আনন্দের রঙ যখন কালো

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯

স. ম. শামসুল আলম

কন্যাদায় বড় কঠিন জিনিস। যে পিতা এটা অনুভব করতে পেরেছেন তিনি ছাড়া কেউ মর্ম উপলব্ধি করতে পারবেন না। তারপরও, দায়গ্রস্ত জীবনেও আনন্দ আছে, আনন্দ আসে, আনন্দ যায়। কখনো কখনো জাতীয় জীবনেও আনন্দ এসে তুমুল হইচই ফেলে দেয়। যেমন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ জয়ী হলে সারাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ইন্ডিয়াকে হারিয়েও তেমন আনন্দ করেছি, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েও আনন্দ করেছি। কিন্তু এই জয়ের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। লায়েক আলী মাতবর শুধু কাঠখড় পোড়ানো নয়, সর্বস্ব খুইয়েও যখন কন্যাদায় থেকে মুক্তি পাচ্ছিলেন না, ঠিক তখনই এলো আনন্দ সংবাদ। পাত্রপক্ষ, মানে পাত্র এই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছে।

লায়েক আলী মাতবরের দুই কন্যা- জাহানারা আক্তার ও মাহমুদা আক্তার। এক ছেলে- ফায়েজ আলী মাতবর। এই নাম রেখেছিল ওদের দাদি যে এখন আর পৃথিবীতে নেই। নামের কারণে নয়, সৌন্দর্যের কারণে জাহানারার বিয়ে হয় না। বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই করলেও উপযুক্ত পাত্র মেলাতে ব্যর্থ হন লায়েক আলী মাতবর। জাহানারা দেখতে বাবার মতোই- গাত্রবর্ণ কালো এবং স্বাস্থ্য ঢ্যাপসা। গোলাকার মুখমণ্ডল স্বাস্থ্যের সাথে মানানসই হলেও পাত্র বা পাত্রপক্ষদের কাছে মোটেই মানানসই নয়। তাছাড়া জাহানারা বেশিদূর লেখাপড়াও করতে পারেনি অর্থাভাবে। ইন্টারমিডিয়েট কোনোমতে পাস করলেও এরপর আর কলেজ যাওয়া হয়নি। ফলে লায়েক আলী মাতবরের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তার নামের পদবি মাতবর হলেও বাবার আমলেই ওই পর্ব শেষ হয়েছে। নদীভাঙনের শিকার হয়ে অর্থাৎ বাড়ি-জমি সব নদী গ্রাস করে নিলে ঢাকায় এসে থিতু হয়েছিল পুরো পরিবার। তখন লায়েক আলীর বয়স ছিল মাত্র আট বছর। এরপর একে একে মা-বাবা বড় বোনকে হারিয়েছেন। নিজের সংসার দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পেশা টাইলস লাগানোর সাব-কন্ট্রাক্টর। কোথায় মাতবর, কোথায় সাব-।

তারপরও লায়েক আলী দমবার পাত্র নন। জাহানারাকে নিয়ে তিনি এতটাই চিন্তিত যে এ নিয়ে স্ত্রীর সাথেও খিটিমিটি লেগে থাকে। শেষে জাহানারাই সমাধান দেয়, থাক না, আমার বিয়েটা নয় না-ই হলো- তোমরা মাহমুদার বিয়েটা দিয়ে দাও। ওরও তো চব্বিশ হলো।

মাহমুদা দেখতে-শুনতে ভালো। চেহারাটা অবিকল মায়ের মতো হয়েছে। সুন্দর মুখমণ্ডল এবং ¯িøম ফিগার। দীর্ঘদিন ধরে এক ছেলের সাথে প্রেম করছে। বাসের মধ্যে পরিচয় হয়েছিল। এরপর সারাক্ষণ মোবাইল আর ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথা। নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ, ফুচকা খাওয়া ইত্যাদি। জাহানারা ওর প্রতিটা ঘটনা জানে এবং সবকিছুতে সায় দিয়েছে। মাহমুদার প্রেমের ব্যাপারে বাধা দিলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে বলে জাহানারা কখনো বিরূপ মন্তব্য করেনি। যদি মাহমুদা বলে বসে, তোর চেহারা কুৎসিত কিন্তু মনটা যে কুৎসিত তা জানতাম না। কারণ প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগলে আপনজনের প্রতি কটাক্ষ করতে তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাছাড়া মাহমুদা এবার এমএ পরীক্ষা দিবে। নিজের টিউশনি থেকে কিছু টাকা ব্যয় করতে পারলেও বাকি টাকার সংস্থান জাহানারা করে দেয়। জাহানারা বাসায় বসেই কাপড় সেলাই করে বেশ টাকা উপার্জন করে।

মাহমুদার বিয়ের ব্যাপারে মা-বাবাকে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে জাহানারা। লায়েক আলী মাতবর বললেন, তোর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি মাহমুদাকে বিয়ে দিতে পারব না। তুই তো জানিস মা, লোকে শুধু দোষ খোঁজে। এমনিতেই তোকে অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না, তার ওপর যদি শোনে বড় মেয়ে রেখে ছোটটির বিয়ে হয়ে গেছে তাহলে সবাই বলবে না জানি আরও কী সমস্যা আছে।

জাহানারা অনুনয় করে বলল, যতই আমার সমস্যার কথা বলুক, কিছু এসে যায় না। তোমরা তাড়াতাড়ি মাহমুদার বিয়ের ব্যবস্থা করো।

মা বললেন, তুই নিজের কথা না ভেবে মাহমুদাকে নিয়ে অস্থির হয়েছিস কেন?

জাহানারা বলল, কারণ আছে মা। আমার জন্য আমার ছোট বোনের জীবন আমার মতো হোক তা চাই না।

মা বললেন, তোর তো আরও সম্বন্ধ আসছে। দেখা যাক না আর কটা দিন অপেক্ষা করে।

: না মা। সমস্যা আছে। সম্বন্ধ এলেই যে সম্পর্ক হয়ে যাবে এমন কথা নেই। হলে এতদিনে অনেক আগেই হয়ে যেত।

মাহমুদা বলল, আসল কথাটা বলে দে না আপা। না হলে আম্মু-আব্বু কেউই ব্যবস্থা নিবে না।

: তোকে না চুপ থাকতে বলেছি?

ধমক শুনে মাহমুদা কাঁদো কাঁদো মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যায়। লায়েক আলী জানতে চান, আসল কথা মানে বুঝলাম না। একটু বুঝিয়ে বল তো মা।

: তোমার অত বুঝার দরকার নেই আব্বু। যা বলছি শোনো। না হলে তোমাদেরই পস্তাতে হবে।

: পস্তাতে হবে মানে?

: মানে যখন পস্তাবে তখন বুঝবে।

মা বললেন, আমি তো তোদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

জাহানারা বলল, এখনই বুঝবে না মা। সময় হোক তখন বুঝতে চেষ্টা কোরো। দেখছ না তোমার ছেলে ফয়েজ- ফয়েজ আলী মাতবর সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ায় আর গোপনে মাতবরি করে।

: গোপনে মাতবরি করে মানে?

: তা-ও জানো না? বয়স কত? দুইবার এসএসসিতে ডাব্বা মেরে এখন প্রেম করে বেড়ায়। আব্বুর কাজেও একটু সাহায্য করে না।

লায়েক আলী একবার স্ত্রীর দিকে তাকান, একবার মেয়ের দিকে।

বললেন, ঘটনা খুলে বলতো মা?

জাহানারা বলল, ঘটনা কিছু নেই বাবা। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা এখন অনেক এডভান্স। ইন্টারনেটের যুগ। সব তাদের হাতের মুঠোয়।

মাহমুদা একটি কাগজ হাতে ঘরে ঢুকে কাগজটি লায়েক আলী মাতবরের হাতে দিয়ে বলে, আব্বু আমি চার মাস আগে গোপনে বিয়ে করেছি। আমার পেটে তোমার নাতি।

জাহানারা বলল, এত নাটক করার কী দরকার ছিল? আমি তো সব ব্যবস্থা করছিলাম।

ও আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। নিজের রুমে গিয়ে দ্রুত সেলাই মেশিন চালাতে লাগল।

ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে যায় যে মানুষ একটি ঘটনার মুখোমুখি হতে না হতেই আরেকটি ঘটনা সম্মুখে হাজির হয়। মাহমুদা ওর স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ আনন্দে আছে। কিন্তু জাহানারার বিয়ে আসে আর ফিরে যায়। নিজেকে আর উপস্থাপন করতে চায় না জাহানারা। ও বলে, সেলাই মেশিন নিয়ে বেশ তো আছি। এরকম একটি সময়ে সেই আনন্দের দিনটি এলো। জাহানারাকে দেখতে এসে ওকে পছন্দ করে ফেলল পাত্র স্বয়ং। নাম হামিদ বখ্ত। বয়স পঁয়তাল্লিশ। বিপতœীক। সতের বছরের একটি কন্যা সন্তান আছে। ঘটক খুব উৎসাহের সাথে জানাল, স্ত্রী পরলোকগত। লায়েক আলী মাতবর দ্বিধায় পড়লেন। তিনি অবিবাহিতা কন্যাকে এত বড় বয়সি সন্তানের জনকের সাথে বিয়ে দিতে গড়িমসি করলেন। শেষে জাহানারা বলল, কেউ তো রাজি হয় না আব্বু। তিনি যখন আমাকে পছন্দ করেছেন আমি এই পাত্রকেই বিয়ে করব।

লায়েক আলী মাতবরের কিছু বলার নেই। মেয়ের মতই তার মত। তিনি শুধু আনন্দ করবেন। কারণ হামিদ বখ্ত উচ্চবংশের ছেলে। স্ত্রী নেই বলেই তো বিয়ে করতে আগ্রহী। সে দর্শনার কেরু এন্ড কোং-এ চাকরি করে। মাশাল্লাহ ভালো চাকরি। ভালো উপার্জন। সেখানেই তার বাড়িঘর। মেয়েটি স্থানীয় একটি কলেজে পড়ে। সুতরাং নির্ঝঞ্ঝাট। এরকম একটি পাত্র পেয়ে জাহানারা খুশি। ও ভেবেছিল হামিদের কন্যার সাথে বনিবনা হবে কিনা সংশয় আছে। কিন্তু দর্শনা যাবার পর দেখল মেয়েটি বেশ মিশুক এবং ভদ্র। হামিদের কাছ থেকেই জাহানারা জানতে পারল ঘটক মিথ্যে বলেছিল। হামিদের স্ত্রী আসলে মারা যায়নি। সে পরকীয়ায় এতটাই মজে গিয়েছিল যে সেখান থেকে তাকে আর ফেরানো যায়নি। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল চুয়াডাঙ্গার একটি বখাটে ছেলের সঙ্গে। মেসেঞ্জার থেকে শুরু, শেষে সেলফোনে অবিরাম কথা। ঐ ছেলেটি নিয়মিত চুয়াডাঙ্গা থেকে দর্শনা চলে আসত দেখা করার জন্য। হামিদ অফিসে আর মেয়েটি স্কুলে থাকলে সেই সময়টুকু বাড়িতে নিয়ে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতো হামিদের স্ত্রী। একদিন মেয়েটির স্কুল আগে ছুটি হওয়ায় হাতেনাতে ধরা পড়ে। হামিদকে ফোন করলে দ্রুত বাড়ি যায় এবং স্ত্রীর কাছে ঘটনা জানতে চায়। এরপর স্ত্রী নিজ থেকে ডিভোর্স চায় এবং ঐ ছেলেকে বিয়ে করবে বলে জানায়।

জাহানারা সব শুনে থ। কী বজ্জাত মহিলা রে বাবা! এত সুন্দর একটি মেয়েকে ছেড়ে কীভাবে রাস্তার একটি ছেলেকে বিয়ে করে? স্বামীকে পছন্দ না হলে নাই, কিন্তু পেটের সন্তান?

জাহানারা নতুন সংসারে সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছে এবং মানিয়ে নিয়েছে নিজের মতো করে। মেয়েটির সাথেও বন্ধুর মতো মেশে। মেয়েটির কাছ থেকেই জেনেছে ও নাকি মাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। মায়ের থেকে দশ বছরের ছোট একটি ছেলের সাথে কেন মা এত আগ্রহী তা কেউ জানে না। এখন ওর মা নাকি ফোন করে কাঁদে। কিন্তু এই কান্নার কোনো গুরুত্ব ওর কাছে নেই।

জাহানারা মা হওয়ার আগেই মাতৃ¯েœহ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। হামিদ বখ্ত ভীষণ খুশি ওর ওপর। জাহানারার বাবার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সে জানে। তাই নিজ থেকেই একটা কিছু করার জন্য ব্যাকুল হলো। বলল, জাহানারা, তোমার বাবা আর ছোট ভাইকে একটা দোকান করে দিলে কেমন হয়?

: আপনি কেন সেটা করতে যাবেন?

: আমার ইচ্ছে।

: ইচ্ছে হলে আপনি বুঝবেন। আমাকে জড়াবেন না।

এরপর যত দিন যায়, জাহানারার জীবন তত আনন্দে ভরে ওঠে। ওর কোলে এখন তিন মাসের ছেলে। নাতিকে দেখার জন্য ঢাকা থেকে দর্শনা চলে যান লায়েক আলী মাতবর। তার জীবন এখন পরিপূর্ণ। সিরামিক টাইলসের ডিলারশিপ নিয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির টাইলস বিক্রি করে। দোকানে সঙ্গ দেয় তার ছেলে ফয়েজ আলী মাতবর। তার এখন আনন্দের সীমা নেই। তার মতো কালো গাত্রবর্ণের মেয়েটির জন্য আজ এত আনন্দ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj