অযোধ্যা অধ্যায়ের সমাপন হলো কি?

শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯

ভারতজুড়ে টানটান উত্তেজনা ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গত ৯ নভেম্বর রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মত যে রায় দিয়েছেন, তার বিরোধিতা করার সুযোগ না থাকায় কোথাও কোনো প্রকাশ্য প্রতিবাদ না হলেও এই রায় নিয়ে চাপা ক্ষোভ-অসন্তোষ আছে অনেকের মধ্যেই। রায় নিয়ে কোথাও কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও এক ধরনের অস্বস্তি আছে। রায় নিয়ে অশান্তি হয়নি, আবার প্রকাশ্যে আনন্দও হয়েছে কম। তবে আরএসএস, হিন্দু পরিষদ, বিজেপি মহলের চাপা উচ্ছ¡াসও গোপন থাকেনি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রায় নিয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘এই রায়ে কারো জয়-পরাজয় হয়নি। এটা ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাইলফলক।’ না, তার এই কথা ষোলোআনা ঠিক নয়। রায়ে কার্যত কট্টরপন্থি হিন্দুদের ‘বিশ্বাসের’ জয় হয়েছে। আর পরাজয় হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতির। বহু যুগ ধরে চলে আসা একটি বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে এই রায় ভারতের অভ্যন্তরে আগামীতে আরো অনেক বিরোধ উসকে দেয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। রাম মন্দিরের প্রবক্তারা তখনই বলেছিলেন, ‘অযোধ্যা সূচনামাত্র, তাদের কর্মসূচি আরো অনেক লম্বা।’ ধর্মান্ধরা এরপর আরো কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর চড়াও হবে না, সে নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?

ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি জনসাধারণের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠেছে। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির যারা পক্ষে তারা এখন আর্তচিৎকারের শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কেউ রাম মন্দিরের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন না। সংখ্যাগুরুর ভোট কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সবাই তটস্থ। কংগ্রেস, কমিউনিস্ট- যারা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে, তারা এখন রাজনীতিতে প্রান্তিক অবস্থানে। ভারতে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ইতিহাসের জায়গা দখল করছে লোকবিশ্বাস। আদালত রায় দিচ্ছেন নিজের যুক্তির বিপরীতে, রাজনীতির হিসাব-নিকাশের নিক্তির দিকে চোখ রেখে। রায়ের আগে প্রধান বিচারপতি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এমন নজির স্থাপন করেছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য আলোর নিশানা হলো না। নিবিড় ঘন আঁধারে কোনো ধ্রæবতারাই আপাতত আর জ্বলছে না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু ১৯৫০ সালের ১ মার্চ বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘আমাদের এমন একটি দেশ তৈরি করতে হবে যাকে সব সংখ্যালঘু মানুষ সম্পূর্ণ নিজের বলে ভাবতে পারে। অন্য সব কিছুর ওপরে সংখ্যালঘুদের মনের জোর বাড়ানোর চেষ্টা আমাদের করতে হবে।’ ২০১৯-এ এসে কি এটা বলা যাচ্ছে যে ভারত নেহরুর প্রত্যাশিত পথে অগ্রসর হতে পেরেছে?

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবার, বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির আরেক দফা বিজয় অর্জিত হয়েছে। রাম মন্দির ইস্যু সামনে এনেই ভারতে বিজেপির উত্থান হয়েছিল। লালকৃষ্ণ আদভানির রথযাত্রার মাধ্যমে শুরু হওয়া বিজেপির জয়যাত্রা মোদির হাত ধরে আরো বেগবান হয়েছে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দাঙ্গায় ভারতে কমপক্ষে দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তারপর থেকে শুরু হয় নতুন পর্যায়ের আইনি লড়াই। এই লড়াইয়ের আপাত সমাপ্তি হলো গত ৯ নভেম্বর। এতে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক শক্তি সংহত হয়েছে। তার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের দীর্ঘ দিনের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তা দুর্বল হয়েছে। আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ হিন্দুত্ববাদী শক্তির উল্লাস এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির ¤্রয়িমাণ অবস্থা কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

দুই.

সুপ্রিম কোর্ট ১ হাজার ৪৫ পৃষ্ঠার রায়ে অনেক কিছু বলেছেন। অনেক তথ্য দিয়েছেন। বিরোধের কারণ উল্লেখ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত আদালত যে রায় দিয়েছেন তা না যুক্তিভিত্তিক, না নিজেদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেই অসঙ্গতিপূর্ণ।

অযোধ্যা রায়ের মূল কয়েকটি দিক-

ক. বাবরি মসজিদ কোনো ফাঁকা জয়গায় তৈরি করেনি। পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসজিদের নিচে আরো প্রাচীন একটি কাঠামো ছিল। তবে সেটা কোনো ইসলামি স্থাপত্য ছিল না।

খ. আবার মসজিদের নিচে কোনো মন্দিরেরই কাঠামো ছিল, সেটা প্রতœতত্ত্ব বিভাগের প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। কিন্তু পুরনো কাঠামোটি যদি কোনো হিন্দু স্থাপত্য হয়েও থাকে, তাহলেও আজকের দিনে এসে ওই জমিকে হিন্দুদের জমি হিসেবে ধরে নেয়া যায় না।

গ. তবে ওই স্থানকে হিন্দুরা ভগবান রামচন্দ্রের জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন, তা নিয়েও কোনো সংশয় নেই।

ঘ. রাম জন্মভূমিতে যে ১৮৫৭ সালের আগেও (অর্থাৎ মোগল সা¤্রাজ্যের পতনের আগেও) হিন্দু পুণ্যার্থীরা যেতেন, তার প্রমাণ মিলেছে। বিতর্কিত জমির বাইরে যে হিন্দুরাই পূজার্চনা করতেন, সে প্রমাণও স্পষ্ট। সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এই মামলায় এমন কোনো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি, যাতে বলা যায়, ১৮৫৭-এর আগে বিতর্কিত জমিটির দখল পুরোপুরি তাদের হাতে ছিল।

ঙ. বিতর্কিত জমিকে তিন ভাগ করে তা মামলার তিনটি পক্ষকে দিয়ে দেয়ার যে নির্দেশ এলাহাবাদ হাইকোর্ট দিয়েছিলেন, সে রায় ঠিক ছিল না। এই মামলা কোনো জমি ভাগাভাগির মামলা ছিল না।

চ. যে ২.৭৭ একর জমি নিয়ে বিতর্ক ছিল, তার পুরোটাই রাম মন্দির তৈরির জন্য দিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্ট বানিয়ে তার হাতে মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দিতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে।

ছ. অযোধ্যারই অন্য কোথাও ভালো জায়গায় পাঁচ একর জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে দেবে সরকার। সেই জমিতে মসজিদ তৈরি করে নেবে ওয়াকফ বোর্ড।

জ. ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা বেআইনি ছিল।

ঝ. বিতর্কিত জমির ওপর রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেয়াটা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

রায় পর্যালোচনা করে এটা বলা যায় যে, ভারতের উচ্চ আদালত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর জোর দিয়েছেন। বিতর্কিত জমির ন্যায়সঙ্গত দাবিদার মসজিদ-মন্দির কোনো পক্ষ না হলেও আদালত ঝুঁকলেন মন্দিরের পক্ষে। ওই পক্ষ যেহেতু ভক্তিতে এবং শক্তিতে এখন এগিয়ে তাই তাদের প্রতি সদয় হলেন আদালত। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা বেআইনি বলেও আদালত কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন।

রামের জন্মস্থান কবির মনোভূমিতে অবস্থিত। রামায়ণ মহাকাব্য কবিকল্পিত এক কাহিনী। কলকাতার বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে- ‘মহাভারত বা রামায়ণের কাহিনী ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হইতে পারে। কিন্তু শেষ বিচারে এই দুইটিই সাহিত্যকর্ম। নিশ্চিতভাবে বাস্তব ঘটনার সহিত সংযুক্ত থাকিবার দায় এই দুই মহাকাব্যের নাই। যে কোনও স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষ বুঝিবেন যে জাতির কল্পলোকে এই ধরনের সাধারণ মানসভূমি বিরাজ করিতে পারে, যাহার সহিত রক্তমাংসের দুনিয়ার সম্পর্ক না-ই থাকিতে পারে, থাকিলেও তাহা অতি সুদূর হইতেই পারে। গায়ের জোরে, অর্থের জোরে, কৌশলের জোরে সেই সব কাহিনীকে বাস্তব ইতিহাসে পরিণত করা চলে না। যদি তেমন কোনও দায় কোনও রাজনীতি নিজের স্কন্ধে তুলিয়া লয়, তাহাতে কেবল মিথ্যাচার হয় না, ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাইয়া বিপদের একটি বিরাট অবকাশ নির্মিত হয়।’

এটা তাই বলা যায় যে, ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন, ভক্তের হৃদয় দিয়ে রাম জন্মভূমি সৃষ্টি। এই লোকবিশ্বাসকে আইনের পরিসরে এনে আদালত বিবাদ সমাপনের যে কাজটি করেছেন তা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে ‘জমি দখল’ সংক্রান্ত সংঘাতের পথ বন্ধ করবে বলে মনে হয় না।

যেখানে পাঁচশ বছর আগে নদীয়ার নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য দেবের জন্মস্থানকেই নির্দিষ্টতা দেয়া যাচ্ছে না, সেখানে পাঁচ হাজার বছর আগের অযোধ্যা নগরীতে কোনো নির্দিষ্ট পুণ্যস্থানে রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে তথ্য নির্দিষ্ট করে বলাটা একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়।

৪৯০ বছর পূর্বে মসজিদ নির্মাণের আগে ওই জায়গায় কী স্থাপনা ছিল সেটা নিশ্চিত না হয়েই তা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হাতে দিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা ক্ষুণœ করা হলো বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। সংখ্যালঘুরা এখন পরিস্থিতির চাপে অশান্তি পরিহার করলেও এই বিষাদ কতদিন বহন করবে সে প্রশ্ন উঠবে। নেহরু বলেছিলেন, ‘ভারতে বহু সংখ্যালঘুর বাস। তারা তো অন্য কোথাও চলে যাবেন না। তাই তাদের ভালো থাকা, ভালো রাখা সকলের স্বার্থেই জরুরি।’ আদালত এই ‘জরুরি’ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন বলে মনে হয় না।

উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে নিয়েও ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের মুখে কিছু ভিন্ন সুর ধ্বনিত হচ্ছে। অযোধ্যায় মসজিদ তৈরির জমি সেখানকার অধিগ্রহণ করা এলাকা থেকেই দেয়ার দাবি উঠেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, আমাদের যদি জমি দিতে চান তাহলে আমাদের সুবিধা হয়, এমন জায়গাতেই জমি দিতে হবে। সরকার অযোধ্যায় যে ৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল, সেখান থেকেই মসজিদের জন্য পাঁচ একর জমি দেয়ার দাবি জানানেুা হয়েছে। মসজিদের জমির বিষয়ে অবস্থান ঠিক করতে আগামী ২৬ নভেম্বর বৈঠকে বসবে উত্তর প্রদেশ সুন্নি সেন্ট্রাল বোর্ড। তবে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রবল প্রতাপ এবং সংঘ পরিবারের উগ্র অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চয়ই কেউ বিবেচনার বাইরে রাখবে না।

বিভুরঞ্জন সরকার : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj