সাহিত্য সংস্কৃতির প্রকৃত সাধক

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে আমি প্রথম দেখি ১৯৫০ সালে। তারপর অর্ধশতাব্দী তো অবশ্যই, তারচেয়েও বেশি সময়, ৫৮ বছর পার হতে চলল, তবু আমার কাছে এখনো তিনি তেমনি আছেন যেমন তাঁকে দেখেছিলাম সেই পঞ্চাশ সালে। প্রাণবন্ত, মিষ্টভাষী এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ। যে বছর তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, সহসভাপতি হয়েছিলেন তারই বন্ধু মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নই, সেখান থেকে অনেক দূরেই বলা যাবে, কেননা তখন আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের ঘোরাফেরা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা জুড়েই; বিশেষ করে এই জন্য যে আমাদের বাসা ছিল আজিমপুরে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর নির্বাচন তখনকার দিনে ছিল উৎসবের মতো। আমরা প্রচারণা শুনতাম, ভোটারদের নিয়ে টানাটানি দেখতাম, কারা কোন পক্ষের তাও জানতাম। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীরা ছিলেন প্রগতিপন্থি আর তাদের বিপক্ষে যারা প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন তারা ছিলেন সরকার ঘেঁষা এ খবর আমাদের জানা হয়ে গিয়েছিল। আমরা খুশি হয়েছিলাম। প্রগতিপন্থিরা জিতেছেন দেখে।

নবনির্বাচিত পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে কৌত‚হলী দর্শক-শ্রোতা হিসেবে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানেই প্রথম সিদ্দিকীকে দেখা। অত্যন্ত সুন্দর করে, গুছিয়ে, মার্জিত ভাষা ও পরিষ্কার উচ্চারণে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন সেদিন। পরে আমি দেখেছি ওইটাই তার স্বাভাবিক ভাষা। তিনি চিন্তা করেন গুছিয়ে, সুন্দর কথা বলেন, যে জন্য তার কথোপকথন, বক্তৃতা ও লেখার ভাষার মধ্যে খুব একটা দূরত্ব থাকে না, এক ধরনের নিজস্বতা ও ঐক্য থেকেই যায়।

রহমান-সিদ্দিকীর ওই মন্ত্রিসভা কিন্তু টেকেনি। নিয়ম ছিল এরকমের যে মন্ত্রিসভা একটি বাজেট অধিবেশন ডাকবে, যাতে ইউনিয়নের প্রস্তাবিত বার্ষিক বাজেট অনুমোদন করে নিতে হবে। প্রতিপক্ষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, যার দরুন বাজেট পাস হয়নি এবং মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। হলের প্রভোস্ট তখন তার ইচ্ছানুযায়ী একটি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে দেন, যেটিতে পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলরা স্থান পেয়েছিল। খবরটা আমরা শুনেছি এবং দুঃখ পেয়েছি। তখন মনে হয় প্রগতিশীলদের মন্ত্রিসভার জায়গাতে সরকার মন্ত্রীদের দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করার ব্যাপারটা ছিল গভর্নরের শাসন জারি করার মতো যেমনটা পূর্ববঙ্গে ঘটেছিল চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের পরে।

সে সময়ে আমরা জানতাম জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ইংরেজি সাহিত্যের খুব ভালো ছাত্র। কিন্তু আমার কাছে এরচেয়েও বেশি করে জ্ঞাত ছিল যে পরিচয় সেটি একজন কবিতা লেখকের। তিনি যে অনেক অনেক কবিতা লিখেছেন তা নয়। কিন্তু যা লিখেছেন তা ছিল বিশিষ্ট, অন্য কারো লেখার মতোই নয়। যে জন্য ১৯৭৯-তে তিনি কবিতার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ সেই সময়ে তার প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র একটি।

কবিতার ওই প্রথম বইটির নাম রেখেছেন ‘হৃদয়ে জনপদে’। পরবর্তী কবিতার বই ‘চাঁদ ডুবে গেলে’। দুটি নামই তাৎপর্যপূর্ণ। চাঁদ ডুবে গেলে অন্ধকার দেখা দেয়, আবার সম্ভাবনাও থাকে সকাল হবার। তবে কবির কাছে মনে হয় অন্ধকার ও প্রত্যুষের চেয়ে চাঁদের নিজস্ব আবেদনটাই ছিল বড়। চাঁদ যে রাতের অন্ধকার ও সকালের আলোর মধ্যে একটা সামঞ্জস্য গড়ে তুলছে তা নয়, তবে দুয়ের ভেতর তা একটা সম্মিলন ঘটাচ্ছে এটা সত্য। সম্মিলনের ওই ব্যাপারটা আরো স্পষ্টভাবে রয়েছে তার প্রথম বইয়ের ‘হৃদয়ে জনপদে’ নামকরণে। তার হৃদয়ে জনপদ আছে। একদিকে ব্যক্তিগত হৃদয় অপরদিকে বসতিপূর্ণ জনপদ, উভয়েই সত্য তার জন্য; তিনি মিলন চান এই দুয়ের মধ্যে।

ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির মিলনের এই ব্যাপারটা তাঁর সকল চিন্তা ও লেখার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। বিষয়টাকে তিনি মোটেই অতি নাটকীয় করে তোলেন না, কিন্তু সেখান থেকে কখনোই সরে দাঁড়ান না। শান্তভাবে তিনি অনমনীয়।

সিদ্দিকী শেক্সপিয়রের সনেট এবং মিল্টনের ‘অ্যারিওপেজিটিনা’ ও ‘স্যামসন এগোনিসটেস’ অনুবাদ করেছেন। মিলনের ব্যাপারটা এখানেও দেখতে পাই। শেক্সপিয়র ও মিল্টন ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের দুজন। কিন্তু অত্যন্ত মহৎ বলেই তারা দুজনেই আবার একে অপর থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। শেক্সপিয়র হচ্ছেন একেবারেই নৈর্ব্যক্তিক, মিল্টন সর্বদাই আত্মসচেতন। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, দুজনকেই পছন্দ করেন এতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, সাহিত্যের ছাত্ররা সেটা করতে পারেন, করেও থাকেন। কিন্তু ওই যে দুজনের লেখাই তিনি গভীর অনুরাগে অনুবাদ করলেন, এতে বোঝা যায় শেক্সপিয়রের অসামান্য নান্দনিকতাপূর্ণ এবং মিল্টনের স্বাধীনতার স্পৃহা ও দেশপ্রেম ওদের তিনি সম্মিলিত করতে চান তার নিজের লেখায় এবং তার নিজের মধ্যেও। শেক্সপিয়রের সনেটের ভেতর যে সংযম ও বাকবৈদগ্ধ্য রয়েছে তা সিদ্দিকীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে থাকবে। তিনি নিজেও সনেট লিখেছেন এবং ভাষার ব্যবহারে তাঁর যে সংযম ও যতœ তা বিশেষভাবেই উল্লেখযোগ্য। মিল্টনের অঙ্গীকার ও আবেগ সিদ্দিকীর মধ্যেও রয়েছে, কিন্তু তাদের প্রকাশ করার ব্যাপারে তিনি সতর্ক ও সংযমী। সিদ্দিকীর একটি প্রবন্ধের বইয়ের নাম হচ্ছে ‘শব্দের সীমানা। শব্দের সীমানা তিনি জানেন এবং যেমন কথায় তেমনি লেখায় শব্দের ব্যবহার করেন সতর্কতা ও সংযমের সঙ্গে। সেই প্রথম আমার শোনা বক্তৃতায় শব্দ নির্বাচন ও প্রয়োগের যে দক্ষতা কৈশোরিক আঙ্গিকে আকৃষ্ট করেছিল, পরে বহু বছরের পরিচয় ও আদান-প্রদানে সে আকর্ষণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। নৈকট্য দূরত্ব তৈরি করে বলে যে জনশ্রæতি আছে এ ক্ষেত্রে তা মোটেই কার্যকর হয়নি।

প্রথম দেখার চার বছর পর দ্বিতীয়বার তার সঙ্গে দেখা এবারো বিশ্ববিদ্যালয়েই, তবে ভিন্ন পরিবেশে। তখন আমি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র, আমাদের শিক্ষক সৈয়দ আলী আশরাফ চলে যাচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য, সে উপলক্ষে একটি বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তাতে উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি অক্সফোর্ড থেকে সদ্য ফিরেছেন, উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে। এরপরে তিনি নিজেও রাজশাহীতে চলে যান। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হই ১৯৫৭-এ; তারপরে তার সঙ্গে নানাভাবে আমার যোগাযোগ। মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সঙ্গে মিলে তিনি ‘পূর্বমেঘ’ নামে অত্যন্ত উন্নতমানের একটি ত্রৈমাত্রিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন রাজশাহী থেকে; সে পত্রিকায় আমি লিখেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে কয়েকবার আমি রাজশাহীতে গেছি, তার বিভাগে। এর আগে তিনিও আসতেন আমাদের বিভাগে, পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে। তার সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাৎকারই ছিল আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। সুন্দর গল্প বলতেন, পরিষ্কার তাত্তি¡ক আলোচনা চলত।

১৯৫৮ সালে আমাদের ইংরেজি বিভাগের উদ্যোগে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ওপর আটটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তাতে চমৎকার একটি প্রবন্ধ পড়েন বাংলা কবিতার ওপর। এই প্রবন্ধে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা কবিতার চর্চাকে দুটি ধারায় সুন্দরভাবে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন যে তাদের একটি প্রথাগত, যেখানে ইসলামপ্রীতি বিশেষভাবে কার্যকর, অপরটি আধুনিক যে ধারা রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে এগোয় এবং যার একটি আন্তর্জাতিক পটভূমিও রয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বভারতীয় ইংরেজি শিক্ষক সমিতির আমন্ত্রণে তাদের বার্ষিক সম্মেলনে আমরা গুজরাটের আহমেদাবাদে গিয়েছিলাম। সেই সম্মেলনের জন্য তিনি একটি প্রবন্ধ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা, অন্যরা গিয়েছিলাম খালি হাতে। সিদ্দিকীর ওই কাজটি ছিল সুবিবেচনাপ্রসূত। ওই রকমের সুবিবেচনা তিনি সব সময়েই দেখাতেন। বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশাসনিক কাজ তাকে করতে হয়েছে সেসব কাজে তার দক্ষতার কোনো অভাব দেখা যায়নি; কিন্তু তার কাজটি ছিল শিক্ষকতার এবং সাহিত্যচর্চার, সেখানে তিনি দৃঢ় ছিলেন তার অঙ্গীকারে। বিভাগের প্রধান, উপাচার্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য- এসব দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন, এক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের দেখাশোনাও তাকে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো দায়িত্বই তাঁকে কাতর করতে পারেনি এবং সকল দায়িত্বই তিনি অত্যন্ত সহজভাবে বহন করেছেন।

আহমেদাবাদ যাওয়ার পথে আমরা কলকাতায় থেমেছিলাম এবং জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর উদ্যোগে তিনি ও আমি আবু সাঈদ আয়ুবের সঙ্গে গেছিলাম দেখা করতে। আয়ুব তখন বেশ অসুস্থ। তবু একান্ত অন্তরঙ্গ ও উপকারী হয়েছিল আমাদের আলোচনা। ওই যাওয়াতেই আহমেদাবাদে আরেক অভিজ্ঞতা। সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন একটি রেস্টুরেন্টে। তাদের মূল কৌত‚হলের বিষয় ছিল কেন আমরা পাকিস্তানটাকে ভাঙলাম। প্রথমে অভিযোগ দিয়েই শুরু করেছিলেন কথা পরে যখন আমরা বোঝাতে পারলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেন জরুরি ছিল এবং কেমন নৃশংস ছিল পাঞ্জাবি হানাদারেরা তখন তারা মানলেন যে যুদ্ধে না গিয়ে আমাদের জন্য বাঁচার অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। আমাদের কাজকর্মের বিষয়ে তারা জানতে চাইলেন এবং সিদ্দিকী মিল্টনের স্যামসন এগোনিসটেস অনুবাদ করেছেন শুনে একজন মন্তব্য করলেন, আপনাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম অনুপ্রেরণা অনুরোধটা কোথা থেকে এসেছে। মন্তব্যটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও অত্যন্ত আনন্দদায়ক ছিল, আনন্দদায়ক আমাদের সকলের জন্যই।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ঢাকায় আসতেনই না যদি সাতচল্লিশের দেশভাগটা ঘটত। আইএ পড়তে গেছিলেন কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি কলেজে। ঢাকায় এসেছেন ওই সাতচল্লিশেই এবং দেশভাগের কারণেই। ঢাকা তখন খুবই অকিঞ্চিতকর এক শহর। এর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগৎটা অবিকশিত। তারপরে বিকাশ কিছুটা ঘটেছে এবং সেই বিকাশে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ভূমিকাটা ছিল নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj