পলাতক রফিকুল নাজিম

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

‘কেমন আছো, আবীর?’ নাকি জিজ্ঞেস করবে- ‘কিমুন আছোত, অকবি?’

আবীরের সামনে গেলে প্রথম কী দিয়ে শুরু করবে এটা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে সুদীপা। খুব শীতল গলায় নাকি কটকট করে জিজ্ঞেস করবে; আয়নার সামনে চলল কয়েকবার রিহার্সেল। আজ সুদীপার মনের অর্ধেকটা ফাগুনের রংয়ে রাঙানো আর বাকিটায় শোনা যায় শীতের ঝরাপাতার শব্দ। এখন সুদীপা যাচ্ছে আজিজ সুপার মার্কেট। এখানে বইঘরে দুজনের কেটেছে কতগুলো মিষ্টি বিকেল, পাখিদের নীড়ে ফেরা সন্ধ্যা। ঘরমুখো মানুষের ব্যাকুলতাকে উপেক্ষা করে ওরা বসতো বইঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে। রং চা আর সিগারেটের ধোঁয়ায় আবীর আঁকত কবিতার শরীর আর নিমগ্ন পাঠকের মতো চুলচেরা বিশ্লেষণ করত সুদীপা। আহা! সেই দিনগুলো কি দুর্ধর্ষ ছিল! ছন্নছাড়া, বাউণ্ডুলে সেই জীবনে ছিল কত রং, কত প্রেম ছিল, মান-অভিমান ছিল। আবার অহেতুক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ার পাগলামিও ছিল।

দীর্ঘ তেরো বছর নয় মাস তেইশ দিন পর গত পরশু ঢাকায় পা রাখল সুদীপা। ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার পর টরেন্টোতেই গড়েছিল স্থায়ী আবাস। আর এই শীতল শহরের ভেজা বাতাসে হু হু করে উল্টে গেল অনেকগুলো ক্যালেন্ডার, অনেকগুলো পাতা। এয়ারপোর্টে নেমেই সুদীপার চোখজোড়া খুঁজছে প্রিয় মানুষটাকে। শহুরে বাতাসে নাক রেখে খুঁজছে পরিচিত শরীরের সেই ঘ্রাণ।

বটতলায় বসে বাদামের খোসা ছাড়তে ছাড়তে সুদীপাকে আবীর জিজ্ঞেস করেছিল- ‘আমি যদি কোনো ক্লান্ত দুপুরে পুকুরের জলে ডুবে যাওয়া পাথরের টুকরোর মতো ডুবে যাই- তুই কি করবি?’

সুদীপা হাসতে হাসতে বলেছিল- ‘আমিও টুপ করে জলে ডুব দিমু। তোর কলার চাইপ্পা ধইরা পুকুর থেইকা তুইল্লা আনমু আর কিলামু।’ পরক্ষণেই কি যেন মনে করে আবার সুদীপা বলল- ‘নাহ। তোকে জল থেকে তুলমু না। আমরা দুজন পুকুরের তলদেশে গড়ে তুলমু প্রেমের সাম্রাজ্য। জলকেলি করমু জলে জলে।’

আবীর আবার বলল- ‘আচ্ছা ধর, একদিন যদি আমি এই মায়ার শহরের জনসমুদ্রে হারিয়ে যাই- কি করবি তুই?’

সুদীপা এবার ক্ষেপে গেল- ‘কি হচ্ছে এসব!’

‘নাহ, বল, প্লিজ’- কাতর গলায় বলল আবীর।

সুদীপা আবীরের কাঁধে হাতটা রেখে বলে- ‘এই পাগলটার শরীরের ঘ্রাণটা শুঁকে শুঁকে অকবিটাকে খুঁজে বের করব।’ কথাটা শুনে আবীরের বুকটা হঠাৎই প্রশস্ত হয়ে গেল। শিনা টানটান করে হাঁটতে লাগল সে টিএসসির দিকে। সুদীপা আলতো করে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল আবীরের বিশ্বস্ত কাঁধে।

এলিফ্যান্ট রোডের জ্যামে আটকে আছে গাড়ি। কালো গøাসের কাচে টকটক করে নক করছে একটা ৮-৯ বছরের মেয়ে। কাঠিতে ঝুলছে অনেকগুলো বেলিফুলের মালা। সুদীপা গøাসটা নামিয়ে থ বনে মেয়েটাকে দেখছে। ঠিক লতার মতোই চেহারা। ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে লতা প্রতিদিন আবীরকে একটা করে বেলিফুলের মালা দিত। কখনো টাকা নিত না। আর ও একটা ফুল নিলেই টাকা চাইতো! বলত- ‘আফা, আপ্নে বড়লোক মানুষ। ভাইয়ার সব ট্যাহা তো আমগো খাতা কলম জামা কাপড় কিন্নাই শেষ হইয়া যায়। আমগোরে গাছতলা লেহাপড়া করায় কত কষ্ট কইরা। ভাইয়া অনেক ভালা মানুষ। তাই ভাইয়ার কাছেত্তে ট্যাহা নেই না।’

কথাগুলো শুনে সুদীপার বুকটা তখন গর্বে ফুলে উঠত। অবশ্যই তা বরাবরই গোপন ছিল। তবে মাঝে মাঝে হিংসাও হতো।

প্রায় বিশ মিনিট হয় গাড়িটা জ্যামে আটকে আছে। সুদীপা ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে মোবাইলে কথা বলছে- রাতুল ভাই, কেমন আছেন? আমি আপনার দোকানে আসছি। আপনাকে পাব তো?

ওপাশ থেকে কি বলল বোঝা গেল না। তবে মন্দ কিছু নয় এটা বোঝা গেল। ছয় মাস আগে সুদীপা হঠাৎ ফেসবুকে রাতুলকে পায়। তারপর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। রাতুলও একসেপ্ট করে। এভাবেই আবার দুটোপথ এক হওয়ার আয়োজন চলে। আবীরের খোঁজ-খবর নিয়মিত নিতে থাকে সুদীপা।

সুদীপা খুব অস্থির হয়ে আছে আবীরকে দেখার জন্য। উত্তেজনা তার চোখে-মুখে স্পষ্টতই দৃশ্যমান। সময় যেন কাটছেই না। এবার গাড়িতে রাখা একটা পত্রিকার সাহিত্য পাতায় চোখ বুলাতেই পেয়ে গেল কবি আবীর রুদ্রের কবিতা ‘বর্গাচাষী’। অকবিটা চমৎকার লিখেছে। ওর লেখার হাত বরাবরই ভালো। তবে পাগলামি ও বাউণ্ডুলেপনা ওকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। কখনোই সিরিয়াস হলো না অকবিটা।

একবার সকাল ৭টায় সুদীপার হলগেটে দাঁড়িয়ে আবীর অনবরত কল দিয়েই যাচ্ছে। চোখ কচলাতে কচলাতে সুদীপা হলগেটে আসতেই আবীর খপ করে বুকে জড়িয়ে ধরল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সুদীপা কোনোরকম নিজেকে ছাড়িয়ে আশপাশটা দেখল। নাহ কেউ দেখেনি।

– এই কি হইছে তোর? আজকা এত্তো খুশি কেন্?

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটা দৈনিক পত্রিকা এগিয়ে দিয়ে বলল- ‘নে। পড়। আমার কবিতা ছাপাইছে রে, টুনটুনি। তরে কইছিলাম না, আমার কবিতা ছাপাইবোই। দেখছোত!’

সুদীপা পত্রিকাটা বুকে চেপে ধরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে পাগলটার দিকে। কি সহজে একটা মানুষ এতটা খুশি হয়! খুব অল্পতেই খুশি ছিল আবীর। হঠাৎ সুদীপা খেয়াল করে আবীরের দুপায়ে দুরংয়ের স্যান্ডেল। তারপর মুচকি হেসে বলে, ‘হইছে, অকবি। এবার হলে যা। হুম, মানলাম আপ্নে অনেক বড় কবি হইয়া গেছেন। এখন হলে যা গিয়া।’

স্মৃতিটা মনে করে সুদীপা একা একা হাসতে হাসতে দেখে আজিজের সামনে গাড়িটা চলে এসেছে।

বইঘরের সামনে যেতেই রাতুল সুদীপাকে এগিয়ে নিয়ে গেল ভেতরে। সুদীপা দোকানে ঢুকতে ঢুকতে খেয়াল করে উত্তর-পূর্ব কর্নারে দুটো টুল আজো পাতা আছে। যেখানে বসে আবীর আর সুদীপা প্রেমের নোঙর করত। শব্দ টিপে টিপে কবিতার টেরাকোটা বানাতো আবীর। আর তাতে মুগ্ধ হতো সুদীপা।

– সুদীপা, কি খাবে? ব্লু্যাক কফি চলবে?

– না, রং চা খাব। রাতুল ভাই, পাগলাটা কি জানতো আমি আসব?

– হুম। জানত। মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করত।

– তাই?

– হুম।

বলতে বলতে চা আর শিঙ্গারা চলে এল।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই সুদীপা রাতুলকে জিজ্ঞেস করল, কাসেম মামা এখনো আছে?

– হ্যাঁ। তবে কেমনে বুঝলে!

– এই যে চা। এই চা তো আর কেউ বানাতে পারবে না।

– হুম। ভালোই মনে রেখেছো সবকিছু।

– কি যে বলেন, রাতুল ভাই। আচ্ছা রাতুল ভাই, ক্ষ্যাপাটা এখন কই? কখন আসবে এখানে?

রাতুল কোনো উত্তর না দিয়ে ড্রয়ার হাতড়ে বের করে তেরোটা খেরোখাতা। সুদীপাকে দিয়ে বলে, দেখো।

সুদীপা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টায়। প্রতিটা খাতার ওপর সাল লেখা আছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের খাতাও আছে। এগুলো বইঘরের আয়-ব্যয়ের খাতা। খাতার শেষদিকে ৩০/৪০ টা করে কবিতাও আছে। মাঝে মাঝে পাগলার হাতের আঁকিবুঁকিও আছে। কোথাও কোথাও শূন্যস্থান পূরণ খেলা। ও একা একাই খেলত।

– এগুলো দিয়ে আমি কি করব, রাতুল ভাই? আর আবীরই বা কোথায়? প্লিজ বলেন কিছু। আমি ওকে একবার দেখব শুধু। আর একটা কথা শুধু জিজ্ঞেস করব- ‘সে দিন কেন সে পালিয়ে গিয়েছিল?’

রাতুল এবার একটা নীল খাম এগিয়ে দিয়ে বলল- ‘আবীর তোমাকে খাতাগুলো আর খামটা দিতে বলেছে।’

রাতুলের ডান চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রæ। আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তবুও টুপ করে জলটা নিচে পড়ল।

সুদীপা কাঁপা কাঁপা হাতে ছিঁড়ল খামটা। আবীরের চিরকুটে লেখা-

প্রিয় টুনটুনি,

তুইও ভালো নেই- জানি আমি। আমি কিন্তু বেশ আছি।

দেখ, সপ্তর্ষির পাশে ঐ যে বড় তারাটা দেখছিস, ওটাই আমি। তুই আর আমি অনেকদিন একত্রে তারাগুলো গুনেছি। কতগুলো তারা আমাদের সঙ্গে কথাও বলত। মনে আছে? আমি জানতাম তুই ফিরবি। তবে আমি সে দিন থাকব না- এটা আমি খুব মানতাম।

আজ তাই তো হলো। তুই এলি, আর আমি নেই। তোর সঙ্গে করা আমার পাগলামির স্মৃতিগুলো আমাকে তিলে তিলে খুন করেছে। জানিস তোর মতো আর কেউ আমাকে বুঝত না রে। আমার পাগলামিগুলো সহ্য করার মতো একজনকেই স্রষ্টা আমার কাছে পাঠিয়েছিল। চালচুলাহীন অকবি আমি। তাইতো তোকে ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের কাছে স¤প্রদান করে পালিয়ে গিয়েছিলাম সেই রাতে। আর বেঁচে গেছিস তুই। আমি আবারো পালাইলাম রে।

ওহ, শোন, মনে করে একবার খেয়াটা দেখে যাস। ছোট ছোট সোনা মুখগুলোকে আদর করে যাস। ভালোবাসাগুলো ভালো থাক রে।

ইতি, তোর অকবি।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই গাছটায় এখনো ঝুলে আছে সাইনবোর্ড। বড় করে লেখা ‘খেয়া’। গাছতলায় ব্লু্যাকবোর্ড ঝুলিয়ে পড়াচ্ছেন একজন তরুণ, পাশেই বসা লাস্যময়ী এক তরুণী। হয়তো আবীর-সুদীপার মতো ওরাও খেয়ায় স্বপ্ন আঁকে। সুদীপা দ্রুত হাতে চকোলেট, কিছু নতুন জামাকাপড়, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে পালাতে চাইছে। সুদীপার খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মাথা থেকে সানগøাসটা চোখে নামিয়ে রাখে। কাঁচা পয়সার মতো চকচকে চোখটা আড়াল হয়। আড়াল হয় সুদীপা আর আবীর। তবুও আবীর মাখানো সন্ধ্যার নিয়ন আলোয় ঠুকরে কাঁদে শহুরে রাস্তা। কালো পিচঢালা রাস্তাটা শোককে বুকে ধরে রাখবে আজীবন। শুধু এই শহরটা জানবে না আজ সুদীপার বুকে কতটুকুন মেঘ জমেছে!

:: মাধবপুর, হবিগঞ্জ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj