লক্ষ্য হবে দেশের প্রতিটি মানুষকে সর্বোচ্চ গতির ডিজিটাল সংযুক্তির আওতায় আনা। সাবমেরিন ক্যাবল, স্যাটেলাইট, ফাইবার অপটিক্সের সঙ্গে ৫জি প্রযুক্তির সহায়তায় দেশের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি ঘর বা প্রতি ইঞ্চি মাটিতে থাকতে হবে এই ডিজিটাল সংযুক্তি।

ঙ) মাতৃভাষার বিশ্ব : জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রধানতম হাতিয়ার যেহেতু জ্ঞান সেহেতু সেই জ্ঞান মাতৃভাষায় পেতে হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ বিশ্বটা ইংরেজি ভাষাকেন্দ্রিক থাকবে না। বিশ্বটা হবে মাতৃভাষাকেন্দ্রিক। বিশ্বের সব মাতৃভাষার জন্য সুখবর হলো যে, প্রযুক্তি মাতৃভাষার অক্ষমতাকে কেবল ইংরেজির সমকক্ষ করবে না বরং মাতৃভাষা মানুষের বুকের মাঝে বসবাস করে বলে ভাষাপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি হবে। ইংরেজি নির্ভরতা থাকবেই না। এমনকি যেসব ভাষার হরফ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে তাকেও রক্ষা করা যাবে। সাহিত্য বা জ্ঞানভিত্তিক সম্পদকে মাতৃভাষার রূপান্তর হবে সহজতম একটি কাজ। স্পিচ-ভয়েস রিকগনিশন, ওসিআর সাইন রিকগনিশন, সেন্টিমেন্ট এনালাইসিস, অটো ট্রান্সলেশন ইত্যাদি বস্তুত বহমান প্রযুক্তি।

চ) সাম্যসমাজ : মানবসভ্যতার ইতিহাস বলে মানুষ যত বেশি উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রে ও সমাজে তত বেশি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সম্পদের সুষম বণ্টন নামক স্বপ্নটি অপূরণীয়ই থেকে গেছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রে মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের নতুন সংস্করণ বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। মানুষে মানুষে বৈষম্য কমানোতে তারা অনেকটা সফল হয়েছেন। কেউ কেউ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন। আমাদের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মানুষে মানুষে বৈষম্য চরম। আমাদের সেই বৈষম্য দূর করতে হবে। জ্ঞানভিত্তিক বা মেধাভিত্তিক সমাজ সাম্যসমাজ প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে সহায়ক হতে পারে যদি অস্ত্র ও অর্থকে শক্তির উৎস হিসেবে না বিবেচনা করে মেধা ও জ্ঞানকে শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করি। শিক্ষা, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও স্বাস্থ্যসহ সব খাতেই এই লক্ষ্যটি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের সামনে জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল সাম্যসমাজ গড়ে তোলার লড়াইটা বস্তুত এখনই দৃশ্যমান।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj