মনে মুখে এক চিরকিশোরী

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯

ইমানুল হক

বিধবা বিবাহের প্রচলন ১৮৫৬-য় বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে। কিন্তু বিধবা বিবাহ সেভাবে হতো না। লেখিকা রাধারানী দেবী ছিলেন বিধবা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও নির্ভীক মহিলা। নিজেকে নিজে সম্প্রদান করেছিলেন পুরুষতন্ত্রের কন্যাসম্প্রদানের মনুবাদী ধারণাকে চপেটাঘাত করে। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ রাধারানীর নাম রাখেন নব-নীতা। কিন্তু সে নাম রাধারানী ব্যবহার করেননি। ঈষৎ ক্ষুণœ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তা পরে আনন্দে রূপান্তরিত হলো যখন রাধারানী দেবী ও নরেন্দ্র দেব নিজেদের আত্মজার নাম রাখলেন নবনীতা।

বাবা ও মায়ের তেজ সংক্রামিত হয়েছিল নবনীতাদি’র শরীর, মন ও মননে। একদিকে ছিল কিশোরীর অভিমান ও চাপল্য, অন্যদিকে ছিল দৃঢ় সংকল্প। প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ ছিল। এই আত্মমর্যাদাবোধ খেয়াল করেই তার মৃত্যুর পরদিন অর্থাৎ ৮ নভেম্বর যখন ‘ভালো-বাসা’র দোতলা থেকে তার দেহ চাদর মুড়ে নিচে নামানোর কথা হচ্ছে, আমি ও আরেকজন আপত্তি করি। বলি, এভাবে ওকে মানাবে না। নবনীতা দেবসেন আমাদের কালের এক মহৎপ্রাণা লেখিকা, তাকে লাশ বা দেহ ভাবতে পারিনি। তার বড় কন্যা অন্তরা সাড়া দেন আমাদের কথায়। তার ও নন্দনার সম্মতিতে স্ট্রেচারে করেই তাকে নামানো হলো সেকালের সিঁড়ি বেয়ে। রাজকুমারী গেলেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দেহবাহী শকটে আমরা তখন অন্তরা নন্দনাসহ পাঁচজন মানুষ। সাধারণত পরিবারের লোকজন শকটে যান না। ওরা গেলেন। মা’কে কাছছাড়া করতে চাইছিলেন না। মাথার চুল আঁচড়ে বালিশ ঠিক করে মাকে যতেœ সোহাগে বিদায় দিলেন। নবনীতাদি শায়িত আছেন যেন ঘুমঘোরে। কপালে বড় টিপ। কানে বড় দুল। কে বলবেন যে এটাই শেষ শয্যা এবং শেষ সজ্জা? যাদবপুরের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিদায় দিলেন রীতি মেনে। গানের মধ্য দিয়ে। মৌসুমী ভৌমিক, প্রণতি ঠাকুর, অনুশীলা বসুরা গাইলেন তিনটি গান। তারপরে বাংলা অ্যাকাডেমি হয়ে কেওড়াতলা শ্মশান।

নবনীতা দেবসেনকে আমি প্রথম দেখি ১৯৮৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যেতাম। একদিন দেখি নবনীতা দেবসেন। চমকে গেলাম। কিন্তু কথা বলিনি। কী বা বলতাম! ভাষা ও চেতনা সমিতির কাজ করতে গিয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে ঘনিষ্ঠতা হলো। ২০০০ সালে সারা রাত বাংলা ভাষা উৎসবে অন্নদাশঙ্কর রায়, অরুণ মিত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ একরাশ তারকার মধ্যমণি হয়ে ছিলেন নবনীতাদি। কবিতা পড়লেন। ২০০০ থেকে পয়লা বৈশাখ উদযাপনে পেয়েছি তাকে।

অশোক মিত্রর সাথে দারুণ সম্পর্ক ছিল তাঁর। বিচ্ছেদের পরে দেশে ফেরার সময় তাকে বিমানবন্দরে আনতে গিয়েছিলেন অশোক মিত্র। এবারে কিছু টুকরো অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের বাংলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের আহ্বানে শীর্ষেন্দুদাসহ ১৫ জনের দল ঢাকায় যাই। নবনীতাদিও আছেন। রাতের খাবারের রং ও মসলা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম- দিদি, বয়স কত হলো? দিদির ঝটিতি উত্তর- তোমার থেকে পাঁচ বছর কম। এসো জমিয়ে খাওয়া যাক।

নবনীতাদি মানে জমিয়ে খাওয়া, জমিয়ে আড্ডা। ২০১৮-তে ভাষা ও চেতনা সমিতি থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভ্রাম্যমাণ রবীন্দ্রজয়ন্তী করব যেখানে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছান না- বস্তি ও বহুতলে। শঙ্খ ঘোষ সূচনা করলেন যাত্রার। তার বাড়ির সামনে থেকে। যাত্রা শেষ হবে আরেক কবির পাড়ায়। তিনিই সব ব্যবস্থা করবেন। আমাদের প্রায় ৫০ জনের দল। তিনি আর ফোন ধরেন না। তুমুল গরম। অগত্যা ফোন নবনীতাদিকে। শুনেই উল্লসিত। চলে এসো। আমার বাড়িতে জায়গা কম নয়। আরে, আসল জায়গা তো মনে। তার বাড়িতে গেলাম। সবাইকে শরবৎ মিষ্টি খাওয়ালেন।

পেহলু খান হত্যার পরে সারা দেশের লেখক বুদ্ধিজীবীরা কেন্দ্রীয় সরকারকে বারো পাতার চিঠি পাঠালেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও উদ্যোগ নিলেন নবনীতাদি। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মানের চোখে দেখতেন সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে নয়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj