পোল্ট্রি খাতে সংকট (শেষ পর্ব) : নিবন্ধন, বিমা, নীতিমালা ছাড়াঅভিভাবকহীন খাত

বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর ২০১৯

’৮০-র দশকে শুরু হওয়া পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান বিনিয়োগ ছাড়িয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পোল্ট্রি শিল্প আজ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। পোল্ট্রি খাতের সংকট নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্টের আজ শেষ পর্ব

মরিয়ম সেঁজুতি : এক দশক আগেও দেশে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৬০ হাজারে। এ ছাড়াও আছে ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, মুরগির খাবার তৈরির কারখানা। পোল্ট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। সবগুলোরই এখন দৈন্যদশা। পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে ঝরে পড়েছে প্রায় অর্ধলাখ খামারি। মুরগির বাচ্চার দাম বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, অব্যবস্থাপনা, আড়তদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি হওয়া ও ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতাসহ নানা কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এই শিল্প। একই সঙ্গে দেশের অধিকাংশই মুরগির খামার চলছে নিবন্ধন ছাড়াই। এসব খামার রয়েছে সরকারের নজরদারির বাইরে। পাশাপাশি পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনকারী অনেক প্রতিষ্ঠানেও নিবন্ধন নেই। পুঁজি হারানো খামারিদের কপালে জোটেনি কোনো ‘বিমা’ সুবিধা। দীর্ঘসময়েও এ খাতের জন্য বাস্তবায়ন হয়নি নীতিমালা। পোল্ট্রি শিল্প যেন অভিভাবকহীন এক খাত।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর হিসাব মতে, ২০২১ সালে সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এ খাতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রতিটি মানুষের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে পোল্ট্রি শিল্পকে এগিয়ে যেতে হবে আরো বহুদূর। দেশে প্রতিনিয়তই বাড়বে ডিম ও মাংসের চাহিদা। এর ওপর ভর করে সৃষ্টি হবে আরো বড় বাজার। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুরগির বাচ্চার দাম বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, অব্যবস্থাপনা, আড়তদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি হওয়া ও ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতাসহ নানা কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এই শিল্প। বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সম্পাদক ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার মহসিন বলেন, বাচ্চার দাম নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেদিকে সরকারের নজর নেই। মুরগির বাচ্চার পাশাপাশি খাবারের দামসহ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমাদের খাতটিকে অভিভাবকহীন মনে হয়।

পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে ২০০৮ সালে করা হয়েছিল জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা। যেখানে পোল্ট্রিকে প্রাণিজ কৃষি খাত ঘোষণা করে শস্য খাতের সমান সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে পোল্ট্রির জন্য। কিন্তু কাগুজে নীতিমালাতেই আটকে আছে যার উন্নয়ন। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করছে পোল্ট্রি শিল্পের অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। দীর্ঘসময়েও নীতিমালা বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে নি¤œমানের ওষুধ বাজারে আসা বন্ধ হবে। পাশাপাশি ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারও কমে আসবে। একই সঙ্গে পোল্ট্রির রোগবালাই পর্যবেক্ষণে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।

জানা গেছে, পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেখানে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। নীতিমালার ২.২ ধারা বলা হয়েছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ১০০ বা এর বেশি পোল্ট্রি পালনকে বাণিজ্যিক হিসেবে গণ্য হবে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ১০০ তো নয়ই এমনকি ৩০০ বা ৪০০ মুরগির খামারকেও নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে না। সেখানে বাণিজ্যিক খামারে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ হচ্ছে এ খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নীতিমালা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান নীতিমালা অনেকাংশ প্রয়োগ হচ্ছে না।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj