অধিকার : আল ফাতাহ মামুন

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

রিকশার প্যাডেলে পা ঘুরাতে ঘুরাতে যখন টিএসসির মোড় পার হয় বাদশাহ মিয়া, তখন তার মনেও কুলসুমকে নিয়ে এক কোণে বসার স্বাদ জাগে। ঢাকা শহরের সব মানুষকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করে- ভালোবেসে সেও হাত ধরতে জানে। জানে প্রকাশ্যে চুমু খেতে। চুমু খাওয়ার দৃশ্য মনে ভেসে উঠতেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে বাদশাহর ছোপ ছোপ দাড়ি ভরা কালো গাল দুটো। আগের চেয়ে আরো জোরে প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে চলে আসে নিউমার্কেটের দু’নম্বর গেটে। পেসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে গেণ্ডারিয়া বস্তির উদ্দেশ্যে আবার প্যাডেল ঘুরাতে থাকে বাদশা মিয়া।

বাদশাহ মিয়া এখন দাঁড়িয়ে আছে গেণ্ডারিয়া বস্তির পেছনের ঝোপের আড়ালে। এখানে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। কুলসুমের সঙ্গে দেখা করার নিরাপদ স্থান এটিই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে কুলসুম বাদশাহর চোখ চেপে ধরল। বাদশাহ জোরাজুরি না করে কুলসুমের হাতে আলতো করে স্পর্শ বুলিয়ে দিল। কুলসুমের মনে হলো এ স্পর্শ কত চেনা। জনম জনম এভাবেই যদি বাদশাহ তাকে ছুঁয়ে থাকত! নীরবতা ভেঙে কুলসুম বলল- ‘তা বাদশা মিয়া! আমারে সিনেমা দেখতে লইয়া যাইবা কবে?’

– ‘তুমি কবে যাইতে চাও?’

– ‘শনিবারে। না না রবিবারে। তোমার রিকশায় চইরা সিনেমা দেখতে যামু।’

– ‘আমি ভাবছি, তোমারে নিয়া টিএসসি চত্বরে ঘুইরা আসমু। তুমি-আমি পাশাপাশি বইসা, হাতে হাত রাইখা, চোখ বন্ধ কইরা, ঠোঁটে ঠোঁট…’

– ‘অইছে! আর সামনে বাইরেন না। এত মানুষের সামনে আফনে রঙ করবেন- হেই সাহস না আফনের আছে, না আছে আমার। পেরেম করতাছি, তাই বইলা তো লজ্জা শরমের মাথা খাই নাই।’

– ‘ও কুলসুম! আমার অনেক দিনের ইচ্ছা তোমারে নিয়া টিএসসিতে বসমু। কত মানুষ যে তার মনের মানুষরে লইয়া অইহানে বইয়া থাকে। তুমি না কইরো না সোনা পাখি।’

– ‘হাছাই তুমি আমারে নিয়া টিএসসি যাইবা? আমার হাত ধরবা? আমারে…’

– ‘হ। হাছাই।’

– ‘ও আল্লাহ! আমার যে কী আনন্দ লাগতেছে। কবে আইব রবিবার…!’

২.

বাদশাহ মিয়া প্যাডেলে পা ঘুরাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে রিকশা চালানোর জীবন সার্থক। মনের মানুষ কুলসুম আজ তার যাত্রী। আজ সে কুলসুমকে নিয়ে টিএসসির এক কোণে বসবে। হাত ধরে সবাইকে দেখাবে তার জীবনেও প্রেম-ভালোবাসা আছে। অন্য দশজনের চেয়ে ভালোবাসায় কোনোভাবেই সে পিছিয়ে নেই। রিকশা থামল জনতা ব্যাংকের মোড়ে। রিকশা থেকে নেমে দুজনেই এগিয়ে যাচ্ছে টিএসসির দিকে। কুলসুম বলল- ‘বাদশাহ! ফুসকা খামু।’

কুলসুম এক মনে ফুসকা খেয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে চার নম্বর বাটি শেষ হলো। ঝালে হি হি করতে করতে কুলসুম বলল- ‘অহন থাক। যাওনের সময় আবার এক বাটি খাইয়া যামুনে। লও কুনোহানে গিয়া বহি।’

জনতা ব্যাংকের দিকে মুখ করে বসল দুজনে। তাদের পাশে এসে বসল ছাত্রনেতা রাসেল চৌধুরী। সঙ্গে গার্লফ্রেন্ডও আছে তার। মুহূর্তেই মধ্যেই কয়েকজন এসে ঘিরে ফেলল বাদশাহ ও কুলসুমকে। কলার ধরে বাদশাহকে জিজ্ঞেস করল- ‘মামা! কয় টেকা দিয়া ‘মাল’ ভাড়া করছো?’

ভেতরে প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও বাইরে অসহায় ভাব নিয়ে বলল- ‘না মামা। এইডা আমার বউ। গত মাসে কোর্ট ম্যারেজ করছি আমরা। কাবিননামা লগেই আছে।’ জরুরি কাগজপত্র রিকশার সিটের নিচে রাখার অভ্যাস বাদশাহ মিয়ার। সঙ্গে থাকলে হারানোর ভয় নেই তাই।

– ‘বান্দিরপো চুপ কর। তোর পাশে কেডা বইছে, দেহছ নাই? রাসেল ভাই। আমাগো নেতা। লগে ভাবিও আছে। আর তুই হের পাশে বইসা পিরিতি মারাইতাছস? তোর সাহস তো কম না! মাইর খাওনের আগে ভাগ কইলাম।’

– ভালোবাসার অধিকার কি শুধু রাসেল ভাইদেরই আছে? আমাগো নাই- প্রশ্নটা গলা পর্যন্ত এসেও মুখে আসল না। ঢোক গিলে বলল- ‘ভুল অইয়া গ্যাছে। মাফ কইরা দেন’।

৩.

গেণ্ডারিয়া বস্তির পেছনের ঝোপে হাত ধরাধরি করে বসে আছে কুলসুম-বাদশাহ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বাদশাহ হঠাৎ বলে উঠল- ‘কুলসুম! এতদিন জানতাম গরিবের অনেক অধিকারই থাকে না। ভালোবাসার অধিকারও যে নাই- এইডা আইজ বুঝলাম।’

কুলসুম কোনো প্রতিত্তুর না করে বাদশাহকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল- ‘আরে পাগল! কে বলল- গরিবের ভালোবাসার অধিকার নাই। এই যে তোমারে আমি জড়ায়ে ধইরা আছি, তোমার ঠোঁটে আমার ঠোঁট রাখছি- কই? কেউ তো আমাগোরে নিষেধ করতাছে না।’

বাদশাহ কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। আরো শক্ত করে কুলসুমকে জড়িয়ে ধরল।

:: ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj