উল্লাপাড়া-কসবা : বিরতিহীন হোঁচটে ট্রেন

শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯

একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে কারো ষড়যন্ত্র থাকলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কসবায় তাজা রক্তের মধ্যেই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর সংসদে তার এ সতর্কবার্তা। সিরাজগঞ্জের ঘটনা জানতে-বুঝতে তদন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। দেরি না করে ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্টরা জানিয়ে দিয়েছেন, সিগন্যালের ভুলের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

উল্লাপাড়ার দুর্ঘটনায় রক্ষা মিলেছে প্রাণহানি থেকে। সেখানে রংপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ ৭টি বগি লাইচ্যুত হয়ে আগুন ধরে যায়। আহত হয়েছেন অর্ধশত যাত্রী। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ট্রেনের লোকো মাস্টার এবং সহকারী লোকো মাস্টারও। এর আগে চালকের ভুলে সোমবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে ত‚র্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হয়। আহত হন অর্ধশতাধিক। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন দুর্ঘটনার জন্য ত‚র্ণা নিশীথার লোকোমোটিভ মাস্টারকে দায়ী করেন। বরখাস্ত করা হয় ত‚র্ণার লোকোমোটিভ মাস্টার ও সহকারী মাস্টারকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার রেশ না কাটতেই উল্লাপাড়ার এ ট্রেন দুর্ঘটনার মধ্যে ঘুরছে কঠিন বার্তা। যান্ত্রিক গোলযোগে দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ একটা সান্ত¡না খোঁজে। যুক্তি বের করে। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট কারণে ঘটলে দায়িত্বশীলদের খুঁজতে হয় নানা বাহানা। শীত-গরম, কুয়াশা-ধোঁয়াশা, রোদ-বৃষ্টি, বালি ইত্যাদি অজুহাত। আদতে আমাদের গোটা রেল ব্যবস্থাটাই গলদময়। অসাধু কর্ম, অনিয়ম চর্চা, অসতর্ক পদক্ষেপ আর পরিচালনায় অবহেলা এ সেক্টরের বৈশিষ্ট্যের মতো হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ভয়ংকর দুর্ঘটনা বা কোনো চুরির খবর ফাঁস হলে শুরু হয় কথামালা। তদন্ত কমিটি। আশ্বাস। ক’দিন চলে নানা তৎপরতা। কিন্তু গলদ সারানোর কার্যকর উদ্যোগ আজতক নেই। মন্দবাগের দুর্ঘটনাও অনেকটা মনুষ্যসৃষ্ট। ত‚র্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে আউটারে মেইন লাইনে থামতে সিগন্যাল দেয়া হলেও ট্রেনের চালক তা শোনেননি। অথবা শোনার দরকার মনে করেননি। এ পরিণতিতে উদয়ন মেইন লাইন থেকে ১ নম্বর লাইনে ঢোকার মুহূর্তে উল্টো দিক থেকে এর ওপর এসে পড়ে নিশীথা। এতে উদয়নের কয়েকটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বগিগুলো ২০ ফুট পর্যন্ত ওপরে উঠে যায়। সে ক্ষেত্রে এসব বগির সব যাত্রী যে মরেননি বা অনেকে বেঁচে গেছেন- তা সন্তুষ্টির বিষয়। আশ্চর্য ঘটনাও।

দুর্ঘটনার যাবতীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে দুর্ঘটনার কারণ খোঁজা যায়। কিন্তু পাওয়া যায় না। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুটি রেল সেতুর বেহাল দশার কথা স্থানীয়রা জানেন। এ লাইনে যাতায়াতকারীরা নিয়মিতই দেখেন। ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দুটিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সিগন্যাল ম্যান। তারা সেখানে লাল পতাকা ওড়ায়। সংকেত দেয়। কিন্তু সেটা তো সমাধান নয়। ঢাকা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র রেলপথ হওয়ায় স্থানীয়দের সেখানে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকদিন থেকেই।

উল্লাপাড়ার বংকিরাট এলাকার ২৬নং রেল সেতুর সাতটি পিলারের তিনটিতেই ফাটল। একইচিত্র কামারপাড়া এলাকার ২৯নং রেল সেতুরও। সেতুর নিচে লোহার এঙ্গেল ও কাঠের ¯িøপার দিয়ে কোনো রকমে চলছে ট্রেন। প্রতিদিন অন্তত ২০টি আন্তঃনগর, লোকাল ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে এই পথে। কিন্তু সংস্কার বা মেরামত নেই। স্থানীয় এবং জাতীয় গণমাধ্যমে গত মাস কয়েক এ নিয়ে অনেক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন থেকে রেল মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। অবশেষে ঘটেই গেল দুর্ঘটনা। কী দাঁড়াল অর্থটা? দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত এটা কোনো ঘটনা বা সমস্যাই মনে হয়নি?

উল্লাপাড়া বা কসবা নয় সারাদেশের রেললাইনের বিভিন্ন জায়গায় রেল পথের এ দশাই। দুর্ঘটনার পর তা ঘটনার মর্যাদা পায়। মন্ত্রীসহ রেল এবং প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা ছুটে যান। কিছু বরখাস্ত বা শাস্তি হয়। হতাহতদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি তো হয়ই। ক’দিন পর সব তৎপরতা থেমে যায়। মানুষও ভুলে যায়। কাউকে তেমন জবাবদিহিও করতে হয় না। এবার কসবায় দায়িত্বে অবহেলার অপরাধে ত‚র্ণা নিশীথার লোকোমাস্টার, সহকারী লোকোমাস্টার ও এক গার্ডকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে পাঁচ পাঁচটি কমিটি গঠন হয়েছে। তা কি সমাধান? দুর্ঘটনার কারণ বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার পর্বটিও থেকে যাচ্ছে অগ্রাহ্যভাবে। প্রধানমন্ত্রী সেদিক’টিতে ইঙ্গিত দিয়ে সবাইকে সতর্ক হতে বলেছেন। চালকসহ সংশ্লিষ্টদের আরো প্রশিক্ষণ নেয়ার তাগিদও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তার কথা আরেকটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত মনেও থাকবে কিনা, কে জানে?

এক হিসাবে জানা গেছে, গত সাড়ে ১০ বছরে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে অন্তত ৪ হাজার ৭৯৮ বার। নিহতের সংখ্যা অন্তত ৪০৮ জনের। আহতের সংখ্যাগত হিসাব করা কঠিন। অথচ পৃথিবীর সব দেশেই ট্রেনযাত্রাকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করা হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তাহলে কেন ট্রেনকে অবহেলিত করে রাখা? কার স্বার্থ এখানে? আওয়ামী লীগ সরকার আলাদা রেলওয়ে মন্ত্রণালয়কে পুনরুজ্জীবিত করেছে। ব্যয়-বরাদ্দসহ বাজেট বাড়িয়েছে। যাত্রীও বেড়েছে। এরপরও কেন যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার করুণ দশা?

ব্যাপক জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারত। সবারই জানা, রেলের সিটিং টিকেট পাওয়া একটু কঠিন। ঈদ মৌসুমে সোনার হরিণের মতো। স্ট্যান্ডিং টিকেট বিক্রিও প্রচুর। তাই ট্রেনে অনেক সময় পা ফেলানোর জায়গা থাকে না। কিন্তু বছর শেষে ট্রেনের লস শত শত কোটি টাকা। একে আমচোষা করে খেয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠান ও মৃত্যু ফাঁদে এনে ঠেকানো হয়েছে। কেবল দুই হাতে লুটপাটই এর অন্যতম কারণ। আশপাশের দেশগুলোতে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে গড় ব্যয় হচ্ছে ৩১ কোটি টাকা।

রেললাইনের পাথর নেই, জরাজীর্ণ ¯িøপার, লাইনের দুপাশে ঠিকমতো মাটিও নেই। কাঠের তৈরি ¯িøপারগুলো এতই জরাজীর্ণ যে, যে কোনো চাপেই গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার অবস্থা। বাস্তবে সেটাই ঘটল। যে রেল সেতু তার ইটের টেম্পার নেই, সংস্কারের নামে সিমেন্টের বদলে দেয়া হয়েছে বালি। আর লোহার বদলে বাঁশ। রেলপথ বিশেষ করে রেল সড়কের ব্রিজগুলোর দুরবস্থা নিয়ে গণমাধ্যমে কিছু সতর্কতামূলক সংবাদ প্রচার হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র রেললাইনের ওপর দিয়ে সংযোগ সড়ক তৈরির কথা এলেও তা রোখার তথ্য তেমন নেই। গত তিন বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এর মধ্যে দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ১৭টি। বাকি অধিকাংশই ঘটেছে লেভেল ক্রসিংয়ে। টঙ্গী থেকে গেণ্ডারিয়া পর্যন্ত প্রায় ২৬ কিলোমিটার রেললাইন যেন মৃত্যুফাঁদ। মগবাজার, বনানী, কুড়িল রেলক্রসিং পারাপারে অসতর্ক পথচারী মৃত্যুর ঘটনা সর্বাধিক। বছরের পর বছর ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবও দুর্ঘটনার জন্য কম দায়ী নয়। যে দুই-চার জায়গায় সংস্কার হচ্ছে সেখানেও লুটপাট। কাজ হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের। এই অবস্থার লাগাম না টানলে প্রতিবন্ধীর হোঁচট খাওয়ার মতো এভাবে ট্রেন দুর্ঘটনাও মামুলি ঘটনায় রূপ নেবে। দুর্ঘটনার পর গঠন হবে তদন্ত কমিটি। আর কমিটি দিয়েই যাবে নানা পরামর্শ।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

Bhorerkagoj