মঈন উদ্দীন খান বাদল : আরেক মহিরুহ রাজনীতিকের বিদায়

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী পরিষদের সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল (৬৭) মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে নারায়ণ ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে দেয়া জোরালো বক্তব্যের জন্য বাদল তুখোড় বক্তা ও একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠনেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য বাদল একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

বাদলের ছোট ভাই মনির উদ্দীন খান জানান, দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার পর থেকেই বাদল অসুস্থ ছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে নিয়মিত চেকআপের জন্য তিনি ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে যান। সেখানে প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি গতকাল ভোরে না ফেরার দেশে চলে যান। বাদলের মরদেহ দেশে আনা এবং শেষকৃত্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে পরে তা জানিয়ে দেয়া হবে বলেও মনির উদ্দীন খান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক : বাদলের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় বলেন, মরহুম মঈন উদ্দীন খান বাদল জাতীয় সংসদের বিভিন্ন কমিটিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গঠনমূলক মতামত প্রদান করে সংসদ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রপতি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বলেন, বাদলের মৃত্যুতে দেশ একজন দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদকে হারাল। দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকার কথা দেশবাসী স্মরণ করবে। শেখ হাসিনা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন : মঈন উদ্দীন খান বাদল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের ‘নিউক্লিয়াসে’ যুক্ত বাদল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাস প্রতিরোধের তিনি অন্যতম নেতৃত্বদাতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। জাসদ হয়ে বাসদ এবং পরে আবারো জাসদে ফেরেন। এরশাদের সামরিক শাসনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। ২০১৬ সালের ১২ মার্চ জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে আবার দুই ভাগ হয় এই বাম সংগঠনটি। হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতার নেতৃত্বাধীন অংশটি ইসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান নেতৃত্বাধীন অংশটি বাংলাদেশ জাসদ নামে আলাদা দলের স্বীকৃতি চায়। তবে ইসি তাদের নিবন্ধন দেয়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

তিনি ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে বড় জয় পান। তার জয়ের মধ্য দিয়ে ওই আসনে বিএনপির দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে আরো দুই বার তিনি ওই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মঈন উদ্দীন খান বাদল স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj