হরি দিনতো গেল, সন্ধ্যা হলো

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

পার করো আমারে

পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী

নগর কীর্তন বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি লোকায়িত সংস্কৃতি ও প্রাচীন রীতি। আধুনিক ধ্যান-ধারণা, পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির করাল থাবা, কর্মব্যস্ততা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে আমাদের হাজার বছরের এই ধর্মীয় সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি সিলেট বিভাগের (অন্য বিভাগগুলোতে থাকলে থাকতেও পারে) বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো ঢিলেঢালাভাবে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার্থে এ ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন করা হয়।

নগর + কীর্তন = নগরকীর্তন। পূর্বে গ্রামকে নগর বলা হতো।

বাংলা কার্তিক মাসের ১ তারিখ হতে কার্তিক সংক্রান্তি পর্যন্ত সারা মাসব্যাপী সন্ধ্যার পর শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধসহ পুরুষ ভক্তবৃন্দ মৃদঙ্গ (কুল), কাঁসর (জাঞ্জ), শঙ্খ, করতাল, বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যবাজনাসহ পাড়া/মহল্লা/গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্মীয় বিভিন্ন গানসহ কৃষ্ণ নাম করাকে নগর কীর্তন বলে।

কীর্তন নিয়ে প্রত্যেক বাড়িতে আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পূজামণ্ডপ বা দেব মন্দিরের সামনের তুলসী গাছের বেদিতে মোম, আগরবাতি বা ধূপ ও দীপ জ্বালিয়ে দেন মহিলারা। আর সংকীর্তন বাড়িতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বউ-ঝিয়েরা মিলে উলুধ্বনি (জয়ধ্বনি বা মঙ্গল ধ্বনি) দিয়ে থাকেন।

প্রত্যেক বাড়ির উঠোনে স্বাভাবিকভাবে ঘুরে ঘুরে (চক্কর দিয়ে, তবে ধামাইল নৃত্যের মতো নয়) নগর কীর্তন করা হয়। যখন ঝুম লেগে যায় অর্থাৎ সবাই যখন গান গাইতে গাইতে আধ্ম্যাত্মিক চেতনায় আত্মহারা হন তখন সবাই বিশেষ ভঙ্গিমায় পুরুষালী নৃত্য শুরু করেন। প্রত্যেকটি গানের প্রায় শেষের দিকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন বাজনা ও গানের কথা আরো চেতানো হয় অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে বাদ্য-বাজনা বাজানো হয়। তখন মহিলারা আবার উলুধ্বনি করেন। ফলে গান-বাজনা আরো শ্রæতিমধুর হয়।

কার্তিক মাসের নগর কীর্তনে প্রত্যেক দিনই আজ এর বাড়ি, কাল ওর বাড়ি লুট দেয়া একটি বিশেষ রীতি। অর্থাৎ প্রতিদিনই এক বা একাধিক বাড়িতে লুট থাকে। লুট মানে- নকুল, বাতাসা, কদমা, শুকনো সন্দেশ ইত্যাদি মিষ্টিদ্রব্য এবং কলা, আপেল, কমলা, নারিকেল ইত্যাদি ফল হরির (ভগবান) প্রসাদ হিসেবে হরিবল হরিবল বলে ভক্তগণের মাঝে ছিটিয়ে ছিটিয়ে বিতরণ করার একটি প্রক্রিয়া। সবাই তখন প্রশস্ত আঙিনা থেকে লুট কুড়িয়ে খায়। একেবারে কালবোশেখীর ঝড়ে পড়া আম কুড়ানোর মতো প্রতিযোগিতায় সবাই নেমে পড়ে। কার আগে কে বা কার চেয়ে কে বেশি লুট কুড়াতে পারে। কেউ বেশি লুট কুড়াতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে। গৌরব বোধ করে। তবে লুট কুড়াতে স্মার্ট তরুণ ভক্তগণই সেরা। তবে হরির লুট থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না হয় সে জন্য সবগুলো প্রসাদ ছিটিয়ে বিতরণ না করে কিছু প্রসাদ পিতল বা কাঁসার থালা বা বাটিতে রেখে দেয়া হয়। লুটের শেষে যারা লুটপ্রসাদ পায়নি বা শিশু বা বয়োজ্যেষ্ঠ বা যারা বাজনা বাজাতে শরিক ছিল তাদের হাতের মুঠো ভরে ভরে লুটপ্রসাদ দেয়া হয়। আস্ত নারিকেল লুট দেয়ার সময় একটা ভয় থাকে এজন্য যে কার মাথায় গিয়ে পড়ে। যদিও পড়ে না তবুও আশঙ্কা থেকে যায়। লুটের গানগুলো নিম্নলিখিত :

০১.

হরির লুট পড়েছে সম্মুখেতে নেও লুট হরিবল বলে/ লুটো হরিবল বলে লুটো হরিবল বলে লুটো হরিবল বলে।/যাগ-যজ্ঞ যতই ছিল সত্য, ত্রেতা, দ্বাপরে/কলির যুগে মহাপাপী হরি নামে উদ্ধারে/লুটো লুটোরে ভাই হরিবল বলে।। (সংক্ষিপ্ত)

০২.

হরির লুট পইড়াছে, শ্রীবাসেরই আঙিনায়/কে নেবে রে আয়/ও লুট কে নেবে কে নেবে তোরা/ত্বরা করে আয়।।

(সংক্ষিপ্ত এবং গানটি স্বর্গীয় শ্রী রাধারমণ দত্ত রচিত।)

০৩.

আমার সারা জীবন ভরা/হইল না লুট ধরা/ ও রে মিছা ভবে আইলাম গেলাম/আমি কর্মপুড়া/ হইল না লুট ধরা।।(সংক্ষিপ্ত)

০৪.

ব্রজ রাই, রাইগো ব্রজের কিশোরী/তোমার চরণ কমলে দিও ঠাঁই।।(সংক্ষিপ্ত)

০৫.

এই যে হরির লুট দিল ভাই, রসময় শ্রীবৃন্দাবন/বালক বেশে দয়াল হরি লুটে খাইল সর-মাখন।।(সংক্ষিপ্ত)

০৬.

নবদ্বীপের মাঝেরে লুট দিয়াছে শ্রী গৌরাঙ্গ রায়/ও লুট কে নেবে কে নেবে তোরা আয়রে ছুটে আয়।।(সংক্ষিপ্ত)

কার্তিক মাস পবিত্র মাস হলেও প্রাকৃতিক বৈরী পরিবেশ (রোগ-শোক) বিরাজমান থাকে বলে এ মাস ‘পেরেত কাতি’ হিসেবে গ্রামে আজো পরিচিত। ভাদ্র-আশ্বিন শরৎকাল হলেও বাস্তবে কার্তিক মাসটা গ্রীষ্ম এবং শীতের সংযোগ মাস। এ সময় একদিকে যেমন মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকে অপরদিকে প্রকৃতিতে প্রবেশ করে শীত অর্থাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে ঐ সময়টাতে বিভিন্ন রোগ-বালাই প্রায়শই লেগে থাকে। কার্তিক মাসে পূর্বে কলেরা, বসন্ত, ডিসেন্ট্রি, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ মহামারী আকার ধারণ করত। তখন গ্রামের পর গ্রাম মহামারীতে আক্রান্ত হতো। শত শত মানুষ মারা যেত। (যদিও ভালো প্রতিষেধক ও ঔষধগুণে বর্তমানে এসব রোগে মানুষ সাধারণত মারা যায় না।) তাই কার্তিক মাসে মানুষ খুব বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতো। মহিলারা গোবর (জীবাণু নাশক) দিয়ে সারা বাড়ির আঙিনা লেপে-পুছে সুন্দর রাখত। মাসের প্রথম দিন থেকেই সন্ধ্যার সময় মন্দিরের কাছে তুলসী গাছের বেদিতে ধূপ-দ্বীপ জ্বালিয়ে শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসর (জাঞ্জ্) বাজাত এবং উলুধ্বনি দিত, হরিনাম করত, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম পড়ত। সন্ধ্যার পর পর সর্বস্তরের পুরুষ (বালক, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ) ভক্তবৃন্দ শুদ্ধ ও ধৌত ধুতি, নামাবলি পরিধান করে কপালে তিলকের ফোঁটা দিয়ে একেবারে পূর্ব প্রান্তের বাড়িতে মিলিত হতো। সেখানে ধূপ-দীপ প্রজ্জ্বলন করা হতো।

বাদ্য-বাজনা উলুধ্বনি দিয়ে নিম্নোক্ত গানটি গেয়ে নগর কীর্তন শুরু করা হতো। স্থানাভাবে গানটির কয়েকটি লাইন এখানে উল্লেখ করা হলো :

এই আসরে করো গৌর আগমন, দাও দরশন/(আমি) আসন দিয়ে বসে আছি, এসে করো গ্রহণ, দাও দরশন।।

তারপর একে একে নিম্নোক্ত গানগুলো গাওয়া হতো। অনেক সময় একটি বা দুটি গান গেয়ে গেয়েই সারা গ্রাম বেড়ানো হতো।

০১.

যেন নিদান কালে দেখা পাই/দয়াল হরি এই ভিক্ষা চাই।/আমি মুজলে নয়ন/মদন-মোহন/রূপটি যেন দেখতে পাই।। (সংক্ষিপ্ত)

০২.

হরির নামগুনো গায় গোলোকে/আয়, তোরা ভাই সকল বালকে।/হরির নাম যে এত মিঠা লাগে/কে আনল ভাই মধু মেখে/আয় তোরা ভাই সকল বালকে।।(সংক্ষিপ্ত)

০৩.

কানাই কী অভাবে কার বা ভাবে/(তুই) ব্রজ ছেড়ে এলে/ মধুর বৃন্দাবনো; ত্যাজ্য করে দেশান্তরী হলে।

অঙ্গে নামাবলী/কান্ধে ভিক্ষার ঝুলি/গলে নাইরে বনোমালা।।(সংক্ষিপ্ত)

০৪.

তোমরা চাইয়া দেখোরে/কী আনন্দ হইতেছে আজ নদীয়ায়!/ওরে বাল্য, বৃদ্ধ, যৌবত নারী

তারা, হরির গুনো গায়; নদীয়ায়।।(সংক্ষিপ্ত)

০৫.

হরি দিনতো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে।/তুমি পারের কর্তা, জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে।।

(সংক্ষিপ্ত এবং স্বর্গীয় ফকির চাঁদ রচিত)

উল্লেখ্য, প্রথম বাড়িতে প্রজ্জ্বলিত ধূপ-দীপ সংকীর্তনের সাথে সাথে সারা গ্রামেই নিয়ে যাওয়া হতো এবং সব শেষের বাড়িতে জয়ধ্বনি দিয়ে সংকীর্তন শেষ করেই তবে দীপ নিভানো হতো। ভোরবেলা আবার স্নান করে ঠাকুর ঘরে ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে হরিনাম সংকীর্তন করে ‘মঙ্গলা’ পালন করা হতো। এখনো কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে পালন করে থাকে। তবে সিলেট শহরসহ অনেক শহর-গঞ্জ-গ্রামে নগর কীর্তনের মতো ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সঙ্ঘ’ (ইসকন)-এর উদ্যোগে ‘মঙ্গলা’ পালন করা হয়।

ধূনাবাতির সুগন্ধ, দীপের আলো, উলুধ্বনি ও বাজনাসহ ভগবানের নামকীর্তনের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছবে ততদূর পর্যন্ত কোন রোগ-জীবাণু, জিন, ভূত, প্রেতসহ কোনো প্রকার অশুভশক্তি গ্রামে বা এতদঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে না বলে মনে-প্রাণে তৎকালীন মানুষজন বিশ্বাস করতেন আর সেই বিশ্বাস থেকেই নগর কীর্তন, মঙ্গলা ইত্যাদি ধর্মীয় সংস্কৃতির আবির্ভাব।

আবহমানকাল ধরে আসা প্রাচীন এ রেওয়াজ (নগর কীর্তন) পূর্বে এতদঞ্চলের প্রত্যেকটি গ্রামেই প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে খুব কম গ্রামে বা মহল্লাতেই এর তৎপরতা লক্ষ করা যায়। তবে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী শিবপাশা মহল্লাবাসীসহ বেশ কিছু গ্রামে আজঅবধি ঐ ধর্মীয় সংস্কৃৃতি (নগর কীর্তন) যথেষ্ট গুরুত্বের সাথেই পালন করা হয়ে থাকে, বলা যায়। যদিও ধুতি ও নামাবলির পরিবর্তে শার্ট, প্যান্ট পরেই নগর কীর্তন করা হয় তবুও তারা রীতিনীতি যে করেই হোক রক্ষা করে চলছেন এজন্য তাদের শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাতে হয়। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ম রক্ষার জন্য হলেও ‘নগর কীর্তন’ থাকবে কিনা সংশয় থেকে যায়। তবে আমাদের এ ধর্মীয় মাঙ্গলিক সংস্কৃতি যাতে বন্ধ না হয় সেজন্য সমাজপতিদের কাছে অনুরোধ থাকবে। বর্তমানে এ মহল্লাবাসীরা ৪টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নগর কীর্তন পরিচালনা করে থাকেন। কার্তিক মাসের শেষের দিনে অর্থাৎ সংক্রান্তির দিনে সব গ্রুপ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী ভৈরব গাছের তলায় লুট দিয়ে এক মাসব্যাপী নগর কীর্তনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সন্ধ্যার পর শ্রী শ্রী ঘোরচণ্ডী (বিশেষ দেবী) মন্দিরের আঙিনায় গিয়ে দেখা গেল নগর কীর্তন শুরু করার তোড়জোড় প্রস্তুতি চলছে। যাদের নির্দেশনায় নগর কীর্তন অনুষ্ঠিত হয় সেই বর্ষীয়ান মুরব্বিবৃন্দ উঠোনের এক পাশে চেয়ারে বসে আছেন। এই দলের প্রবীণদের মধ্যে রয়েছেন- শ্রী নীলেন্দু চক্রবর্ত্তী, শ্রী অরবিন্দ চক্রবর্ত্তী, শ্রী প্রণয়ভূষণ চক্রবর্ত্তী মিন্টু (পণ্ডিত), শ্রী গঙ্গেশ চক্রবর্ত্তী প্রমুখ।

বালক-যুবকদের উৎসাহিত করতে এখনো সংকীর্তনে আসেন- শ্রী প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী ফুলু, শ্রী গৌরীপদ চক্রবর্ত্তী, শ্রী প্রদীপ চক্রবর্ত্তী পরী, শ্রী করুণাসিন্ধু চক্রবর্ত্তী সন্টু, শ্রী নবেন্দু চক্রবর্ত্তী রান্টু, সঞ্জয় দাশ, শ্রীকৃষ্ণ দাশ, সজল দাশ, রসময় শীল, গোপেশ দাস, শৈলেন পাল প্রমুখ

শিবপাশা নগর কীর্তনের এই দলে যারা ত্যাগ স্বীকার করেন ও শ্রম দেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- বিপুল চক্রবর্ত্তী বাপ্পন, পিকলু চক্রবর্ত্তী, বিপ্লব চক্রবর্ত্তী, টিংকু চক্রবর্ত্তী, কাজল চক্রবর্ত্তী, নারায়ণ চক্রবর্ত্তী, সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী, মলয় চক্রবর্ত্তী, বিধান রায়, ঝলক চক্রবর্ত্তী, অশোক চক্রবর্ত্তী রাজন, বিষ্ণুপদ চক্রবর্ত্তী, পংকজ চক্রবর্ত্তী, শুভ দাশ, সাজু চক্রবর্ত্তী, সুব্রত চক্রবর্ত্তী, রনজিৎ দাস, গৌরা দাস, সমীরণ পাল, মৃত্যুঞ্জয় বৈদ্য, গুনেন্দ্র দাশ, লিপটন দাশ, অনিক চক্রবর্ত্তী, রঞ্জু পাল, পার্থ দাশ, শান্ত দাশ, গঙ্গেশ দাশ, সুমন পাল, সৌরভ পাল, রবি পাল, হৃদয় শীল, প্রীতম চক্রবর্ত্তী প্রমুখ।

শিবপাশা ঠাকুর পাড়ার একটি (নগর কীর্তন) দলের প্রবীণব্যক্তিত্ব- শ্রী নীলেন্দু চক্রবর্ত্তী মন্টুর কাছে নগর কীর্তনের যাত্রা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন- ‘নগর কীর্তন আমাদের পূর্ব পুরুষদের থেকে আজো পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। আমরা খুবই আশাবাদী যে, এখন নগর কীর্তন কিশোর-তরুণ-যুবকরাই পরিচালনা করছে।’

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রী অরবিন্দ চক্রবর্ত্তী বলেন- ‘নগর কীর্তনের যে গানগুলো গাওয়া হয় এবং যেভাবে বাদ্য বাজাতে হয় পাড়ার ছেলেরা তা ইতোমধ্যে আয়ত্ত করে ফেলেছে। সুতরাং নগর কীর্তন ভবিষ্যতেও থাকবে, আশঙ্কার কিছু নেই।’

ব্যাকরণশাস্ত্রী স্মৃতিভূষণ ক্রিয়াতীর্থ শ্রী প্রণয়ভূষণ চক্রবর্ত্তী মিন্টু বলেন- ‘নগর কীর্তন সব সময়ই তরুণ নির্ভর। আমরা যখন যুবক ছিলাম তখন আমরাই নগর কীর্তন করতাম। গ্রামের দুই চার জন মুরব্বি ছাড়া কীর্তনে এখন যেমন পাওয়া যায় না, তখনও প্রবীণদের পাওয়া যেত না।’

দলের আরেকজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শ্রী গঙ্গেশ চক্রবর্ত্তী বলেন- ‘অত্র এলাকায় নগর কীর্তন পূর্বে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে আশা করা যায়।’

দলের যুবকদের মধ্যে কাজল চক্রবর্ত্তী অন্যতম। তিনি বলেন- ‘নগর কীর্তন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমরা সব সময়, শ্রম, মেধা, অর্থ জোগান দিয়ে থাকি, মাথার ঘাম ঝরাই। যেন আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতি লালন ও পালন করতে পারি।’

আরেক তরুণ সমীরণ পাল বলেন- ‘যেকোনো মূল্যে, যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করে হলেও আমাদের- এ ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন করে যাচ্ছি এবং যাব, যেকোনো প্রতিক‚ল অবস্থাতেও নগর কীর্তন অব্যাহত রাখবো।’

কালের যাত্রায় আমাদের অনেক ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে আবার কিছু কিছু সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে। নগর কীর্তনও এমন একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি যার আলো বর্তমানে পিদিমের মিটি মিটি আলোর মতোই বলা যায়। আনেক গ্রামে এ কীর্তন অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু কিছু গ্রামে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার নিমিত্তেই কোনোমতে পালন করা হয়। তবে নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশা মহল্লার নগর কীর্তনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রবীণ এবং নবীনদের বক্তব্যে আমরা দৃঢ় আশাবাদী, তাদের মতো যদি সকলের মন-মানসিকতা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও স্পৃহা থাকে তাহলে আবহমানকাল ধরে আসা আমাদের এ লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতি (নগর কীর্তন) কোনোদিন বন্ধ হবে না বলেই অনুমেয়। নগর কীর্তনের সুদীর্ঘ যাত্রা অব্যাহত থাকুক- এই প্রত্যাশাই রাখি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj