হুমায়ূন আহমেদের জীবনে ভোরের কাগজ

বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

আজ ১৩ নভেম্বর। বাংলা ভাষাসাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। আমি ভারতীয় বাঙালি হলেও বাঙালি তো! তাই স্বাভাবিক নিয়মে হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মুগ্ধতা আমার অনেক দিনের। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে সমধারা কবিতা উৎসবে আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা হয়েছিল। তার প্ররোচনায় হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত জীবন ও কীর্তি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। উদ্দেশ্যটা কথায় কথায় নূর সাহেব স্থির করে দিয়েছিলেন। ‘একটা উপন্যাস লেখো ওকে নিয়ে’। হয়তো নিতান্ত কথার পিঠে কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু আমি লিখব স্থির করে কাজ শুরু করেছিলাম। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার নিয়ে, তার আত্মজীবনী পড়ে, তার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ঘুরে লিখতে শুরু করলাম। এই সাক্ষাৎকার ও রচনা পড়ে ‘ভোরের কাগজ’ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা সম্ভবত এই কাগজের কর্তাব্যক্তিদের অজানা।

মেহের আফরোজ শাওন গল্পে গল্পে বেশ কিছু কথা বলেছেন। হুমায়ূন আহমেদ বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। ফ্রেশ হয়ে নিজের সকালের চা নিজে বানিয়ে নিতেন। তারপরে ধানমন্ডির দখিন হাওয়া বাড়ির পাঁচতলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসতেন চা, সিগারেট ও তিনটে কাগজ নিয়ে। ভোরের কাগজ, কালের কণ্ঠ ও প্রথম আলো। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আসাদুজ্জামান নূর যেহেতু ভোরের কাগজের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই তিনি এই পত্রিকার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক হয়ে যান। ক্রমে তার প্রথম পছন্দের কাগজ হয়ে ওঠে ভোরের কাগজ। তিনি প্রথম পাতার শিরোনামগুলো দেখে চলে যেতেন পঞ্চম পাতায়। খুঁটিয়ে পড়তেন সম্পাদকীয় ও উত্তর সম্পাদকীয়গুলো। আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে দেখা হলে সে সম্পর্কে মতদান করতেন।

একবার বিরোধী দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টার হরতাল। সময় নষ্ট না করে হুমায়ূন ছোট দুই পুত্র-কন্যাকে নিয়ে ঠিক করলেন কক্সবাজার যাবেন। বন্ধুদেরও আহ্বান করলেন সঙ্গী হতে। বিমানে যাবেন আসবেন। থাকবেন হোটেল সাইমনে। অন্যপ্রকাশের মাজাহারুল ইসলামকে বললেন। সে না বলে দিল। অভিনেতা চ্যালেঞ্জারকে বললেন। সেও না বলে দিল। মাসুমকে বললেন। সেও বলল, নাহ, হবে না। কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুণœ হয়ে হুমায়ূন পুত্র-কন্যা নিয়ে একাই চলে গেলেন। হুমায়ূনের স্বভাব ছিল মানুষকে চমকে দিয়ে আনন্দ পাওয়া। নিজে চমক পেতেও পছন্দ করতেন। এবার বন্ধুরা যে তাকে চমকে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে তা তার মাথায় ছিল না। এই তিন বন্ধু সারারাত গাড়ি চালিয়ে হরতালের মধ্যে পৌঁছল কক্সবাজার। তখন কাকভোর। হুমায়ূনের দরজায় তারা ঘণ্টি বাজাল। পরিকল্পনা মতো মাসুমের হাতে গরম চায়ের কাপ, মাজাহারের হাতে সিগারেটের প্যাকেট আর চ্যালেঞ্জারের হাতে আজকের পত্রিকা। হুমায়ূন বেরিয়ে এলেন। সব খবর নিলেন। ঘরে ডেকে বসালেন। গল্প করলেন। তারপরে বললেন যে তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তার টেবিলে আসো আধা ঘণ্টার মধ্যে। একসঙ্গে নাস্তা খাব। মাজাহারের মনটা একটু খারাপ হলো। তারা হরতালের মধ্যে সারারাত গাড়ি চালিয়ে এসেছে, হুমায়ূন ভাই তো তেমন খুশি প্রকাশ করলেন না ওদের দেখে। নাস্তার টেবিলে বসার পরে হুমায়ূন বললেন, মাজাহার আমি আজ অসম্ভব খুশি হয়েছি তোমরা এখানে এসেছ বলে। অন্য সময় হলে আনন্দে নাচতাম। কিন্তু চমকে দেব বলে যে রিস্কটা তুমি নিয়েছ সেটা আমাকে শঙ্কিত করেছে। তোমাদের যদি রাস্তায় কিছু হতো?

না, না, সেটা ঠিকই, তবে গোলমাল তেমন কিছু ছিল না। খোঁজ নিয়ে বেরিয়েছি। নেই, কিন্তু হতে কতক্ষণ? যাক গে, যে জন্য উচ্ছ¡াস প্রকাশ করিনি তা হলো সকালে ভোরের কাগজ পাইনি বলে। হুমায়ূনে নিবেদিতপ্রাণ চ্যালেঞ্জার বললেন, খুঁজেছিলাম, কিন্তু কোথাও পাইনি স্যার। হুমায়ূন বললেন, এটা ওদের সমস্যা। চ্যালেঞ্জার, তুমি নূরকে একটু বকে দিও তো। হুমায়ূনের সঙ্গে বেশ কিছু পত্রিকার সম্পর্ক ছিল অতি তিক্ত। সে কথা হুমায়ূন বারে বারে লিখেছেন তার বিভিন্ন রচনায়। কারণ ছিল বহুবিধ। তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। এক সন্ধ্যায় হুমায়ূনের টেলিফোন বাজল। হুমায়ূন ফোন তুললেন। অন্য প্রান্তে এক নামি দৈনিকের সম্পাদক। হ্যালো। হুমায়ূন ভাই আমি অমুক কাগজের অমুক বলছি। হ্যাঁ, বলুন। হুমায়ূন ভাই, আপনাকে তো প্রায় শুইয়ে দিয়েছেন। কে শুইয়েছেন? বদরুদ্দিন উমর। কোথায় শোয়ালেন? আমাদের পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে। উনি বলেছেন আপনার লেখায় শিক্ষামূলক কিছু নেই। এটা তো উনি ঠিক বলেছেন। আমি তো পাঠ্যবই লিখি না। আমার বই শিক্ষামূলক হবে কেন? জীবনে একটাই পাঠ্যবই লিখেছিলাম- কোয়ান্টাম রসায়ন। বাজারে পাওয়া যায়। সেটা হয়তো ওনার চোখ এড়িয়ে গেছে। না, হুমায়ূন ভাই, আপনি বিষয়টা হালকা করে দেখছেন। একটা বাদানুবাদ হওয়া দরকার। আপনি একটা কাউন্টার লেখা দিন। আমরা ছাপব। না ভাই, আমার অত সময় নেই। আমি আগামীকাল আপনার সঙ্গে আমার কথার রেফারেন্স দিয়ে বদরুদ্দিন উমরকে একটা কোয়ান্টাম রসায়নের বই পাঠিয়ে দেব। সেখান থেকে হয়তো উনি শিক্ষামূলক বিষয় পাবেন।

তবে একটা ঘটনায় তার প্রিয় কাগজগুলোর মধ্যে অন্যতম ভোরের কাগজও একবার এমন এক খবর ছাপিয়ে নিজেদের পত্রিকার অন্যতম কাণ্ডারি আসাদুজ্জামান নূরের পারিবারিক সংকট ডেকে এনেছিল তা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। হুমায়ূন আহমেদের রসিকতা করার খ্যাতি ছিল। কখনো কখনো তা বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব করত। আগুনের পরশমণি ছবির শেষ পর্যায়ে একদিন এক রসিকতার জের গড়াল অনেকদূর। হুমায়ূন মজা করে একটি গল্প বলেছিলেন উপস্থিত বন্ধুবর্গকে। গল্পটা এই রকম। আগুনের পরশমণি ছবিতে একটি দৃশ্য আছে ডাস্টবিনের পাশে দুটি ডেডবডি ও একটি মরা কুকুর পড়ে আছে। মরা কুকুর পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবস্থাপক মিনহাজকে বলা হয়েছে যে একজনকে ভাগাড়ে নিয়োগ করো। টাটকা মরা কুকুর পেলে দৃশ্যটা করা হবে। মিনহাজ তা না করে মিউনিসিপালিটিকে বলল যে তোমরা তো কুকুর মারো, আমাদের একটা মরা কুকুর দিয়ে যাও। পরের দিন মিউনিসিপালিটি এসে একটা মরা কুকুর দিয়ে গেল। কিন্তু সেদিন আলো কম থাকায় শুট করা যায়নি। মিউনিসিপালিটি মরা কুকুর তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন নতুন একটি কুকুরের মৃতদেহ দিয়ে যায় এবং তা দিয়ে শুটিং হয়। এটা হলো সত্যি ঘটনা। কিন্তু হুমায়ূন গল্পটা মজা করে বললেন, আবার কোথা থেকে মরা কুকুর পাব? তাই মিনহাজকে বললাম যে কুকুরটা চটের ব্যাগে ভরে আসাদুজ্জামান নূরের বাসার ডিপ ফ্রিজে রেখে এসো। ভাবি যেন জানতে না পারে। আগামীকাল আবার নিয়ে চলে এসো। মরা কুকুরের বডি ফ্রেশ থাকবে। মিনহাজ তাই করল। ব্যস, আসাদুজ্জামান নূরের সাহায্যে আমাদের শুটিং উতরে গেল।

পরের দিন দৈনিক বাংলা, ভোরের কাগজ, বাংলা বাজার- সব কাগজে জম্পেশ খবর হিসেবে বেরোল ঘটনাটি। পরদিন নূর সাহেব শুটিংয়ে অনুপস্থিত। এমন তো হয় না। খবরের কাগজে এই সংবাদ বেরিয়েছে তা হুমায়ূনের জানা ছিল না। হুমায়ূন নূর সাহেবের বাসায় ফোন করলেন, ফোন ধরলেন তার স্ত্রী। তিনি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন, হুমায়ূন ভাই, আমি চাকরি করি। দিনে বাসায় থাকি না। এই ফাঁকে আপনার শুটিংয়ের মরা কুকুর আমার ডিপ ফ্রিজে রেখেছেন। এখানে বাচ্চাদের রান্না করা খাবার থাকে… ভাবি, আমি রসিকতা করেছিলাম কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা তাহলে সত্যি ভেবে ছেপে দিয়েছে। রসিকতা করেছিলেন? মানে ঘটনাটা সত্যি না? একেবারেই না। নির্ভেজাল রসিকতা। বলেন কী? আমি আমার ডিপ ফ্রিজের সব মাছ-মাংস ফেলে দিয়ে ডেটল দিয়ে ফ্রিজ ধুইয়েছি। আমার পুরো মাসের বাজার ছিল ডিপ ফ্রিজে। তার ওপরে আপনার বন্ধুকে যা তা বলেছি সকাল থেকে। ছি, ছি। ভাবি, স্যরি। হুমায়ূন ভাই, আপনি এমন অদ্ভুত রসিকতা কেন করেন? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। হুমায়ূন আবার বারবার স্যরি বলে ফোন রাখলেন। কিন্তু তারপরে ভোরের কাগজের অফিসে কী কী ঘটনা ঘটেছিল জানা যায়নি। সেটা বলতে পারবেন একমাত্র সম্পাদক মহাশয়। সেটা শোনার প্রতীক্ষায় থাকলাম।

অমিত গোস্বামী

কবি ও লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

কামাল লোহানী

বিষম দইরার ঢেউ

সুধীর বরণ মাঝি

আমি ব্যথিত আপনি?

Bhorerkagoj