মুগ্ধতা ছড়িয়ে শেষ হলো রবীন্দ্র স্মরণোৎসব

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

জাহিদুল ইসলাম, সিলেট ব্যুরো : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে উপক‚ল যখন উত্তাল, সারা দেশের আকাশে যখন কালো মেঘের ঘনঘটা; ঠিক সে সময়ই সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে মুগ্ধতা ছড়ালেন একঝাঁক তারকা শিল্পী। তাদের সুরের মূর্ছনায় সম্মোহিত হলেন সিলেটের কয়েক হাজার দর্শক। রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা আর জীবনালোচনায় তাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠল গতকালের বিকেল।

গতকাল শুক্রবার ছিল চার দিনব্যাপী ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ এর সমাপনী দিন। রবিঠাকুরের অমর শিশুতোষ কবিতা ‘বীরপুরুষ’ আবৃত্তির মাধ্যমে বিকেলে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন সিলেটের শিশু শিল্পীরা। তারপর একে একে সম্মিলিত আবৃত্তি, সঙ্গীতের মোহনীয়তায় মজেন উপস্থিত দর্শকরা। অনুষ্ঠান যত গড়িয়েছে দর্শক সমাগম ততই বেড়েছে। একটা সময় তিল ধারণের জায়গা ছিল না সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে, দর্শক সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষী ও স্বেচ্ছাসেবকদের। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও গান পরিবেশন করেন বাংলাদেশের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, লাইসা আহমেদ লিসা, ড. অনুপম কুমার পাল, ড. অসীম দত্ত,

আমিনুল ইসলাম লিটন এবং ভারতের মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মশ্রী পূর্ণদাস বাউল ও অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ খ্যাতিমান শিল্পিরা।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম বোর্ডের সদস্য ড. ইনাম আহমদ চৌধুরী, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ও আসামের গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের সাবেক ডিন ঊষা রঞ্জন ভট্টাচার্য। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৩ আসনের সাংসদ মাহমুদুস সামাদ কয়েস, সাবেক সাংসদ জেবুন্নেসা হক, সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম, এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া, সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী বিধায়ক রায় চৌধুরী, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহমদ আল কবিরসহ সিলেটের বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরের কর্মকর্তা, সিটি কাউন্সিলর ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আগে স্বল্প পরিসরের আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের কাছে সিলেটে একটি কালচারাল সেন্টার স্থাপনের দাবি জানান। বিশেষ অতিথির বক্তব্যের শুরুতেই এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সিলেটবাসী ও আয়োজক কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান প্রতিমন্ত্রী। এরপর তিনি কবিগুরুর স্মরণে বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তব্যে শেষাংশে সিলেটে একটি কালচারাল সেন্টার স্থাপনের দাবি মেনে নিয়ে তিনি বলেন, আজ সিলেটবাসীর এই আয়োজন দেখে আমি সত্যি অভিভূত। আমারও মনে হচ্ছে সিলেটে এমন একটি কালচারাল সেন্টার হোক যেখানে সংস্কৃতিচর্চা হবে, গবেষণা হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, সিলেট এক পুণ্যভূমি, যেখানে শাহজালাল (রহ.) এর আগমন ঘটেছে। এটি শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি। এই মাটিতেই জন্মেছেন হাছন রাজা, সৈয়দ শাহনুর, আরকুম শাহ, সীতালং শাহ ও বাউল আব্দুল করিম। এই মাটির প্রতি রবিঠাকুরের ভালোবাসাও ছিল অসীম। সিলেটকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামে যুক্ত করার সময় তিনি ব্যথিত হয়েছেন। তিনি যখন সিলেট আসেন ১৯১৯ সালে, তখন তিনি ইংরেজদের দেয়া নাইট উপাধি ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সিলেটে এসে তিনি এতই মুগ্ধ হয়েছেন যে, তিনি সিলেটকে ‘শ্রীভূমি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মন্ত্রী সবাইকে রবীন্দ্রনাথের দর্শনের প্রতি অনুপ্রাণিত হতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ বিশ্বের প্রতিটা দেশে এক অস্থির সময় যাচ্ছে। সবাই হানাহানি আর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধা, একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা না থাকা। রবিঠাকুর আমাদের একে অন্যকে শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর যুক্ত থাকার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণবশত তিনি যোগ দিতে পারেননি। সে জন্য তার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটবাসীকে অভিনন্দন জানান।

এরপর সাবেক অর্থমন্ত্রী ও অনুষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবুল মাল আবদুল মুহিত উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তারপরই শুরু হয় দেশবরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনা।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj