চিরনিদ্রায় সাদেক হোসেন খোকা : শেষ শ্রদ্ধায় এক কাতারে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিন্দ্রায় শায়িত হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মতানৈক্য ভুলে এক কাতারে দাঁড়ান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতারা। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে সাদেক হোসেন খোকার লাশ রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। খোকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর বিমানবন্দর থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে নেয়া হয় মরদেহ। বেলা সোয়া ১১টায় দক্ষিণ প্লাজায় খোকার দ্বিতীয় জানাজায় (দেশে প্রথম) অংশ নেন ডা. এ কিউ এম বরুদ্দোজা চৌধুরী, তোফায়েল আহম্মেদ, মির্জা ফখরুল, মওদুদ আহমদ, আ স ম ফিরোজ, মেজর অব. আবদুল মান্নান, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, রাশেদ খান মেনন, মশিউর রহমান রাঙ্গা, ড. মাহবুব উল্লাহ, মেজর জেনারেল অব. সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম, সাবের হোসেন চৌধুরী, শামসুল হক টুকু, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, জমিরউদ্দিন সরকার, এম. মোরশেদ খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, জয়নুল আবদীন ফারুক, ফজলুল হক মিলন, অলি আহমেদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ সময় তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিজীবনে খোকা বিনয়ী ও মার্জিত আচরণের চমৎকার মানুষ ছিলেন।

দুপুর ১২টায় খোকার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মাহমুদুর রহমান মান্না, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চিত্রনায়ক উজ্জ্বলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এ সময় খোকার বড় ছেলে ইশরাক হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশের অন্যতম অভিভাবক উল্লেখ করে দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুজন অভিভাবক আছেন। একজন খালেদা জিয়া, যিনি জেলে আছেন। আরেকজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়? আপনারা এর সমাধান করে দেন।

শহীদ মিনারের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুরে তার মরদেহ নয়াপল্টনের কার্যালয়ের সামনে আনা হলে দলের সব শ্রেণীর হাজার হাজার নেতাকর্মী অশ্রæজলে প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। প্রথমে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রয়াত নেতার কফিনটি দলীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর দলের পক্ষ থেকে কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কফিনে ফুল দেয়া হয়। কালো কাপড়ে মোড়া অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় খোকার কফিন। নেতাকর্মীদের কফিনের সামনে কাঁদতে দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিবসহ নেতারাও অশ্রæসজল ছিলেন।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের সবার প্রিয় নেতা এমন সময় চলে গেলেন যখন আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না। তিনি বলেন, সাদেক হোসেন খোকার এই অকালে চলে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। আল্লাহ তালার কাছে দোয়া করি তিনি যেন তার সব গুনাহ মাফ করে দেন, তাকে বেহেশত নসিব করেন।

এর আগে কার্যালয়ের সামনে খোকার জানাজায় ইমামতি করেন উলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা শাহ নেছারুল হক। এরপর তার কফিনে স্যালুট জানায় সেক্টার কমান্ডার শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল।

নয়াপল্টনের কার্যালয় থেকে ফকিরেরপুল মোড় পর্যন্ত সড়ক ও তার পাশপাশের গলিতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক জানাজায় অংশ নেয়। পুরো পল্টন রোড কানায় কানায় পূর্ণ হয়। ২টা ৩০ মিনিটে নয়াপল্টন থেকে খোকার কফিন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে। সেখানে বিকেল ৩টায় খোকার চতুর্থ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনসহ করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

এরপর সাদেক হোসেন খোকাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে। এ ক্লাবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। এই ক্লাব থেকে গোপীবাগের বাড়ি হয়ে মরদেহ নেয়া ধূপখোলা মাঠে। বাদ আসর ওই মাঠে শেষ জানাজা দিয়ে জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। খোকার মরদেহ কবরে নামানোর আগে পুলিশের ১৭ সদস্যের একটি দল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা খোকার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায়। তারা এই মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেন। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা খোকাকে শেষ স্যালুট জানান। এ সময় পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুন নাহারসহ আরো কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj