বেলা শেষে : মোমেনা আক্তার

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

গ্রামে মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে বউ নিয়ে ঢাকায় আসে তুহিন। দীর্ঘাঙ্গী, গৌরবর্ণ, রূপসী, পর্দানশীল মেয়ে মিলা। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের সময় মনে হয় সে এক অপার্থিব কণ্ঠসুষমার অধিকারী। বয়স কম। কিন্তু তুহিন বউকে মেনে নিতে পারছে না। বউকে একা বাসায় রেখে বাইরে তালা দিয়ে অফিসে যায়। সারাদিন অফিস করে এসে যখন না খেয়ে শুয়ে পড়ে, তখন একদিন মিলার মুখে একটু কথা শুনতে হয়।

– একি, শুইয়া পড়লেন যে! তাইলে খিচুরি কার জন্যে পাক করলাম? এই যে ঘুমিয়ে পড়ছেন নাকি! ভাবলাম দুজনে খিচুরি খাইয়া অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করমু, আপনি তো আগেই ঘুমাইয়া পড়লেন। এই যে শুনতাছেন?…

– কানের কাছে এত প্যান প্যান করবেন না তো। আমি খেয়ে আসছি, আপনি খেয়ে শুয়ে পড়ুন।

হাস্যোজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তের মধ্যেই মলিন হয়ে যায়। আসলে এমন মানুষ কোনো জন্মেও দেখেনি মিলা। এত এত অবহেলা! স্বামী হিসেবে তাকে সামান্য খেয়ালও রাখে না। ঢাকা শহর নিয়ে কত স্বপ্ন দেখে মিলা। দুজনে একসঙ্গে রিকশায় বা পা হেঁটে পুরো শহর ঘুরবে। জীবনের প্রথমবারের মতো ঢাকা শহরে আসা বলে কথা। সারাদিন সে শুধু ভাবে, কবে সেই দিন আসবে? ভাবতে ভাবতে সে খাওয়ার কথা ভুলে যায়। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, তারপর দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। হাসি-ভরা মুখ নিয়ে দরজা খোলে এবং সিদ্ধান্ত নেয় তুহিনকে আজ ঘোরার কথা বলবেই। কিন্তু ওর সামনে দাঁড়ালে ঠোঁটজোড়া কাঁপতে থাকে। আর কিছু বলা হয়ে ওঠে না। থাক, পরে একসময় বলবে; এখন তার মাথা গরম।

তুহিনের সহকর্মীরা নতুন বউকে দেখতে চায়। প্রায় প্রতিদিনই তারা বাসায় আসার দাওয়াত চেয়ে বসে। কোনো রকমে এটা-ওটা বলে পাশ কাটায় সে। তবে তুহিন এটাও জানে, ওরা এলে মিলা খুব যতেœর সঙ্গে আপ্যায়ন করতে পারবে। তারপরও কেমন যেন মনে ধরে না। গেয়ো মেয়ে, ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। মা বলেছেন, ঢাকার বাতাস পেয়ে পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর কতদিন লাগবে? আবার পাশের রুমের ভাবি এসে গল্প শুরু করলে তুহিন প্রচণ্ড বিরক্ত হয়। মিলাকে বলে দিয়েছে উনারা আর যেন না আসেন! দরজা খোলা যাবে না।

ওমা, এটা বলা সম্ভব কীভাবে? খুব অবাক হয় মিলা। তুহিন এমন কেন! যদিও ছোটবেলা থেকেই চেনে, কিন্তু কখনো এমন মনে হয়নি। সেও তো একজন মানুষ; স্ত্রী হিসেবে তারও আবেদন-নিবেদন, আবেগ-অনুভূতি থাকতেই পারে। এসব কোনো কিছুরই কি দাম নেই তুহিনের কাছে? আর যদি দাম নাই বা থাকে বিয়ে করল কেন? এটা তো কোনো জোরের বিষয় না। জোর করে কোনো সংসার টিকিয়ে রাখা যায় না।

একদিন ভাবি এসে তুহিনকে হেসে হেসে বলে, ‘ভাই, আমরা তো পাশাপাশিই থাকি, তাই না? ওভাবে ভাবিকে তালা দিয়ে যান কেন? কথাবার্তা বললে তো ভালো লাগে…’

– না ভাবি, ওই হয়েছে কি… ও তো ঢাকা শহর চিনে না। যদি…

– কিচ্ছু হবে না, আমরা আছি না? সব চিনিয়ে দেব।

মুখের ওপর আর কিছু না বললেও মনে মনে যে কী হয়, তা মিলা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। মিলা কিন্তু ভীষণ খুশি। মুক্ত পাখির মতো মুক্ত হাওয়ার স্বাদ পাবে!

পরদিন তুহিন অফিসে গেলে ভাবিকে নিয়ে ঘুরতে যায় মিলা। এ নগর যেখানে সবার কাছে নোংরা ও বিরক্তিকর জায়গা, সেখানে তার কাছে কত আকর্ষণীয়! লালবাগ কেল্লা, বুয়েট ক্যাম্পাস, নীলক্ষেত, টিএসসি, কার্জন হল সব কিছু দেখে মিলা কি যে খুশি! তুহিন আজ থাকলে আরো ভালো লাগত। নগরের সব কিছু তার ভালো লাগে। সে তো হবেই, কারণ এখানের নিষ্ঠুরতা যে এখনো মিলাকে স্পর্শ করেনি। মাত্র ৯ দিন হলো সে ঢাকায় এসেছে।

কার্জন হল পেরিয়ে ওরা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সামনে এলে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। ওদের বাসা বংশালে, তাই এখন বংশালের দিকেই রওনা দিবে। কিন্তু স্টেডিয়াম পেরিয়ে যখন গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিল, পেছন থেকে হঠাৎ মিলা হারিয়ে যায়। খুব আতঙ্কের বিষয়। ওর কাছে কোনো ফোনও ছিল না। ভাবি অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেলে পুলিশকে জানিয়ে বাসায় চলে যান।

রাত ৮.৩০ দিকে মতিঝিল থানা থেকে তুহিনকে ফোন করে, মিলাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। লোকজনের ভিড়ে সে আর ভাবিকে দেখতে পায়নি, রাস্তা ভুলে মতিঝিলের দিকে চলে গিয়েছিল। এদিকে বংশালের নাম মনে ছিল না। বাসায় আসার পর তুহিন মিলাকে বলে, ‘আপনি আগামীকালই গ্রামে চলে যাবেন, আমি বাসে তুলে দিব।’

– আফনি যাইবেন না ক্যান? জানেন, আজ না খুব ভয় পাইছিলাম! চিল্লাইয়া ভাবিরে ডাকতেছিলাম। মানুষজন কি পাষাণ! খাড়াইয়া খাড়াইয়া আমারে দেকতেছিল, কেউ ভাবিরে খুঁজে দেয় না। পরে এক পুলিশ স্যার…

– হয়েছে, আর কথা শুনতে চাচ্ছি না, কাল আপনি একাই যাবেন। আরো কথা আছে, আর কোনোদিনই ঢাকায় আসতে পারবেন না। মানে আমাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না। আমি আর পারছি না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।

মিলার মাথায় যেন বাজ পড়ে। কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু চোখ যেন ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, তাইতো আর জলকে আটকাতে পারেনি।

এরপর মিলার শত আকুতি-মিনতিতে মন গলে না তুহিনের। সে গ্রামে যেতে না চাইলে তালাকের হুমকি পর্যন্ত দেয়। অবশেষে মিলা রাজি হয়। পরদিনই গ্রামে চলে যায় সে এবং দুদিন পর আত্মহত্যা করে। কিছুদিন মামলা চলার পর টাকা-পয়সা দিয়ে সব ম্যানেজ করে নেয় তুহিন। এরপর পছন্দের সহকর্মীকে বিয়ে করে ফেলে। বেশ ভালোই কেটে যায় সংসার জীবন।

৪০ বছর পর এক রাতে নাতনি মালিহিম মিলা বলে, ‘ও দাদু, এত আগে কেন ঘুমিয়ে পড়লে? মা খিচুরি রান্না করছে। উঠো, উঠো… খিচুরি খেয়ে আজ তোমার সঙ্গে গল্প করব।’

এ কি! নাতনিও যে মিলার মতো খিচুরি ভীষণ পছন্দ করে, মিলার সঙ্গে ওর অনেক মিল। যদিও মিলার সঙ্গে ওর কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই তবুও চোখ, নাক আর ঠোঁটযুগল যেন মিলারই কার্বন কপি। ওর চাহনিতে যেন মিলাই তাকিয়ে আছে।

গভীর রাতে মিলা ডাকে; তার প্রথম বউ মিলা। হাতছানি দিয়ে ডাকে- ‘আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেন। বলেন, আমার কী অপরাধ ছিল?’

কথাটা প্রতিধ্বনি হয়ে কয়েকবার বাজতে থাকলে তুহিন জেগে ওঠে। সামনে অন্ধকারে মিলার ছায়া দেখতে পায়। জোর গলায় বলে- মিলা, আমায় ক্ষমা করো। আমি অনেক ভুল করেছি, অনেক। কিন্তু জানো, তোমাকে হারানোর পর সারাক্ষণ মনের গহিনে কেবল তোমাকেই মনে পড়ে। মিলা…মিলা…

লাইট জ্বললে, সামনে মালিহিম মিলাকে দেখতে পায়, পাশে ছেলের বউও দাঁড়িয়ে।

মালিহিম মিলা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে- ‘দাদু, তোমার কী হয়েছে এত রাতে আমাকে ডাকছিলে কেন? তুমি না আমার সঙ্গে গল্প…’

কথা শেষ না হতেই নাতিকে বুকে জড়িয়ে অশ্রæমিশ্রিত নয়নে তুহিন বলে ওঠে- ‘আমি মিলাকে ছাড়লেও মিলা আমাকে ছাড়েনি, তোর মাঝেই বেঁচে আছে।’

এ কথা শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ছেলের বউ।

:: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj