‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো’

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কিংবদন্তি লেখক, কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্য থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তার সমান তালে পথ চলা। লেখক হিসেবে যেমন জননন্দিত, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার আবার নাট্য-চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও কিংবদন্তি। লেখক, নির্মাতা ছাড়াও হুমায়ূন আহমেদ গীতিকার হিসেবেও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। রচনা করেছেন বেশকিছু গান। যার কোনো কোনোটি শ্রোতার হৃদয়ে দাগ কেটেছে আবার কোনো কোনোটি হয়ে উঠেছে হুমায়ূনের নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হুমায়ূন আহমেদ প্রথম গান লিখেন ‘অয়োময়’ নাটকের জন্য। এ নাটকের জন্য গান লিখতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন – ‘গান লিখব কখনো ভাবিনি। আমার সব সময় মনে হয়েছে গীতিকার হওয়ার প্রথম শর্ত সুর, রাগ-রাগিণীর ওপর দখল। সেই দখল আমার একেবারেই নেই। কাজেই গান লেখার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু গান তো লাগবেই। ভাটি অঞ্চলের মানুষ ছ’মাস বসে থাকে। সেই সময়ের বড় অংশ তারা গান-বাজনা করে কাটায়। ‘অয়োময়’ ভাটি অঞ্চলের গল্প- গান ছাড়া চলবে না।’ এরকম হঠাৎ করেই গান লিখতে শুরু করেন হুমায়ূন আহমেদ। আগামী ১৩ নভেম্বর হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। হুমায়ূনের নিজের প্রিয় পাঁচটি গান নিয়ে ভোরের কাগজের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করলেন হুমায়ূন স্ত্রী অভিনেত্রী, পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী মেহের আফরোজ শাওন

১. আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা ভাঙা বেড়ার ফাঁকে

অবাক জোছনা ঢুইকা পড়ে হাত বাড়াইয়া ডাকে

হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলে না

আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবা না।।

শাওন : জানুয়ারি ১৩, ১৯৯৬ সাল; পূর্ণিমার রাত। ‘নক্ষত্রের রাত’ শুটিং ইউনিটসহ আমার দাদার বাড়ি জামালপুরে যাই। দাদার বাড়ির কাছেই আমার বাবার একটা দোতলা বাড়ি আছে। সেখানে আমাদের সবার রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হলো। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গল্পে মজে গেলেন অন্যরা। দোতলার বারান্দায় গল্প করছি আমি আর শিলা। বাড়ির পেছনের দিকে বাঁধানো পুকুরের ঘাটে হুমায়ূন আহমেদ চুপচাপ বসেছিলেন। আমি বারান্দা থেকে খেয়াল করলাম তিনি তন্ময় হয়ে জোছনা দেখছেন। আমার দিকে চোখ পড়তেই ডাকলেন। আমি গেলাম পুকুর ঘাটে। তিনি আমার কাছে কাগজ-কলম চাইলেন। পুরো বাড়ি খুঁজে কোথাও সাদা কাগজ পেলাম না। শেষমেশ রুলটানা একটা ডায়েরি ও কলম এনে দিয়ে আমি চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পর দেখলাম তিনি লিখছেন। তার কিছুক্ষণ পর তিনি সবাইকে ডাকলেন পুকুর ঘাটে। সবাই উপস্থিত হলে তিনি জানান, তিনি একটি গান লিখেছেন এবং গানটি লিখে তিনি বেশ আরাম পেয়েছেন। পড়ে শোনালেন সেই গান- ‘আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা…..’; মুগ্ধ হয়ে শুনলাম গানের কথাগুলো।

২. একটা ছিল সোনার কন্যা মেঘবরণ কেশ

ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ

দুই চোখে তার আহারে কি মায়া!

নদীর জলে পড়ল কন্যার ছায়া

তাহার কথা বলি

তাহার কথা বলতে বলতে নাও দৌড়াইয়া চলি।।

শাওন : এ গানটি নিয়ে মকসুদ জামিল মিন্টুর একটা স্মৃতিকথা মনে পড়ছে। ১৯৯৮ সাল। সাসটেইন স্টুডিও থেকে মকসুদ জামিলের কাছে ফোন আসে, হুমায়ূন আহমেদ স্টুডিওতে এসে বসে আছেন। তখন মকসুদ জামিলের কাছে হুমায়ূনের লেখা একটি গান, সুর করার জন্য দেয়া। কিন্তু মকসুদ জামিল তখনো সুর করেননি। তিনি ফোন পেয়েই স্টুডিওতে পৌঁছান। পৌঁছে দেখেন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সুবীর নন্দী বসে আছেন। হুমায়ূন আহমেদ মকসুদ জামিলকে দেখেই প্রশ্ন করেন, ‘ভাই সুর করতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? আমি তো খুব একটা গান লিখি না। ছন্দে সমস্যা থাকতে পারে।’

মকসুদ জামিল তখন হুমায়ূনকে বললেন, ‘আমাকে পত্রিকা এনে দিলেও সুর করে দিতে পারব। ছন্দ নিয়ে চিন্তা করার কোনো দরকার নেই।’

হুমায়ূন আহমেদ তখন হাসতে হাসতে বলেন, ‘তাহলে আর কষ্ট করে গান লিখলাম কেন! একটা পত্রিকা এনে দিলেই পারতাম।’

এরপর মকসুদ জামিল মিন্টু হুমায়ূন আহমেদের সামনেই এক লাইন এক লাইন করে সুর করলেন আর সুবীর নন্দী গাইতে লাগলেন। সৃষ্টি হলো একটা ছিল সোনার কন্যা।

৩. ও আমার উড়ালপঙ্খীরে

যা যা তুই উড়াল দিয়া যা

আমি থাকব মাটির ভরে

আমার চোক্ষে বৃষ্টি পড়ে

তোর হইবে মেঘের উপরে বাসা।।

শাওন : পারিবারিক চাপের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার কাজ প্রায় বন্ধ। আমার বাসা থেকে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। হুমায়ূনের উপরেও চাপ, যাতে আমাকে কাজে ডাকা না হয়। হুমায়ূন তখন ‘দখিন হাওয়া’য় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। ল্যান্ডফোনের যুগ। হুমায়ূন ফোন করলেও তা আমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছায় না। একরকম বিচ্ছেদের মতো অবস্থা। আমার মনটা এলোমেলো। আমার সেই অনন্ত বিরহ দিনে আমারই মতো বিরহে কাতর এক লেখক এই গানটি লিখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে গানটি ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়।

৪. চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে?

কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে?

তাহারে চিনি না আমি

সে আমারে চিনে।।

শাওন : মৃত্যু সঙ্গীতের প্রতি সব সময়ই এক ধরণের আগ্রহ ছিল হুমায়ূনের। ‘মরিলে কাঁন্দিস না আমার দায়’- গিয়াস উদ্দিনের এই গানটি হুমায়ূনের খুব প্রিয় ছিল। ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমা রাখতে চেয়েছিল তার প্রিয় এই গানটি। এই গানের সুরস্রষ্টা বিদিত লাল দাশকে সিলেট থেকে আনালেন গানটির জন্য। মিন্টু ভাইয়ের (মকসুদ জামিল মিন্টু) সঙ্গীতায়োজনে গানটির রেকর্ড করা হলো। সিনেমার শুটিং হওয়ার এক রাতে কি ভেবে কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন হুমায়ূন। একটানে লিখে ফেললেন, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে? কে আইসা দাঁড়াইছে আমার দুয়ারে? গানটি মিন্টু ভাইকে সুর করতে দেয়ার সময় যখন পড়ে শোনাচ্ছিলেন তখন টপটপ করে হুমায়ূনের চোখের জল পড়ছিল। গানটি পরবর্তী সময়ে ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমায় জায়গা করে নেয়।

৫. যদি মন কাঁদে

তুমি চলে এসো এক বরষায়

এসো ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে

জলভরা দৃষ্টিতে

এসো কোমল শ্যামল ছায়।

শাওন : ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ সিনেমার শুটিং চলছে ‘নুহাশ পল্লীতে’। প্রথমবারের মতো হুমায়ূনের শুটিংয়ে আমি অনুপস্থিত। উপায়ও নেই; আমার ভেতরে তখন নিষাদ হুমায়ূনের অস্তিত্ব অনুভব করছি। পুত্রের প্রতীক্ষায় অপেক্ষমাণ আমরা দুজন। শুটিংয়ের ফাঁকে ফোন করে হুমায়ূন, কথা হয়। তবুও যেন কত কথা বাকি থেকে যায়। মাঝে মাঝে মাঝরাত্রিরে ঢাকা চলে আসেন তিনি। রাতখানা গল্পে-গানে কাটিয়ে ভোর হতেই উপস্থিত হন শুটিংয়ে। যে দিন যে দিন হুমায়ূন চলে আসেন, সে দিন রাত্রিগুলো আমার কাছে ছোট হয়ে আসে। মনে হয় ‘ওমা! গতকালের রাতটাই না কত দীর্ঘ ছিল!’

ঝুম বর্ষা তখন। বৃষ্টির কারণে শুটিং বন্ধ। বারান্দায় একা হুমায়ূন। কি ভাবছিলেন তিনি? হাতের কাছে কাগজ-কলম নিয়ে লিখলেন কতগুলো লাইন। ফোন করে শোনালেন আমাকে। বললেন, ‘কালকের মধ্যেই চাই আমার।’ জানালেন টুটুল ভাইকেও। ঠিক করা হলো সে দিন সন্ধ্যায়ই মগবাজারে স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করে ফেলব আমরা।

সন্ধ্যায় গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি লিফট নষ্ট। স্টুডিও নয় তলায়। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা আমার সিঁড়ি বাওয়া নিষেধ। কিন্তু আমার গান যে হুমায়ূনের চাই! একতলা করে উঠি আর ২০ মিনিট করে বিশ্রাম নেই। টুটুল ভাইয়ের সহকারী মোড়া হাতে আমার পাশে পাশে। উফ্! কীভাবে যে নয়তলা পর্যন্ত উঠলাম!

পৌঁছে গানের ট্র্যাকটা শুনতে চাইলাম। টুটুল ভাই বললেন কিসের ট্র্যাক! এই গান ট্র্যাক দিলে হবে না। তোমাকে সুর তুলে দিচ্ছি, তুমি রেকর্ডিং বুথে গিয়ে খালি গলায় গেয়ে যাও।

বুথের ভেতরে আমি। আমাকে একটা উঁচু চেয়ারে বসিয়েছেন যাতে আমার কষ্ট না হয়। কানে হেডফোন; শুনতে পেলাম টুটুল ভাই একটু একটু হামিং করছেন। চোখ বন্ধ করলাম। আর তখনই স্পষ্ট দেখতে পেলাম, নুহাশ পল্লীর জল থৈ থৈ মাঠ, বারান্দায় একা বসে থাকা আমার অনাগত সন্তানের বাবা। মনে হলো সব কিছু ফেলে ছুটে যাই তার কাছে। আমার চোখে পানি চলে এল। জলভরা দৃষ্টি নিয়ে আমি গাইতে শুরু করলাম।

গ্রন্থনা :

:: শাকিল মাহমুদ

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj