কী হচ্ছে বিএনপিতে : মোরশেদ খান ও লে. জে. মাহবুবের পদত্যাগ

বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর ২০১৯

রুমানা জামান : হঠাৎ করেই দল ছাড়লেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান। এর আগে গতমাসে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এবং প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও অব্যাহতির আবেদন দিয়েছেন তিনি। তাদের এই আচমকা দলত্যাগে নড়েচড়ে বসেছেন বিএনপির সিনিয়ররা। কেন পদত্যাগ করলেন তারা? বিএনপিতে হচ্ছেটা কী? অন্য নেতারা কী ভাবছেন? এসব প্রশ্ন এখন রাজনীতির মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চলছে নানামুখী আলোচনা।

সূত্র জানায়, এক যুগেরও বেশি ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিতে নেতৃত্বের সংকট চলছে। বিশেষ করে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকায় দলে একদিকে চলছে সমন্বয়হীনতা। অন্যদিকে স্বেচ্ছাচারিতা। সিনিয়র অনেকেই অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। অনেকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না। ভুগছেন হতাশায়। এমনই পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেছেন এম মোরশেদ খান।

সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনায়ন বঞ্চিত হওয়ার পর থেকেই হতাশায় ভুগছিলেন মোরশেদ খান। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুগত বিএনপির এই নেতার ক্ষোভের একমাত্র জায়গা ছিল তারেক রহমান। এ নিয়ে সিনিয়র অনেক নেতার কাছেই তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, ম্যাডাম কারাগারের বাইরে থাকলে তাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করতেন।

সর্বশেষ দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে (চট্টগ্রামে) তার অনুসারীদের মূল্যায়ন করা হয়নি সেখানে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ানকে নিজের প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের সঙ্গে তার এলাকার রাজনীতি নিয়ে বিরোধ বিদ্যমান রয়েছে।

এসব ঘটনায় একপর্যায়ে এলাকায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়া থেকে শুরু করে দলীয় সব কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় পড়েন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয় তার। এরপরই পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সূত্র জানায়, কেবল দলের পক্ষ থেকে অবহেলাই নয় নিজের কিছু মামলা মোকাদ্দমা নিয়েও বেশ বেকায়দায় রয়েছেন মোরশেদ খান। গত ১১ জুলাই মুঠোফোন কোম্পানি সিটিসেলের নামে এবি ব্যাংক থেকে ৩৮৩ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যার ফলে শারীরিক চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশ যেতে পারছিলেন না। তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হচ্ছে না। এ ছাড়াও তার ব্যক্তিগত কিছু ব্যবসায় কর, ভ্যাটসহ নানা ঝামেলাও রয়েছে। ভবিষ্যতে আরো হয়রানির শিকার হতে পারেন- এমন শঙ্কায় পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করায় দলত্যাগে বাধ্য হন তিনি।

গত মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরাবর লেখা পদত্যাগপত্রটি তার ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পাঠান তিনি। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন- অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে আমার উপলব্ধি হয়েছে- এই দলে আমার আর অবদান রাখার কিছু নেই। বিএনপির রাজনীতি এখন আর রাজনীতি নেই। এরা স্কাইপের মাধ্যমে রাজনীতি করতে চায়। এটি করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। পদত্যাগপত্রের লিখিত অভিযোগের বাইরে তিনি এ বিষয়ে ভোরের কাগজের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

এর আগে গত ২ নভেম্বর যুবদলের নবগঠিত কমিটিকে কেন্দ্র করে সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করবেন বলে শোনা যায়। এ ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ একাধিক কেন্দ্রীয় পদের একাধিক নেতারা পদত্যাগ করতে যচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এর আগে দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু, এনাম আহমেদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলসহ অনেকেই দলত্যাগ করেছেন। যা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

এদিকে, মোরশেদ খানের পদত্যাগপত্র নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে বিএনপিতে। পদত্যাগপত্রটি এখনো হাতে পাননি বলে জানিয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি বিভিন্ন মাধ্যমে মোরশেদ খানের পদত্যাগের বিষয়টি শুনেছি। কিন্তু তার পদত্যাগপত্র আমি এখনো পাইনি। পদত্যাগ পত্রটি না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদও।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, সুসময়ে অনেকেই দলে ভিড় করেন। দুঃসময়ে নিজেদের রক্ষায় কেউ কেউ চলে যান। তবে মোরশেদ খানের দুঃসময়ে দল ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল না। কারণটা খুঁজে বের করুন।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj