রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯


রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন দুই দফায় কয়েক লাখে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সীমান্তে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে তখন বাংলাদেশ দ্বিতীয় চিন্তা না করে মানবিক চিন্তাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। জাতিসংঘ মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল, তার শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন প্রশংসার ফুলঝুরি ছড়িয়ে প্রথাসিদ্ধ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

এরপর তো যথারীতি নিয়মরীতির কাজকর্ম- শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়, এনজিওদের তৎপরতা, জাতিসংঘের অর্থায়ন ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রাজনীতির ঘোলাপানিতে ঘটনাবলির তলদেশ স্পষ্টভাবে দেখতে পায়নি। উপরতলাদের আপ্তবাক্যে আপাত বিশ্বাস স্থাপন করেছে। যখন ঘটনার ¯্রােত দৃশ্যত বিপরীত দিকে বইতে শুরু করেছে তখন তার টনক নড়েছে।

সুচতুর মিয়ানমার শাসকশ্রেণি নিশ্চয়ই প্রথম থেকেই ঘটনাবলির ওপর নজর রেখেছে, বাংলাদেশের মানবিকতা দেখে স্বস্তিবোধ করেছে, আরো রোহিঙ্গা বিতাড়নে উৎসাহবোধ করেছে। তাদের আর্থ-বাণিজ্যিক-ভূরাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার কারণে অশ্বত্থ-বটের মতো বড় বড় বিশ্বরাজনৈতিক শক্তি তাদের সমর্থনে নেপথ্য শক্তি।

তাই তারা খোলা হাতে রাজনৈতিক তাসগুলো খেলেছে। ‘যাহা বলিব মিথ্যা বলিব, মিথ্যা বই সত্য বলিব না’ এবংবিধ শপথ বাক্য মনোগহনে রেখে তাদের ক্রিয়াকর্ম ও তৎপরতার তাস চালাচালি। তাদের মন্ত্রী কক্সবাজারে এসে যেসব কথা বলে গেলেন, কিংবা খোদ ইয়াঙ্গুন থেকে শাসকশ্রেণির যা কিছু উচ্চারণ, তার কোনোটাই বাস্তবের আলোয় সত্য প্রতিপন্ন হয়নি।

এরপর বাংলাদেশের ছোটাছুটির পালা, দৈনিক পত্রিকায় বিশ্লেষকদের ঘটনার কাটাছেঁড়া সত্যাসত্যের প্রকাশ। শিক্ষিত শ্রেণি, রাজনীতিমনস্ক মানুষ সবারই এক কথা- ভারত তো আমাদের মিত্র-প্রতিবেশী, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সর্বোত্তম পর্যায়ে। তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারত আমাদের সাহায্য করছে না কেন? চীনা পণ্যে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব, বিনিয়োগেও তারা অনেক এগিয়ে, তারা এ ব্যাপারে নীরব কেন?

অতএব চীন, ভারত সফর, জাতিসংঘে বিষয়টির উত্থাপন, কিন্তু জাতিসংঘ তো নখদন্তহীন সংস্থা। তাদের চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে মিয়ানমারের শাসকশ্রেণি, এখনো দেখাচ্ছে। নেপথ্যে কি প্রধানত চীন, সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত। অবশেষে ভারতের মৌখিক ক‚টনৈতিক আশ^াস, আশ^াস চীনেরও।

কিন্তু মৌখিক আশ^াসে যে আশ^স্ত হওয়া যায় না, বাস্তবে তার টিকিটির দেখা মেলে না, চীন ও ভারতের আশ^াস বাংলাদেশের জন্য তেমনই এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে। আমরা তাই বারবার লিখছি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আসল চাবিকাঠি চীনের হাতে, তাদের মাঠে নামাতে না পারলে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান দুরস্ত।

বাংলাদেশ সেটা বোঝে। এ বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে সত্যটি অন্তনির্হিত, তাও তাদের অজানা নয়। যে জন্য ভারতের পক্ষ থেকে সরাসরি বলিষ্ঠ ঘোষণার অভাব রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে। চীন, ভারত উভয়েরই এখন পর্যন্ত ভূমিকা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি গোছের’। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা ক্রমাগত বাংলাদেশের হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।

দুই.

ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় ভিন্ন ¯্রােতে অনেক পানি বয়ে গেছে। চীন সফর শেষ। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে বক্তব্য পেশ, নিউইয়র্কে বেসরকারি পর্যায়ে কিছু কথা। দিল্লি সফরে অনেক স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক ক‚টনীতি ও বিবৃতি, পাল্টা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসাসূচক পুষ্পবৃষ্টি।

কিন্তু অন্বিষ্ট অধরাই থেকে গেছে। অনেক সমস্যা ও চাহিদার মধ্যে আপাতত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইস্যু, যে দুটির সমাধান না হলেই নয়। তা হলো প্রথমত ও প্রধানত অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত ন্যায্য চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি নিয়ে। এ ছাড়া রয়েছে একটি সাময়িক কাঁটা। আসামে এনআরসি। সেটা নিয়ে অবশ্য হয়তো মোদির ইশারায় চিৎকার চলছে না, ভেতরে কী হচ্ছে আমরা জানি না। তবে আপাতত আমাদের আলোচ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। কারণ দ্রুত প্রজননক্ষম এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা এক দশকের মধ্যে কত মিলিয়ন রোহিঙ্গাতে পরিণত হবে, তা আমাদের জানা নেই। তবে রোহিঙ্গাদের অবস্থান যে ক্রমাগত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্রমাগত সমস্যা তৈরি করে চলেছে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সমস্যা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিপরীতে বাংলাদেশের সমস্যাগুলো ভারতের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক‚টনৈতিক মহল এবং আমলাতন্ত্রের অজানা নয়। তারা জোর গলায় বাংলাদেশকে নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্প্রীতির মধু ঝরান। দুপক্ষের লেনদেনও নেহাত কম নয়। আপাতত দুর্মুখদের ভাষ্যে দ্বিপক্ষীয় বিনিময়ে ভারতের দিকে প্রাপ্তির পাল্লাটা ভারী।

ভারত অবশ্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ভিন্নমত তুলে ধরতে চাইবে। তবে তাদের ক‚টনৈতিক চাতুর্যের কাছে বাংলাদেশ হার স্বীকার না করে এ প্রসঙ্গে নীরবতা পালন সঠিক ক‚টনীতি বলে মনে করছে এবং ওই পথ ধরেই চলছে। তবে এ রাজনীতি নিয়ে জনবিরূপতার মোকাবেলা করা সহজ নয়। নিরপেক্ষ সুধীজন- ভারত বা বাংলাদেশের রাজধানীর শিক্ষিত শ্রেণিতে এমনকি রাজনীতিতে বা বাইরে সাধারণ মানুষের মনোভাব জানতে চাইলে সত্যটা মধুর হবে না। এমনকি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে।

মিত্র প্রতিবেশী ভারত সম্পর্কে এই স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়ার কথা ভারতের উল্লিখিত স্তরের ব্যক্তিরা জানেন। দু-চারজন ভারতীয় সাংবাদিক বাংলাদেশের দু-তিনটি দৈনিকে যেসব কলাম লিখে থাকেন তাতে তারা সৎ-সাংবাদিকতাসুলভ সাহস নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সত্য দিকগুলো তুলে ধরে থাকেন, থাকুক তাতে ফুলের পাপড়ির বদলে কাঁটা।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ করেছি যেমন উল্লিখিত দু-তিনজন ভারতীয় সাংবাদিকের ভারত-বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে কিছু প্রকৃত সমস্যা নিরসনে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ তেমনি এক সময় দুয়েকজন সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনারকে বেসরকারি অনুষ্ঠানে প্রশ্নের মুখে এসব বিষয়ে সত্য স্বীকার করতে দেখে। আসলে যারা রাষ্ট্র ও সরকার বিশেষের প্রতি আনুগত্য রক্ষা করেও চোখ-কান খোলা রাখতে পারেন বা জানেন, তারা ঠিকই সমস্যার সঠিক শিকড়ে পৌঁছাতে পারেন। তবে কেউ তা কখনো প্রকাশ করেন, কেউ করেন না।

কক্সবাজারের নিভৃত এলাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী অনুষ্ঠানের আলোচনা উপলক্ষে জনৈক ভারতীয় সাংবাদিকের উপলব্ধি এবং দৈনিকের পাতায় প্রকাশিত কলামে কিছু অপ্রিয় সত্যের উল্লেখ প্রশংসার দাবি রাখে। ভারত সরকার ও তার দক্ষ আমলাতন্ত্র চোখ বুজে থাকলেও বাংলাদেশের সমস্যার অব্যাহত কাঁটা মানুষকে যে ভারতবিরোধী করে তুলছে এ সত্যটা সম্ভবত সবারই জানা, সব পক্ষের জানা।

তবে কক্সবাজার প্রসঙ্গে কাকতালীয় হলেও সত্য যে সাহেবের বাজার ও সন্নিহিত এলাকা নিয়ে রোহিঙ্গা আবাসনে মিয়ানমার যে সমস্যা তৈরি করে চলেছে তার দ্রুত নিরসন না ঘটালে তা যে শুধু বাংলাদেশেরই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে তা নয়, সেই নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে যে স্পর্শ করবে না তা কি জোর দিয়ে বলা যায়? ইতোমধ্যেই আমরা লক্ষ করেছি যুক্তরাষ্ট্র মদদে বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রত্যক্ষভাবে বা বৃহৎ এনজিও সংগঠনের তৎপরতায় রোহিঙ্গা সমাজে, বিশেষ করে যুব ও তারুণ্যে যে নেতিবাচক মানসিকতা জন্ম নিচ্ছে তার নিহিত রূপটি সন্ত্রাসী চরিত্রের। স্বাধীন রাখাইন বা স্বাধীন রোহিঙ্গাস্তানের দাবি নিয়ে যে অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ রোহিঙ্গা যুব-তারুণ্যে তৎপরতা তৈরি হবে না, এ কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না।

আন্তর্জাতিক শক্তি বিশেষের এ অঞ্চলে ভূ-জল ব্যবহারের স্বার্থে অবকাঠামো নির্মাণের উচ্চাকাক্সক্ষা যে কোনো প্রকার অঘটন ঘটাতে পারে। মাধ্যম ভবিষ্যৎ রোহিঙ্গা সমাজ। সে ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থেও আঘাত লাগতে পারে। আলোচনাটা দীর্ঘ হওয়ার মতো, আপাতত শেষ কথা হলো, ঘরোয়া সমস্যার মধ্যেই বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে নতুন করে তৎপর হতে হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে। আর তাতে সক্রিয় সমর্থন জানানো ভারতের পক্ষে নিজ স্বার্থেও অপরিহার্য মনে করি, দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের বাধ্যবাধকতা তো আছেই।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

Bhorerkagoj