মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মুক্তি সনদ

রবিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৯

আজ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার একজন হিসেবে রাষ্ট্রমহলে তিনি প্রথম অধিপতি যিনি দাপটগুলোকে প্রশ্ন করে দাঁড়ান প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কায়দায়। তিনি দেশের একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের জনগণের ন্যায্যতা, বৈষম্য ও আইনি অধিকার, জনগণের সম্পর্কের সীমা ও উৎপাদন সম্পর্কের রাজনীতিসহ জীবনযাপনের নানা উচ্চারণ ও আহাজারিকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সভায় তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন করেছেন। লড়াই করেছেন। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তার মতো একজন জননেতা সম্পর্কে জানা-বোঝার জন্য মুদ্রিত দলিলের যেমন অভাব তেমনি ইতিহাসহীন করা হয়েছে তাকে অধিপতি ব্যবস্থার সব রকমের বিস্তৃতি থেকেই।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লামরার ডাক নাম মঞ্জু। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর থানার বুড়িঘাট মৌজার মাওরুম (বাঙালিরা যে গ্রামের নাম দিয়েছে মহাপুরম) আদামে (চাঙমা ভাষায় গ্রামকে আদাম বলে) জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাসের পর চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনের আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালেই ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনের একজন কেন্দ্রীয় উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬২ সালে সংগঠিত করেন এক বিশাল পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলন। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে চার দফা দাবি পেশ করেন। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভোররাতে বিভেদপন্থি চক্রের বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত আক্রমণে পার্টির আটজন নেতাসহ নির্মমভাবে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে তার ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রি বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু) সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছেন।

এম এন লারমা সবসময় রাষ্ট্রসভায় দেশের নিপীড়িত জনগণের হয়ে প্রশ্ন করেছেন, রাষ্ট্রের সংবিধানকে নানা জায়গা থেকে প্রশ্ন করেছেন, বারেবারে তুলে ধরেছেন নিম্নবর্গের মুক্তিসনদ। দেশের নিপীড়িত জনগণের হয়ে যিনি রাষ্ট্রসভায় নিজের মতো লড়ে গেছেন আজ সেই অবিস্মরণীয় নেতাকে রাষ্ট্রের চলমান অধিপতি ইতিহাসে আড়াল করা হয়েছে। অধিপতি প্রক্রিয়াই এম এন লারমাকে আজ আবার জোর করে বানিয়ে দিচ্ছে কেবলমাত্র ‘একজন আদিবাসী নেতা’। চাকমা হিসেবে এম এন লারমার জাতিগত অস্তিত্বের স্বীকৃতি যেমন জরুরি তেমনি জরুরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার সঠিক মূল্যায়ন। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, প্রাথমিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এম এন লারমার নামে কোনো আবাসিক ভবনের নামকরণ করা যায়, ঢাকা-পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাসড়কের নাম লারমা সড়ক করা যেতে পারে, এম এন লারমার চিন্তা-কাজ-জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের পাঠ্যপুস্তকে। রাষ্ট্রের গণমানুষের সামগ্রিক মুক্তি বিষয়ে যার নিরন্তর দ্রোহ তিনি কেন কেবল কোনো বিশেষ প্যাকেজবন্দি হিসেবেই বারবার পরিচিত হবেন? আশা করি জনগণের নেতা এম এন লারমা আমাদের সব নথি-পাঠ্যে সশ্রদ্ধ ও মর্যাদায় জায়গা পাবেন অচিরেই। প্রচলিত অধিপতি ইতিহাস ভেঙে আবার শুরু হোক এম এন লারমার মতো সত্যিকারের সাহসী মানুষের ইতিহাস।

পাভেল পার্থ
লেখক ও গবেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মো. বিল্লাল হোসেন

পথ চলতে ফোন নয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বাংলাদেশ

কামাল লোহানী

বিষম দইরার ঢেউ

সুধীর বরণ মাঝি

আমি ব্যথিত আপনি?

Bhorerkagoj