অন্তরালেই থেকে গেলাম… : শেখ শামীমা নাসরীন পলি

শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯

আমি দেখছিলাম। দূর থেকে সবই দেখছিলাম। একটু একটু করে কীভাবে তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছো! আমিও তোমাকে একটু সাহায্য করেছিলাম। আড়ালে গিয়ে। দেখছিলাম, কীভাবে আমাকে দূরে ঠেলে দিতে পারো।

আমার অদ্ভুতরকম একটা বিশ্বাস ছিল যে, কেউ কোনোদিন তোমার মনের ক্যানভাস থেকে আমার ছবি মুছে দিতে পারবে না। আসলে, মানুষের মনের খেয়াল বড়ই বিচিত্র! কখন যে কি খেয়াল হয় তা হয়তো ব্যক্তি নিজেও জানে না।

তোমাকে নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরলাম!

– ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলেছিল সে।

– ‘বিশ্বাস করি না। যে মনের গোপন কুঠিরে অহর্নিশ বসবাস করে তাকে কি চোখের আড়াল করলেই ভুলে যাওয়া যায়?’ সে দিন দৃঢ়তার সঙ্গে তাকে বলেছিলাম।

– তুই এবং তোর সেই বিশেষ একজনকে নিয়ে মজার বাজি ধরলাম। তুই শুধু নিজেকে একটু আবডালে রাখ। ফাইনাল খেলার আগে তোর খোলস থেকে বের হতে পারবি না কিন্তু!

– কথা দিলাম!

আমিও বাজি ধরে নিলাম। আমার মন, আমার জীবন নিয়ে একটা বাজি ধরা খেলায় মেতে উঠলাম। তুমি একটু একটু করে আমার থেকে আড়াল হচ্ছো। দূরে সরে যাচ্ছো। আমি দেখছি আর অবাক হচ্ছি। আমার বিশ্বাস আমাকে উপহাস করছে।

প্রথম যেদিন ওই মেয়েটা তোমার অফিসে গেল, সেদিন আমি তোমার চোখে অন্যরকম ঝিলিক দেখেছিলাম। তোমরা সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে গেলে। তোমার সেই কলিগের প্ল্যান ছিল। তোমার সেই পুরনো কলিগ, এ মুহূর্তে তার নামটা আমার মনে পড়ছে না। সে তোমাকে পছন্দ করত তার রিলেটিভের জন্য। তার মিশন সফল! রেস্টুরেন্টে তোমরা সেল নম্বর আদান-প্রদান করলে। তোমার মনের নায়ের পালে অন্যরকম দোলা লাগা শুরু হলো।

তোমাকে দেখে আমার ভেতর শুরু হলো সিডর। আইলার লোনা জল ভাসিয়ে দিয়ে গেল আমার সাজানো-গোছানো স্বপ্ন সংসার।

প্রায় রাতে তোমার মুঠোফোনে সেই মেয়ের ফোন। তোমরা কথার খই ফোটাও। আর আমি? সুনামিতে ভেসে যাই। আমার একান্ত বিশ্বাস আমাকে বারবার উপহাস করে। বিদ্রƒপ করে। আমি দূর থেকে দেখি আর ভাবি- ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’… বাজির খেলা! হায়রে প্রজাপতির রংয়ে মাখা মন!

তোমার বাইকের পেছনে তাকে বসিয়ে ছুটে চলো… কখনো পার্কে আবার কখনো রেস্টুরেন্টে। কথার খুনসুটি, অনাগত সংসারের পরিকল্পনা। অথচ পেছনের সংসারটার কথা তোমার মনে নেই! তোমার জন্য গরম ভাত বেড়ে যে একজন টেবিলে অপেক্ষা করছে, তার বাড়া ভাত পান্তা হয়ে গেছে! তার কথা তখন তোমার মনে নেই। পেছনে, ডানে, বামে তাকানোর সময় তোমার নেই। সুন্দরী-রমণীর স্পর্শে তুমি মাতাল। শুধুই সামনে ছুটে চলা…

আমি দেখি, কেবলই দূর থেকে দেখি তোমার পাল্টে যাওয়া।

আমি ডাইনিংয়ে তোমার ভাতের প্লেট সামনে নিয়ে প্রতীক্ষা করি। তোমার প্রিয় পদগুলো রান্না করি- লইট্যা শুঁটকি ভ ুনা, কচি লাউ শাক দিয়ে চিংড়ি ভাজি, রুই মাছের ডিম দিয়ে করলা ভাজি, ডুবো তেলে মচমচে বেগুন ভাজি, আর মাশরুম দিয়ে গরুর মাংস। শুঁটকির গন্ধটা নাকে এসে লাগায় ক্ষিধে বেড়ে যায়। তবুও আমি তোমার প্রতীক্ষায় বসে থাকি। তুমি এলে দুজনে একঙ্গে খাব, গল্প করব। কিন্তু…

আমি সাধারণ। অতি সাধারণ একটি মেয়ে। তোমার ভাবনাটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। বুঝে গেলাম- আসলে তোমার পাশে শ্যামলা রমণী মানায় না। তাই তোমার বাইকের পেছনের সিট দখল করে নিয়েছে বাহ্যিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ সেই মেয়েটি। যার সামনে আমি সত্যিই বেমানান, আটপৌরে, অতি সামান্য, অতি নগণ্য। নিজেকে আরও একটু আড়ালে নিলাম। দেখি না, আমার কথা মনে করে একবার পেছনে তাকাও কি-না?

দীর্ঘশ্বাসে আমার বুক ভারী হলো। মনের আকাশে বৈশাখী কালো মেঘ জমা। চোখের করিডোরে শ্রাবণের ধারা।

তুমি স্বপ্নে বিভোর। আমি অচৈতন্য।

তুমি ভুলে গেলে আমার নাম ঠিকানা। সবই।

তোমার সময় নেই, আশপাশে তাকানোর।

আমি দেখছি। দূর থেকে সবই দেখছি। তাকে পেছনে বসিয়ে ছুটে চলা। রাত জেগে ফোনে কথা বলা। অফিসের কাজে ফাঁকি দিয়ে তার ভাবনায় ডুব দেয়া।

আমার ভেতরে রক্তক্ষরণ।

তোমার ভেতরে সুখের নাচন।

আমি শতভাগ নিশ্চিত হলাম সে দিন, যেি দন তোমার অপারেশনের পর তোমাকে সে দেখতে এল।

তুমি তার ফোন পেয়ে কীভাবে নিচে নেমে গেলে!

প্রচণ্ড ব্যথা, আমার চোখে পানি।

আমার জন্য তোমার মনে আর কোনো অনুভূতি নেই! আমার অধিকার নিয়ে আর তোমার সামনে দাঁড়ালাম না। তোমার জীবন থেকে সারা জীবনের জন্য নিজেকে আড়াল করে নিলাম। ভালোবাসার বাজিতে আমি হেরে গেলাম।

তোমার জীবন নৌকার পালে সুখের হাওয়া দোল খায়। আমার মনের শূন্য উঠোনে হাহাকার খেলা করে।

আমি দূর থেকে তোমাকে দেখি। আড়াল থেকে আমার ভালোবাসার দৃঢ়তার বিশ্বাস উপহাস করে…

:: লালবাগ, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj