নজমুল হেলাল : জীবনের সাথে সাধনার অবিচ্ছেদ্য রূপকার

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

মুন্সি আবু সাইফ

নজমুল হেলাল বাংলাদেশের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি এবং গীতিকার। কাব্যে এবং গানে তিনি একটি স্বতন্ত্র মেধা এবং মননের বাহক। সর্বত্র স্বকীয়তার সন্ধানী। প্রভাব মুক্তির প্রয়াস তার গানের মূল চালিকাশক্তি। হৃদয়বৃত্তি অপেক্ষা বুদ্ধিবৃত্তিক সাহিত্যকর্মগুলো সমকালের বাংলা কাব্য ও সংগীতে তার একটি স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। নিরলস লেখার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধি অর্জনে একজন অসাধারণ এবং উজ্জ্বল নকিব।

কবি এবং গীতিকার নজমুল হেলাল খুব ছোটবেলা থেকেই সংগীত এবং কবিতার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তঁাঁর সাধনার সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে, তিনি জীবনের সাথে সাধনার এক অবিচ্ছেদ্য রূপকার। চিরায়ত মরমী চেতনাকে আধুনিক ভাষিক অবয়বে প্রকাশ করতে চান। সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামী, মূল্যবোধে অনাচার এবং শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি এক আপসহীন কলম সৈনিক।

নজমুল হেলালের কাব্যচেতনা শুধু দেশীয় এবং আকস্মিক প্রেক্ষাপটে নয়, বরং তিনি মেধা ও মননে সমকালীন বিশ্ব নাগরিকেরও ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তাঁর গানগুলো বিশ্ব শান্তির বাতাবরণে এক ঐক্যবদ্ধ মানবসত্তার স্বপ্ন দেখে চলে। তাই হেলালগীতিকে স্থ‚ল চেতনায় আবদ্ধ করা যাবে না, বরং তা বিশ্বমানবতার মুক্তি পিয়াসের নির্যাস। তিনি শানিত ভাষায় লিখেছেন- ‘শোষণ-পীড়ন-দুঃশাসন, ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ধর্ষণ; কুসংস্কার, কু-প্রথা, অপসংস্কৃতি, মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করার হীনমন্যতা তথা অমানুষিক আচরণের দ্বারা, মানব জগতে তো দূরের কথা কোনো অমানুষের জগতেও শান্তিপ্রতিষ্ঠিত ও রক্ষা সম্ভব নয়’।

প্রথম সংস্করণ : আশ্বিন-১৩৯২, অক্টোবর-১৯৮৫ হেলালগীতি ভূমিকাংশ যুগসচেতনতা হেলালগীতির মূল প্রতিপাদ্য। সেখানে মানুষই তার পরম আরাধ্য। তিনি মনে করেন সমগ্র পৃথিবীর মানুষই এক অভিন্ন মানবসত্তা। সে ক্ষত্রে আমরা সমগ্র পৃথিবীকেই স্বদেশ মনে করব। কবি দায়বদ্ধ এক বিরল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষকে বিশ্বনাগরিকের মর্যাদা দান করতে ইচ্ছুক।

সোনারি এই বিশ্বে মোরা

বিভেদের শিখা জ্বাল্বোনা

পুণ্য কভু দল্বোনা।

এই পৃথিবী স্বদেশ মোদের, ঐক্য হয়ে চল্বো।

গীতি-১

হেলালগীতি’র গীতিকার মনে করেন শুধুমাত্র পাপাত্মা বলে মানুষকে অবহেলা, অনাদরে ঠেলে দেয়া যাবে না। অথবা পৃথিবীকে অনাচারের অভায়ারণ্য মনে করা ঠিক হবে না। আশাবাদী শিল্পী জীবনকে হতাশা ও নৈরাজ্যের মাঝ থেকে উত্তরণের চেষ্টা করেন।

ওরে শিল্পীর মৃত্যঞ্জয়ী সত্তা উঠেছে মেতে

গেছে তাই হেলালের হতাশা উড়ে

ওরে বইবে এবার গানের অগ্নিধারা

বইবে এবার বিশ্বজুড়ে।

গীতি-০২

আমাদের সমাজের দুর্নীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। বিশেষত ঘুষ, জুলুম, অনাচার আজকের সমাজকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে। মানুষ এখানে এক বহুরূপী জীব। এমনকি যে ছাত্র শিক্ষাজীবনে সে মহা নৈতিক শিক্ষা দ্বারা এবং ধনুকভাঙ্গা আদর্শদ্বারা পরিচালিত হয় বাস্তবে দেখা যায় যে, পরবর্তীতে কর্মজীবনে সে হয়ে ওঠে শপথভঙ্গকারী। ফলে তার মধ্যে দেখা দেয় নৈতিক বৈকল্য।

বেকার রইলে কয় নীতিকথা

কাজ পেলে দেয় কুকাজ ক’রে নিত্য ব্যথা

ক্ষমতার আবর্তে প’ড়ে-

মুহূর্তে নেয় রূপ বদলিয়ে ওরে।

গীতি-০৩

গীতিকার ও কবি হেলালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তিনি একজন অকুতোভয় লড়াকু কলম সৈনিক। তিনি মনে করেন, অসীম অভাব মানুষকে বিপদগামী করে তোলে। সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী মানুষকে স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। গীতিকার মনে করেন, হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মানুষ অসাম্যের যে প্রভেদ সৃষ্টি করে তা কখনোই সভ্যতার জন্য অনুক‚ল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে না। গীতিকার মনে করেন স্বার্থন্বেষী মানুষকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

তাইতে হেলালমতি বল্ছে ভেবে

মানুষ হ’য়ে জন্মেছো যবে

উত্তম ইতিহাস সৃষ্টি ক’রে।

রাখো গো মানব কুলের মান।

গীতি-০৪

কবি নজমুল হেলালের দৃষ্টি প্রসারিত। তাঁর একাধিক গান ও কবিতায় অমানবিক শিশু শ্রমের প্রতি ধিক্কার জ্ঞাপন করেছেন। কবি মনে করেন শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। যে শিশু আজকে ভূমিষ্ঠ হয়েছে, বই কলম নিয়ে স্কুলে যাওয়াই তার অধিকার। কিন্তু মুনাফালোভী মানুষ অমানবিক শ্রমকে কিনে শিশুর অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করছে। তিনি মনে করেন ছোটদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে পৃথিবী একদিন মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।

নজমুল হেলালের দৃষ্টি এতটাই গভীর সত্যসন্ধানে প্রসারিত যে, তিনি বাড়ির চাকর-চাকরানীর অধিকারকে নিয়েও বিচলিত। সমাজের বিত্তবানরা যদি দাস-দাসীর প্রতি অবিচার করে, অত্যাচার করে, তাহলে মানুষকে সভ্যতার মাত্রা দিয়ে বিচার করা যায় না। যারা এ ধরনের হীন কাজ করে তিনি তাদের প্রতি ধিক্কার উচ্চারণ করে বলেছেন-

তাইতো হেলালমতি বলে ভেবে

দাস-দাসীকে ঘৃণ্য ভেবো না সবে

অন্যায় ক’রে দিয়ে মানুষকে ব্যথা

অমানুষ হ’য়ে যেও না ওরে।

গীতি-০৬

আমাদের ধর্মে যেমন অপচয়কারীকে শয়তানের দোসর বলা হয়েছে, অনুরূপভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অপচয় সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র অপচয়ের কারণে একটা জাতি হতদরিদ্র জাতিসত্তায় পরিণত হয়।

অপচয়কারী বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় বোঝায় পরিণত হয়। সে জন্য গীতিকার মনে করেন অপচয় করলে ইতিহাস অপবিত্র হয়ে যায়।

শিক্ষা জাতিসত্তার পূর্ণতা দানে জীবনদায়ী শক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু শিক্ষা যদি অসৎ ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয় প্রশ্নবিদ্ধ। মনীষী বাক্যে বলা হয়েছে- দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য। এদের সম্পর্কে গীতিকার হেলালের সতর্কবাণী-

ওরে অসত্ শিক্ষিত যারা পরশ্রীকাতর তারা

ওরা নামে ভদ্র কাজে অসত্

ওদের ভরসা করবে যারা

যাবে তারাই রসাতলে!

গীতি-০৮

কবি হেলালের তীক্ষèভেদী দৃষ্টি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিভোর। কিন্তু বিশ্বময় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণের জন্য নিত্য নতুন কৌশল আবিষ্কার করে চলেছে। এই শক্তির মূলমন্ত্র বিভক্ত কর এবং শাসন কর এর মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে, স্বাধীন গতিসত্তাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। কিন্তু এই ধরনের অপরাজনৈতিক কৌশল কখনোই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

ঝগড়া বাধিয়ে দিয়ে চুপটি র’লে

পায় না রেহায় ঝগড়ার স্রষ্টা।

গীতি-১০

একইভাবে আমরা লক্ষ্য করি হেলালগীতি’র ‘বিজ্ঞান’ নামক গানটিতে। তার দৃষ্টিতে বিজ্ঞান এক সত্য বস্তু। কিন্তু বৈজ্ঞানিক শক্তি ব্যবহারকারী মানুষ বিজ্ঞানকে যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বিজ্ঞানের সুফল আজকে আর অবিমিশ্র নয় বরং তা নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়ে চলেছে। তিনি মনে করেন বিজ্ঞানের কল্যাণকর দিকগুলো ব্যবহার করতে পারলে মানুষ একদিন পৃথিবীকে গৌরবময় সাফল্যে ভরিয়ে তুলতে পারবে। বিজ্ঞানকে কল্যাণময়ী কাজে ব্যবহার করতে পারলে পৃথিবী একদিন স্বর্গে পরিণত হবে।

তার মতে নারী স্বাধীনতাকামী শুদ্ধতম মানুষ এবং পৃথিবীর সকল কল্যাণময় অর্জনের মধ্যে নারী-পুরুষের অবদান সমভাবে স্বীকৃত। সেজন্য নারীকে অপমান বা নির্যাতন করলে সভ্যতা হয় কলঙ্কিত। তাই নারীর পক্ষে তাঁর সাহসী উচ্চারণ-

ওরে হেলালমতি ভেবে বলে

নারী মানেই নয়রে তুচ্ছ-

দেখো নাই বুঝি বিশ্বগ্রাসী তার অগ্নিপুচ্ছ

সে যে মানবরতন।

গীতি-১৩

এ সমাজে নারী স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় হলো যৌতুকপ্রথা। সমাজের এই ঘৃণ্য প্রথাকে কবি শান্ত ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছেন। যৌতুক প্রথা শুধু একটি পরিবারকেই বিপদগ্রস্ত করে না, বরং বিশ্ব নারী সমাজকে করে অপদস্থ।

হেলালগীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং ভণ্ডপীর এবং পীরপূজার বিরুদ্ধে এক সামাজিক দ্রোহ। আজকের বিশ্ব রক্ষকের ভূমিকায় থেকেও এখন বড় ভক্ষক। বিশেষত ভণ্ডপীরের ভণ্ডামী আমাদের ধর্মের পবিত্র মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। সমাজে মানুষের সূ² অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তারা বৃহৎ ব্যবসার ফাঁদ পেতেছে।

হেলালমতি তাইতো ভেবে বলে-

শিষ্য হওয়ার আগে পীরের স্বরূপ চিনে নিতে হবে।

গীতি-২৩

হেলালগীতিকায় মানবাত্মার মুক্তি নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। গীতিকারের তীব্র সমাজ সচেতনতামূলক গীতিসম্ভারে জাতিভেদ এবং কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হেনেছেন। এই ধরনের ক্ষতিকর প্রথা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হানিকর। বিশ্বমানবতার জন্য বিপজ্জনক। তিনি মনে করেন বংশমর্যাদা কখনো মনুষ্যজাতির কল্যাণ করতে পারে না। তাই বংশমর্যাদাকে ঝেড়ে ফেলে সমগ্র বিশ্ববাসীকে এক মানবতার আচ্ছাদনে থাকতে হবে।

কবি রক্তচোষক, শোষণ, ঘুষ, গোপন পাপ ইত্যাদি শিরোনামযুক্ত গানগুলোতে সমাজ সংস্কারের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন। এ ছাড়া ভেজাল নামক গানটিতে মানুষের চারিত্রিক স্খলন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-

কে বলে খাদ্যে শুধু হয়রে ভেজাল

বলে হেলাল মানুষ ভেজাল হ’য়ে যেতেছে

গীতি-৩৬

হেলালগীতি’র আর একটি বড় দিক তিনি মরমী সাধনার মাধ্যমে বাংলা গানে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি আধ্যাত্ম চেতনা অপেক্ষা সমাজ ভাবনাকেই বড় বিষয় করে তুলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি লোকজ চেতনা দ্বারা আবহমান বাংলা এবং বাঙালির হৃদয়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি এই নিরীক্ষাধর্মী গান রচনা করে চলেছেন। গণসঙ্গীতের উপাদানও আছে হেলালগীতিতে।

একই সাথে ‘ছোট লোক ধনী হলে’ ‘সতীন’, ‘ভেজাল প্রেম’ প্রভৃতি শিরোনামের গানগুলোতে এই গীতিকারের দৃষ্টি অত্যন্ত প্রসারিত। ফলে বলাই যায় তিনি একজন বিশ্ব নাগরিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ‘অন্তর ন্যাশনাল সংগীত’ রচনা করে যেমন বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র ‘বন্দেমাতরম’ রচনা করে যেমন ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে সুসংহত করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ রচনা করে যেমন দেশাত্মপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বিশ্ববাসীকে অনুরূপভাবে নজমুল হেলাল একটি বিশ্বজনীন জাতীয় সংগীত রচনা করে বিশ্ববাসীকে একটি শান্তির অভিন্ন পতাকাতলে একত্রিত করতে চেয়েছেন। সে ক্ষেত্রে হেলালগীতিকে ক্লাসিকধর্মী বা ধ্রæপদী শিল্প এবং সর্বজনীন মর্যাদার মহৎকর্মে উত্তীর্ণ বলা যায়। কবি ও গীতিকার নজমুল হেলালের গতকাল ছিল ৬০তম জন্মদিন। জন্মদিনের শ্রদ্ধা ভালোবাসা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj