প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

সুন্দরবন দুর্যোগ থেকে মানুষের ধ্বংস রুখে দেয়, তার বড় প্রমাণ বুলবুল। গত ৯ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের হাত থেকে সুন্দরবন যেভাবে উপক‚লকে রক্ষা করেছে, তাতে এই বনাঞ্চল টিকিয়ে রাখাটা কতটা জরুরি- তাই যেন বলে গেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। সুন্দরবনে ঝড়ের তীব্রতা ঠেকাতে সাহসী হয়ে উঠেছিল তরুদল। বর্মের মতো প্রাচীর হয়ে বুক চিতিয়ে ছিল বৃক্ষরাজি। একেকটি দৃঢ় ঋজু স্তম্ভের মতো অপ্রতিরোধ্য হয়েছিল এই সপ্রাণ সবুজ। সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপক‚লভাগকে ঘূর্ণিঝড়ের দুর্যোগের সময় প্রাকৃতিক-দেয়াল হয়ে বন্যার পানি তথা জলোচ্ছ¡াস ও দমকা হাওয়ার মতো প্রকোপ থেকে রক্ষা করে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ছোবল থেকে উপক‚লীয় এলাকা রক্ষায় সুন্দরবন যে অকুতোভয় প্রহরী হয়ে উঠেছিল, তা নজিরবিহীন। এবার প্রথমে বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা উপজেলায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। এরপর এটি সুন্দরবনের খুলনা ও বাগেরহাট অংশের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। কিন্তু খুবই ক্ষিপ্ত-প্রচণ্ড শক্তিধর এই ঘূর্ণিঝড় জনপদে সেভাবে আসেনি। সুন্দরবনের বাধার কারণে তা হয়ে দাঁড়ায় ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার।

বনভূমিতে যখন ঘূর্ণিঝড়ের গতি ঘণ্টায় একটানা ১০০ কিলোমিটার, তখন সেই গতিবেগ বন পার হয়ে লোকালয়ে যেতে যেতে শক্তি হারিয়ে থেকে থেকে দমকা হাওয়ার রূপ পায়। দুর্বল প্রতিরূপ পায়। আর একইভাবে জলোচ্ছ¡াস লোকালয়ে চড়াও হওয়ার আগে সুন্দরবনে বাধা পেয়ে ঢেউয়ের উচ্চতা বহুলাংশে হারিয়ে ফেলে। ফলে অনেক কমে আসে। এ কারণেই উপক‚লীয় এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তথা ক্ষয়ক্ষতির অনেক আশঙ্কায় তখন তেমন থাকে না। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ঠেকাতে বারবার সুন্দরবন এ কাজটিই করেছে, করবে এবং করে যাচ্ছে।

স্মর্তব্য যে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার মহাতাণ্ডব থেকে এই বন উপক‚লকে রক্ষা করেছে। এসব দুর্যোগ ঠেকাতে গিয়ে সুন্দরবন অর্থাৎ তার বিস্তৃত বনাঞ্চল বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই বনে স্বেচ্ছাচারিতা অর্থাৎ ইচ্ছেমতো গাছ কাটা রুখতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বনজ নিরাপত্তা বাড়াতে বনায়নে বেশি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, গাছপালা লাগানো দরকার- উপক‚লজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা আশু কর্তব্য। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সুদূরপ্রসারী না হলে বিপরীত বিপর্যয় নেমে আসবে। আবহাওয়া মহলের ভাষ্যানুযায়ী, আজ যদি এই একই ঘূর্ণিঝড় বরিশালকেন্দ্রিক হতো, তাহলে আমাদের অনেক চড়া দাম দিতে হতো। বিরাট মাসুল গুনতে হতো। বিশেষত চলতি বছর প্রায় সব ঘূর্ণিঝড়ই সুন্দরবন ঠেকিয়ে দিয়েছে।

সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়েছে। এই বনের ভূমিকার কথা আমরা যেন ভুলে না যাই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। এরপরও কি আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে না? আমরা এই নৈসর্গিক-ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে সুরক্ষা দেব না? সুন্দরবন ধ্বংসের লীলায় মেতে উঠব? অব্যাহত ভুল করব? রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চয়ই তাকে এবার যাবতীয় অপমান-অত্যাচার-আশঙ্কা থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসব, অন্তত মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর হবো। আসুন, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। আমরা প্রকৃতিবান্ধব হই। প্রাণের প্রকৃতি বাঁচাতে এগিয়ে আসি। আসুন, তাকে সযতেœ লালন করি। নিজেদের স্বার্থেই সুন্দরবন রক্ষা করি।

পুলক বড়ুয়া
কবি ও লেখক, চট্টগ্রাম।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

কামাল লোহানী

বিষম দইরার ঢেউ

সুধীর বরণ মাঝি

আমি ব্যথিত আপনি?

Bhorerkagoj