ভুল ভাবনা : দিপংকর দাশ

শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯

ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসের বট চত্বরে বসে আছে দীপান্তর। খুব মনোরম পরিবেশ এই ক্যাম্পাসে। তবে সে একটা বিষয় খুব ভালো করে উপলব্ধি করছে- বটের ছায়ায় যারাই বসে আছে কেউই সিঙ্গেল নয়। যেন কপোত-কপোতীর জোড়া একসঙ্গে বসে দানা খাচ্ছে। কপোত-কপোতীর মুখে দানা ছুড়ে দিচ্ছে আর কপোতী সেটা লুফে নিচ্ছে। এসব দেখে দীপান্তরেরও ইচ্ছে হয় একটা কপোতীর সঙ্গ পাওয়ার। কিন্তু কলেজে এসেছে আজ নয় মাস। তবুও কোনো কপোতীর বাক-বাকুম ধ্বনি তার হৃদয় ছুঁয়ে যায়নি। তবে রোজই এই ক্যাম্পাসে এসে খানিকটা সময় কাটায় যদি কোনো কপোতী এসে হাতে ধরে বলে- ‘তোমায় ভালোবাসি।’

পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত ‘আমারো পরাণ যাহা চায়’ গানটি হালকা সাউন্ডে শুনছে দীপান্তর। গান গাইতে না পারলেও ঠোঁট মেলানোর চেষ্টা। চোখ বন্ধ করে গানের সঙ্গে মিশে যেতে চাচ্ছে। হঠাৎ কেউ যেন গায়ে আঁচড় কাটল! চোখ খুলেই দেখে অরুন্ধতী পালিয়ে যাচ্ছে। দীপান্তর অবাক হয়! সে কলেজে ঢুকেই যে মেয়েটিকে দেখে ক্রাশ খেয়েছিল সেই অরুন্ধতী তার মাথায় আঁচড় কেটে গেল? কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তাই নিজের গায়ে চিমটি কাটে। মনে মনে ভাবে, ‘না ঠিকই তো আছে। অরুন্ধতী হঠাৎ করে এমন করার কারণ কী?’ এই ভাবতে লাগে দীপান্তর। ভাবতে ভাবতে বাসার দিকে হাঁটতে থাকে।

বাসায় পৌঁছে হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসেও ঠিক সেই বিষয়টা নিয়েই ভাবছে, ‘অরুন্ধতী এমন করল কেন আজ? সে কখনো আমাকে দেখে হাসেও না আর কথাও বলে না। তাহলে হঠাৎ এমন করে…?’ মা খাবার দিয়ে আধঘণ্টা পরে এসে দেখে দীপান্তর গালে হাত দিয়ে জানালার দিকেই তাকিয়ে আছে। মা রেগে গিয়ে বলেন- ‘কী রে, এখনো থালায় হাত লাগাসনি? তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ।’

ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে দীপান্তর বলে- ‘হ্যাঁ মা, খাচ্ছি।’

তারপর দ্রুত খাওয়া শেষে এক দৌড়ে নিজের রুমে। বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে সেই একই ভাবনায় বিভোর।

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায়। ঘুমের দেশেও সেই অরুন্ধতীর আগমন। স্বপ্নালোকে সে দেখছে ক্যাম্পাসে অন্য কপোত-কপোতীদের মতো সেও অরুন্ধতীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। অরুন্ধতী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নাকে চিমটি কাটছে। চুলে আলতো ছোঁয়া দিচ্ছে। হঠাৎ ছোট ভাইয়ের চিৎকারে স্বপ্ন আর ঘুম দুটোই ভেঙে যায় দীপান্তরের। সে খুব রেগে যায়। চেঁচিয়ে বলে ওঠে- ‘এত মধুর একটা স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটালি? দাঁড়া, আজ তোকে পিটুনি দেব আমি।’ ছোট ভাই দীপান্তরের অগ্নিরূপ দেখেই পালালো রুম থেকে। আর এদিকে দীপান্তর আফসোস করছে, যদি স্বপ্নটা বাস্তব হতো!

বিকেলে বাড়ির ছাদে গিয়ে উদাসীন চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই স্বপ্নের কথাই ভাবছে সে- কী অপরূপ! অরুন্ধতী কতই না সুন্দর আর মিষ্টভাষী! খুব ভালো মেয়ে। ওকে পেলে আমার জীবনটা ধন্য হবে।

এসব ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যা হয়ে আসে। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সূর্য তার আপন নীড়ে ফেরে। চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। দীপান্তর তার কক্ষে ফিরে যায়। ফ্রেশ হয়ে পড়ার টেবিলে যায়। বইয়ের পাতা খুলে কিছু একটা পড়তে যাবে ঠিক তখনই আবার সেই মুখ ভেসে ওঠে। অরুন্ধতী যেন তার পিছুই ছাড়ছে না!

রাতে ঘুমানোর সময়ও একই অবস্থা। দীপান্তর দেখে অরুন্ধতী তার পাশেই শুয়ে আছে। কিছু একটা বলতে চাইছে। আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। দীপান্তর সাহসের সঙ্গে বলে উঠে- ‘আগামীকাল আমি তোমাকে প্রপোজ করব অরুন্ধতী। তুমি আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছো। শান্তিতে কিছুই করতে দিচ্ছো না। তাই আর কেউ তোমাকে ছিনিয়ে নেয়ার আগেই আমি তোমায় প্রপোজ করব।’ এই ভেবে ঘুমানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় রাত শেষ করে দীপান্তর। ভোর পাঁচটায় বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হয়। সময় দেখতে থাকে কখন সময় হবে আর কলেজে যাবে সে।

ঘড়িতে তখন নয়টা। দীপান্তর বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে সাজু ভাইয়ের ফুলের দোকানে যায়। একগুচ্ছ গোলাপ কেনে। কীভাবে কী বলবে তা ভাবতে থাকে। তারপর কলেজের দিকে রওনা হয়। ক্যাম্পাসে কেউ নেই। সবাই যার যার ক্লাসে। গোলাপগুচ্ছ সযতেœ ক্যাম্পাসের বটের ফাঁকে রেখে ক্লাসে যায় দীপান্তর। ক্লাসে ঢুকেই অরুন্ধতীকে দেখতে পায় সে। আজ অরুন্ধতীকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। যাই হোক, ক্লাস শেষ হয়। অরুন্ধতী মাঠের দিকে যায়। দীপান্তরও যায়। অরুন্ধতী গিয়ে বটের ছায়ায় বসে। দীপান্তর পিছু পিছু যায়। বটের ফাঁক থেকে গোলাপগুচ্ছ বের করে আনে। অরুন্ধতীর দিকে এগিয়ে যায়। সে অরুন্ধতীর কাছে যাওয়ার আগেই অরুন্ধতীর সামনে রোহিত এসে হাজির। দীপান্তর থমকে যায়। আবার কী ভেবে এগিয়ে যায় অরুন্ধতীর দিকে।

কাছে গিয়ে গোলাপগুচ্ছ অরুন্ধতীর সামনে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে দীপান্তর বলতে থাকে- ‘হে অরুন্ধতী, আমি তোমাকে ভালোবাসি। গতকাল যখন তুমি আমায় আঁচড় কেটে গিয়েছিলে, তখন থেকে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। খেতে, পড়তে আর ঘুমাতে মন বসে না আমার। যেদিকেই তাকাই শুধু তোমাকে দেখি। তাই দেরি না করে বলে দিলাম তোমায়। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

এসব কথা শুনে অরুন্ধতী অবাক হয়। আর বলে- ‘আমি তোমার গায়ে আঁচড় কেটেছি মানে? আমি তোমাকে ভালো করে চিনি না আর তুমি আমাকে প্রপোজ করছো?’

– মনে করে দেখো, গতকাল এই বটতলায় তুমি আমায় আঁচড় কেটে পালিয়েছিলে?

– ওহ মাই গড! এটা তুমি ছিলে? আমি তো ভেবেছিলাম রোহিত। আই এম এক্সট্রিমলি সরি। বুঝতে পারিনি। আর একবার আঁচড় কেটেছি বলেই কী প্রপোজ করতে হলো?

– বললাম না আমার চারদিকে শুধু তোমায় দেখি।

– ওহ! তোমাদের ছেলেদের এইটাই সমস্যা। কোনো কিছু বোঝার আগেই ভালোবাসি বলে ফেলা। তুমি আমাকে ভালো করে চেনো? তুমি কী জানো আমার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে? না জেনেই পাগল হয়ে গেছো তাই না? এই তোমাদের মাথায় না সমস্যা একটাই, মেয়েদের দেখলেই হুঁশ হারাও। আর শোনো আমি তোমাকে চিনি না। তাই আমাকে আর কখনো বিরক্ত করবে না। যাও এখান থেকে।’

দীপান্তর বোবা হয়ে যায়। সে কিছু বলার আগেই অরুন্ধতী চলে যায়। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দীপান্তর বাড়ি ফিরে আসে। বিছানায় শুয়ে ভাবে- অরুন্ধতী ভুল করে আমায় আঁচড় দিয়েছে? আর আমি কী হতে কী না ভেবেছি! সারা রাত স্বপ্ন দেখেছি তাকে নিয়ে, সবকিছুই কী মিথ্যে? মিথ্যে স্বপ্নে বিভোর ছিলাম এতক্ষণ?

:: জলসুখা, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj