সখিনার পথচলা : নাজমুল করিম ফারুক

শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯

ইদানীং সখিনার শরীরটা তেমন একটা ভালো যাচ্ছে না। বুকের ডান পাশটা একটু ব্যথা অনুভব হয়। মনে হয় শরীরের ডান ভাগের পা থেকে হাত হয়ে মাথা পর্যন্ত ঝিম ধরে থাকে। বড় মেয়েটা সবেমাত্র আদর্শলিপি বই ছেড়ে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে যেতে শুরু করেছে। তার এক বছরের ছোট মেয়েটি যে নড়বড়ে অবস্থায় জন্ম নিয়েছে, ঠিক সেই রকমই রয়ে গেছে। কোলের শেষ সম্বল শিশু ছেলেটিকেও বুকের দুধ দিতে পারছে না। মনে হয় এটা সৃষ্টিকর্তার নিষ্ঠুর নির্মমতা। এক বছর হলো স্বামীটা রোজগারের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরের গেছে। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজখবর নেই। অন্যের সংসারে কাজ-কর্ম করতে করতে নিজেকে যেমন সব দুঃখ-কষ্ট থেকে লুকিয়ে রেখেছে, তেমনি সন্তানদের কখনো বুঝতে দেয়নি তাদের পিতা হারিয়ে গেছে।

সখিনা প্রায়ই কাজের মাঝে আনমনা হয়ে যায়। ভাবে, পাষণ্ড লোকটা তো দেনার দায়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছে। আমাকে রেখে গেছে ঘরের আসবাবপত্র থেকে আরম্ভ করে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করে দেনার দায় সারতে। ওই বাড়ি থেকে এ বাড়ি, ওই গ্রাম থেকে এ গ্রাম, করিম চাচা থেকে শুরু করে মুদি দোকানি রহিমের দেনা আর ক্ষুদ্রঋণের যন্ত্রণা সখিনাকে গত এক বছর কুরে কুরে খেয়েছে। শেষ সম্বল কুঁড়েঘরটি বিক্রি করে আজ রহমত মাস্টারের গোয়াল ঘরের এক কোণে ঠাঁই হয়েছে। এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে যেটুকু খাবার পায় তাই সে তার সন্তানদের নিয়ে ভাগ করে খায়। মাঝে মাঝে খেতে বসলে স্বামীর কথা মনে পড়ে। তখন সামনে থাকা মাটির বাসনের ওপর নিজের অজান্তে কয়েক ফোঁটা চোখের জল পড়ে। সেটা আবার ভাতের সঙ্গে মিশে নিজের পেটেই চলে যায়। হজম করে তৃপ্তি পায়, কিন্তু যন্ত্রণারা পিছু ছাড়ে না। কাল শুনেছে পাশের গ্রামের রহিমা নাকি কাজের সন্ধানে ঢাকার শহর গেছে। সামনে ঈদ। তাই সখিনাও ভাবছে- সেও যাবে, তবে কাজের সন্ধানে নয় তার স্বামীকে খুঁজতে।

এক দিন, দুই দিন, তিন দিন পর স্থানীয় বাজার কমিটির সেক্রেটারিকে খুঁজে পেলেন সখিনা। পল্লী গ্রামে গড়ে ওঠা ছোট একটি বাজারের সুনীলের সেলুনের দরজায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। সখিনা অসহায় মানুষের মতো তার কাছে গিয়ে কিছু টাকা ধার চাইলেন। সেক্রেটারি খুব হিসেবি লোক। একটপে বলে দিলেন- দেবে কি বিক্রি করে, কিছুই তো নেই, তাও আবার থাকো অন্যের গোয়াল ঘরে।

সখিনা হাল ছাড়তে চান না, বলেন- দেখেন না ভাই আমাকে কিছু টাকা দিয়ে, আমি শহর থেকে এসেই দিয়ে দেব। সেক্রেটারি কিছু বললেন না; চুপ করে পুনরায় খবরের কাগজে মন দিলেন।

এক মিনিট, দুই মিনিট করে সময় চলছে কিন্তু সখিনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ পর সেক্রেটারি চোখ তুলে দেখলেন, সখিনা এখনো তার কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেক্রেটারি ডাকেন, এই সখিনা এদিকে আয়। দেখ খবরের কাগজে একটা সংবাদ ছাপা হয়েছে- ‘স্ত্রী তার অসুস্থ স্বামীকে বাঁচাতে মানুষে ধারে ধারে ঘুরছে’। তুই একটা কাজ কর, কাল এ সময় আবার আমার কাছে এসে দেখা করিস।

সখিনা হাঁটে আর ভাবে কখন সন্ধ্যা হবে, রাত শেষে আবার সকাল হবে। ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়। সেই আগের জায়গায় সখিনা এসে দাঁড়ায়। সেক্রেটারি দুজন লোক দেখিয়ে সখিনাকে বলে, তুমি তাদের সঙ্গে যাও। তারা তোমার কথা বলে বাজার থেকে কিছু টাকা তুলে দেবে। সেটাই তোমার কাজে লাগিও। মনে লজ্জা, মাথার কাপড়ের অংশটুকু টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা; তারপরও এটুকুই সান্ত¡না। কেউ দিতে যায় না, ইনিয়ে-বিনিয়ে একশ টাকার মতো হলো। সেক্রেটারিকে সালাম দিয়ে সখিনা তার গন্তব্যে পাড়ি দিল।

ফজরের আজান দেয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠতে হবে, স্টেশনে গিয়ে ভোরের ট্রেন ধরতে হবে। তাই সারা রাত সখিনার চোখে ঘুম নেই। একটা শক্ত কাগজ দিয়ে ছেলেমেয়েকে বাতাস করছে আর ভাবছে- নিশ্চয় তার স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে। তার স্বামীকে নিয়ে আবার গ্রামে এসে নিজেদের মতো করে সংসার সাজাবে, ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবে। আবার না পাওয়ার হতাশায় ডুবে গুমরে গুমরে কাঁদেও কিছুক্ষণ।

চারিদিকে মোয়াজ্জেমের আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে। রহমত মাস্টারের স্ত্রীকে আগে থেকেই বলে রেখেছে তার বড় মেয়েটাকে কিছু খেতে দিতে আর এক-দুই দিন তার কাছে রাখতে। রহমত মাস্টারের স্ত্রীটা সব সময় নামাজ-রোজা পড়েন, মনটা একটু নরম। তাই সে না করতে পারেনি। বরং বলেছে, তোর স্বামীকে না পেলে দুই-একদিনের মধ্যেই ফিরতি ট্রেনে চলে আসিস। দুটি বাচ্চা নিয়ে সখিনা গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। সে স্টেশনে পৌঁছার পরপরই ট্রেনও এসে যায়।

চলতে চলতে এক সময় ট্রেন এসে থামে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে। সেখানেই সে নেমে পড়ে। রাস্তার দ্বার ঘেঁষে কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে হাঁটতে থাকে। পাশে হাঁটছে রোগা মেয়েটি; তার মাথায় কাপড় দিয়ে মুড়ানো কিছু ছেঁড়া জামা-কাপড়। সখিনা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে তার স্বামীকে পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কোথায় পাবে। হাঁটতে হাঁটতে এ পথ ও পথ ধরে এক সময় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রবেশ করে; এরই মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। শাড়ির আঁচল থেকে গিঁটুটা খুলে কিছু টাকা বের করে নিজের সঙ্গে থাকা দু’সন্তানকে নিয়ে কিছু কিনে খায় আর গ্রামের সন্তানের কথা ভাবে। ভাবে তার স্বামীর কথাও। চেপে রাখে কষ্টটা কিন্তু থাকতে চায় না। তারপরও রাখে। সায়েদাবাদের কোনো এক ফুটপাতে শুয়ে সে রাতের গভীরে ভাবে- কোথায় গেল এত মানুষ; আর কোথায়ই পাবে তার স্বামীকে। নানান জল্পনা কল্পনা তাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। এই তো তার বেশ কিছু দূর দিয়ে দুটি লোক দৌড়ে গেল তার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে চার-পাঁচজন পুলিশ। ভয়ে আঁতকে ওঠে সখিনা। এরই মধ্যে দুটি কুকুর এসে আস্তানা গেড়েছে তার পাশে। কাছ দিয়েই মাতাল এক মধ্যবয়সী লোক মনের আনন্দে গান গেয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সিদ্ধান্ত নেয় ফিরতি ট্রেনে সে আবার গ্রামে ফিরে যাবে। রাত গভীর থেকে গভীর হয় সখিনার দুচোখের পাতায় ভর করছে ঘুম নামের যন্ত্রটি। হঠাৎ আবছা অন্ধকারে সখিনার চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পায় গাড়ির একপাশে দুজন নর-নারীর আলিঙ্গন। বাড়ি যাওয়ার তাড়নাটা আরো বেড়ে যায়।

ঘুমায়নি সখিনা, তাই তার ঘুম ভাঙেনি, ঘুম ভাঙেনি তার দুই সন্তানেরও। তারপরও অপেক্ষায় থাকে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এ সময় সে ইত্তেফাক মোড় হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বরের দিকে এগুতে থাকে। রাস্তায় বের হওয়া দুই-একজন লোকের মাঝে একজনকে জিজ্ঞেস করে ট্রেন স্টেশনে কেমনে যাবে। শাপলা চত্বরের ডান পাশ ঘেঁষে সখিনা যখন নটরডেম কলেজের দিকে রাস্তার ডান দিক দিয়ে এগোতে থাকে তখন তার হঠাৎ চোখ পড়ে কিছু থামানো গাড়ির এক পাশে সদ্য ফেলে যাওয়া ময়লা-আবর্জনা থেকে ছেঁড়া একটা গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট পরা একজন লোক কি যেন খুঁজছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে কিছু খুঁজছে না, আবর্জনা থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাবার খাচ্ছে। সখিনা মুহূর্তের মধ্যে তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ও নাক ঢাকার চেষ্টা করে আর দুই সন্তানের দিকে তাকায়। এরপর দ্রুত কমলাপুর রেল স্টেশনের দিকে এগুতে থাকে।

:: পাফো-৫৫১১, কড়িকান্দি বাজার, তিতাস, কুমিল্লা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj