দুর্নীতির আখড়া চট্টগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা : চেইনম্যান কোটি কোটি টাকার মালিক

শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯

চট্টগ্রাম অফিস : ভূমি অফিসগুলোতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পরও ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় থেমে নেই অনিয়ম-দুর্নীতি। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জিম্মি করে লুটপাটের মহোৎসবে মেতে উঠেছেন কানুনগো, চেইনম্যান, সার্ভেয়ার থেকে শুরু করে কয়েকজন কর্মকর্তা। এ ছাড়া লুটপাটের অংশীদার হিসেবে বহিরাগতদের নিয়ে এলএ শাখার কর্মকর্তারা তৈরি করেছেন সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। এলএ শাখা ঘিরে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিষয় জেনেও না জানার মতো রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। ফটিকছড়ি উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত চেইনম্যান নজরুল ইসলাম এভাবে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। গত বৃহস্পতিবার এই নজরুল ইসলাম দুদকের জালে ধরা পড়লেও তার সঙ্গী-সাথী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো অধরা রয়ে গেছেন। এলএ শাখার সব প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়া এখন

নিত্যদিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না এখানে, প্রতি টেবিলে টেবিলে ঘুষ বাণিজ্য। সূত্র জানায়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমির অবকাঠামোগত অবস্থান নির্ণয়ের জরিপ, জমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিগ্রস্তদের জমির মূল্য নির্ধারণ এবং চেক প্রদানের সময়ই মূলত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। অহেতুক হয়রানি করা হয় ক্ষতিগ্রস্তদের, এ থেকে পরিত্রাণ পেতেই অনেকেই তাদের উৎকোচ দিতে বাধ্য করা হয়। উৎকোচ না দিলে বিভিন্ন মামলায় ফাইল আটকে দেয়া হয়। এলএ শাখার অধীনে এসব হরিলুটের জন্য কাজ করে শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ভাগ দিয়ে এসব কাজ করেন দালাল ও সার্ভেয়াররা। অভিযোগ আছে, কমিশন না দিলে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া যেত না। এ চক্রকে ক্ষতিপূরণের অন্তত ১৩ শতাংশ টাকা দিলে তবেই মিলত ক্ষতিপূরণের টাকা।

গত ৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর ষোলো শহরের চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে গ্রাহক থেকে চট্টগ্রাম জেলার ভূমি শাখার বিভিন্ন গ্রাহকের অগ্রিম নেয়া ঘুষের নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকাসহ ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার চেকসহ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার এক চেইনম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। এ সময় বিভিন্ন গ্রাহকের জায়গার দলিল, ভূমি অধিগ্রহণের মূল্যবান কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- জেলা প্রশাসন অফিসের এলএ শাখার চেইনম্যান ও ফটিকছড়ি উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত নজরুল ইসলাম (৫৫) ও জেলা প্রশাসনের পিয়ন তসলিম উদ্দিন (৩৩)। নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে দুদক জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর ১০ জনের একটি টিম এই অভিযান পরিচালনা করেন।

দুদক সূত্রে জানা যায়, হটলাইন-১০৬ এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের এনফোর্সমেন্টের একটি টিম অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। দুদক জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ উপসহকারী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, গ্রেপ্তার নজরুল ইসলামের চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সে ৩টি দোকান রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন বিকালে ভূমি অধিগ্রহণ, জায়গা-জমির দলিলসংক্রান্ত কাজে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে অবৈধ লেনদেন হয়। এতে বিভিন্ন গ্রাহক থেকে অগ্রিম নেয়া ঘুষের ৯১ লাখ টাকার ১২টি চেক ও নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। তিনি আরো বলেন, এসব দোকানের দুটি তার নামে ও একটি স্ত্রীর নামে নেয়া হয়। এ ছাড়া স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট ও একটি প্রাইভেটকারও রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুদক সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ বলেন, নজরুল ওই নগদ টাকার কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া দোকানে এদিন কোনো বেচাকেনাও হয়নি। মূলত জমি অধিগ্রহণের নামে চেকগুলোর টাকা উত্তোলন করে ঘুষ বাবদ অগ্রিম টাকা নেয়া হয়েছিল। তাই ওই দোকানের মালিক নজরুলকে আটক করা হয়েছে। শপিং কমপ্লেক্সস্থ আনুকা নামক দোকানের মালিক নজরুল বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে চেইনম্যান (শিকল বাহক) হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এলএ শাখায় কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তাকে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বদলি করা হয়।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj