দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

জলবায়ু পরিবর্তন যখন মানুষকে আগামীর পরিবেশ সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলছে ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় বিশে^র দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্যানুযায়ী গত ৫ এবং ৬ নভেম্বর ঢাকার অবস্থান ছিল শীর্ষে। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি ও তৃতীয় স্থানে পাকিস্তানের অন্যতম শহর লাহোর। পর্যবেক্ষণ বলছে, বছরের প্রায় ২০০ দিন ঢাকার বাতাস অস্বাস্থ্যকর থাকে। সেই দিক বিবেচনায় দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ঢাকার বাতাস বেশি দূষিত থাকে এবং গত চার বছর ধরে ঢাকার বাতাসের দূষণের ব্যাপ্তি ধারাবাহিক ক্রমে বেড়ে চলছে। ২০১৭ সালে বায়ুর মারাত্মক দূষণের সময়কাল ১৮৫ দিন হলেও তা ২০১৮ সালে ১৯৭ দিনে গিয়ে দাঁড়ায়। মানবদেহের জন্য দূষণের অসহনীয় উপাদান মাত্রা পিএম-২.৫ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৯০ সাল থেকে বসবাস করে আসছে। বাতাসে ২.৫ মাইক্রোনের মতো সূ² কণার উপস্থিতি মানবদেহে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে।

বৈশি^ক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর অন্তত এক লাখ ২৩ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে। মানুষের গড় আয়ুও প্রায় ১ বছর ৩ মাস করে হ্রাস পাচ্ছে।’ মানুষের জীবন সংহার ছাড়াও বায়ুদূষণের ফলে বিশ^ব্যাপী চিকিৎসা ব্যয় পড়ছে প্রায় ২২৫ বিলিয়ন ডলার। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব। বায়ুদূষণ মানবকুলের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। রাজধানী ঢাকা মেগাসিটিই নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরের বাতাসে সাদা চোখে যে ধুলা দেখা যায় তা কিন্তু শুধু মাটির ক্ষুদ্র কণা নয়। এর মাঝে মিশ্রিত আছে নানা ধরনের সূ² রাসায়নিক বস্তুকণাসহ কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন, হাইড্রোকার্বন, বেনজিন, সালফার, অ্যামোনিয়া, ফটো-কেমিক্যাল অক্সিডেন্টস। এসব ক্ষতিকর উপাদানের ব্যাপকহারে নিঃসরণ শহরে বসবাসকারী বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। দূষিত বায়ু মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, যা ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে শুরু করে স্ট্রোক, হৃদযন্ত্র ও অ্যাজমাসহ শ^াসতন্ত্রের মারাত্মক ব্যাধির কারণ হতে পারে। ঢাকার বাতাসে সিসাজনিত দূষণ জাতিসংঘের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমপক্ষে হাজার গুণ। ব্যাপক সিসা দূষণের ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও ¯œায়বিক ক্ষতি হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত, মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এবারের বিশ^ পরিবেশ দিবসে মাটিদূষণ, পানিদূষণের চেয়েও পরিবেশ দূষণের জন্য বায়ুদূষণের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাতাসকে দূষণমুক্ত রেখে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি নির্মাণাধীন নতুন ভবন ও রাস্তাঘাট থেকে উৎপন্ন ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা। শিল্প কল-কলকারখানাকে শহর থেকে দূরে স্থাপন, কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পবর্জ্যরে নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। যানবাহনের কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাসহ যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। লোকালয়ের বাইরে নিরাপদ স্থানে ইটভাটা স্থাপন এবং ভাটায় চিমনি নিরাপদ উচ্চতায় স্থাপনের মাধ্যমে কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে যথাযথ নিয়ম মেনে চলার নিশ্চয়তা বিধান অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
প্রকৌশলী, ঢাকা

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj