ঐতিহাসিক ৯ নভেম্বর : বার্লিন দেয়াল পতনের ৩০ বছর

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতনে বদলে যায় পৃথিবী। কখনো কখনো বিশে^র ঘটনা খুব দ্রুত বদলাতে থাকে। কিন্তু যেভাবে ১৯৮৯ সালে নতুন নতুন ঘটনা এবং ক্ষমতার পরিবর্তন শুরু হয়, তার সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন ছিল। এর অন্যতম বার্লিন দেয়ালের পতন। আমলাতান্ত্রিক দুর্ঘটনায় ওই দেয়ালের আংশিক ভেঙ্গে পড়লেও এটির পুরোপুরি পতন ঘটে বিপ্লবী এক বিশাল জন¯্রােতের ধাক্কায়। এর মাধ্যমে সেখানে সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট শাসনের পতনের শুরু হয়। সূচনা ঘটে এক নতুন বিশ্বের।

ঘটনাটি ছিল ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর। এর পাঁচ দিন আগে থেকে প্রতিবাদ সমাবেশের অংশ হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দেয়ালের পূর্ব দিকে জড়ো হয়। সীমান্তের কড়াকড়ি তুলে দিয়ে এবং পূর্ব জার্মানির বাসিন্দাদের ভ্রমণ সহজ করে দিয়ে বিক্ষোভ শান্ত করার চেষ্টা চালায় পূর্ব জার্মানির নেতারা। কর্তৃপক্ষ যখন প্রথমবারের মতো নতুন এসব ঘোষণা পড়তে শুরু করে তখন সাংবাদিকরাও হতবাক হয়ে যান। ঘোষণায় বলা হয়, দেশের বাইরে ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য এখন থেকে আর কোনো পূর্বশর্ত প্রযোজ্য হবে না। খবরটি দ্রুত টেলিভিশনে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্ব জার্মানির বাসিন্দারা বিপুল সংখ্যায় সীমান্তে জড়ো হতে থাকেন। মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে। হাতেগোনা কয়েকজন প্রহরী নিয়ে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠেকাতে অবশ্য শক্তি প্রয়োগ করেও তখন আর কোনো কাজ হতো না। এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ রক্ষীদের ফটকের দরজা খুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়। আনন্দ আর কান্না করতে করতে হাজার হাজার মানুষ তখন সেখান দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে সারা পৃথিবীর মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অনেকে বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেট বেয়ে ওপরে উঠে হাতুড়ি আর কুঠার দিয়ে দেয়াল ভাঙতে শুরু করেন।

কিন্তু কেন বার্লিনের দেয়ালের পতন হলো? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার সাবেক মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ইউরোপ বিভক্ত হয়ে যায়। পশ্চিম থেকে পূর্বের দেশগুলোর মধ্যে ধীরে-ধীরে অভেদ্য একটি পর্দা তৈরি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরাজিত জার্মানি ভাগ হয়ে যায় দখলদার দেশগুলোর মধ্যে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে। দেশটির পূর্ব অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সোভিয়েতরা। পূর্ব জার্মানি, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক, তখন পশ্চিম ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আর বার্লিন ভাগ হয়ে যায় চারটি ভাগে। পশ্চিম অংশে যায় ব্রিটিশ, ফরাসি ও আমেরিকানরা, আর পূর্ব অংশে থাকে সোভিয়েতরা। পশ্চিম বার্লিন পরিণত হয় চারদিকে কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি ঘেরা একটি দ্বীপে। দেয়ালটি যদিও নির্মিত হয় ১৯৬১ সালে। কারণ তখন পূর্ব বার্লিন থেকে অনেক মানুষ পশ্চিম বার্লিন চলে যাচ্ছিল। ১৯৮০র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে এবং ব্যাপক খাদ্য সংকট শুরু হয়। মূলত ইউক্রেনের চেরনোবিলে ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রিয়্যাক্টর বিস্ফোরণ থেকেই কমিউনিস্ট ব্লুকের পতন শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় আসেন তুলনামূলক তরুণ নেতা মিখাইল গর্বাচেভ। তিনি গøাসনস্ত ও পেরস্ত্রইকা নামের নতুন সংস্কার নীতি শুরু করেন, যার অর্থ ‘কথা বলার স্বাধীনতা’ এবং ‘পুনর্গঠন’। কমিউনিস্ট এলাকাগুলোয় সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। পোল্যান্ডে কয়েক বছরের আন্দোলন এবং ধর্মঘটের ফলে ক্ষমতাসীন দল দেশটিতে নিষিদ্ধ সলিডারিটি ট্রেড ইউনিয়নকে আইনি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। সে বছর মার্চে হাঙ্গেরিতেও গণতন্ত্রের দাবিতে বিশাল সমাবেশ হয়। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ায় ২০ লাখ মানুষ তথাকথিত ‘সিংগিং রেভোলুশন’ নামে বিশাল সমাবেশ করে। বাল্টিক দেশগুলো স্বাধীনতার দাবিতে ৩৭০ মাইল লম্বা মানববন্ধন তৈরি করে। সেই উত্তাপের মধ্যেই পশ্চিম সীমান্তের দেশ অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয় হাঙ্গেরি, যার ফলে পূর্ব জার্মানির শরণার্থীরা আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে আসার সুযোগ পায়। আবার অক্টোবর নাগাদ চেকো¯েøাভাকিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেয় পূর্ব জার্মানি। ততক্ষণে পূর্ব জার্মানির ভেতরেই বিপ্লব ছড়িয়ে যায়। পূর্ব জার্মানির বিদ্রোহীরা লিপজিগ শহরের কেন্দ্রে জড়ো হয়।

পূর্ব জার্মানির ৪০ বর্ষপূর্তি উদযাপনের যখন আর কয়েক দিন বাকি তখন ৩ অক্টোবর ৭০ হাজার মানুষ লিপজিগের রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় এক মাস পরে, ৪ নভেম্বর পাঁচ লাখ মানুষ অ্যালেক্সান্ডার প্লাজায় সমবেত হয়। এর তিনদিন পরে সরকার পদত্যাগ করে। এর পাঁচ দিন পরে পতন ঘটে বার্লিন দেয়ালের।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj