টুসিদের গ্রাম : কামাল হোসাইন

বুধবার, ৬ নভেম্বর ২০১৯

শান্ত ও মায়াময় এক গ্রাম। চিত্রা নদীর তীরঘেঁষে থাকা গ্রামটির নাম নিশ্চিন্তপুর। টুসিদের গ্রাম এটা। টুসি তার দাদির কোলে শুয়ে শুয়ে নানারকম গল্প শোনে।

সে দিনও টুসি এই গ্রামের অজানা গল্প শুনছিল দাদির কাছে। দাদি গল্প বলছেন, আর টুসি তন্ময় হয়ে শুনছে।

দাদি বলতে শুরু করেন-

নিশ্চিন্তপুর গ্রাম আর চিত্রা নদী পরস্পর জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে থাকে চিরদিন। গ্রামের পথে-পথে সবুজের মাখামাখি। নানারকম গাছগাছালিতে ঠাসা। এসব গাছে-গাছে হরেক পাখির বাস। সারাদিন তারা কলকাকলিতে ভরিয়ে রাখে গ্রামের এ মাথা-ও মাথা।

টুসি তোমার শুনতে ভালো লাগবে, জানো এই গ্রামের কেউ পাখি শিকার করে না। পাখিরা যাতে নিরাপদে এই গ্রামের সবুজের সঙ্গে মিশে গিয়ে আনন্দমুখর থাকতে পারে, তার সুব্যবস্থা করেছে এই গ্রামের লোকেরাই। পাখিদের যাতে বাসা বাঁধায় অসুবিধা না হয়, সে জন্য গাছে-গাছে মাটির হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়েছে। পাখিরা নিশ্চিন্তে এসব হাঁড়ির ভেতর ডিম-বাচ্চা তোলে। মনের আনন্দে বাস করে।

এই গ্রামের মানুষ ক্ষেতেও কখনো কীটনাশক ব্যবহার করে না। এতে সবাই যেমন বিষমুক্ত ফসল পায়, তেমনি ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করা মৌমাছিরা আনন্দে মৌচাক গড়ে তোলে। ফলে নিশ্চিন্তপুরের লোকেরা সারাবছরই ওইসব মৌচাক থেকে প্রচুর মধু পেয়ে থাকে।

ক্ষেতে কীটনাশক দিলে প্রকৃতির বন্ধু মৌমাছি মরে যায়। ক্ষতি হয় পরিবেশের। তাই এই বিষয়টাও খেয়াল রাখে গ্রামবাসী।

এই গ্রামের মানুষের তেমন অভাবও ছিল না। তাই কেউ গ্রামের গাছে-গাছে ধরা ফলফলাদি বাজারে বিক্রি করত না। নিজেরা খেত আর গাছে যা থাকত তা পাখিরাই খেয়ে আনন্দে গান করত। এ জন্য এই গ্রাম থেকে কখনো পাখিরা অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতো না। তুমি তো জানো, পাখি সংরক্ষণের জন্য এই গ্রামে একটা বার্ড ক্লাব রয়েছে এখন। আর আছে সুন্দর একটা পাঠাগার। ওই পাঠাগারে অনেক অনেক বই। গ্রামের নানা বয়সী মানুষ এখানে নিয়ম করে প্রতিদিন বিকেলে পড়তে আসে। বলা যায় বিকেলটা বাজে আড্ডায় না কাটিয়ে তারা জ্ঞান অর্জনে নিজেদের ব্যস্ত রাখে।

নতুন কেউ এই গ্রামে এলে তার মন ভরে যেত। সহজে ভুলতে পারত না কেউ।

গ্রামের নামের সঙ্গে মিল রেখে এই জনপদের মানুষের ভেতরে শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল অপরিমেয়। মানে নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মানুষ সবকিছু থেকেই নিশ্চিন্ত ছিল। চিন্তা বলতে কোনো কিছু ছিল না তাদের। এখানকার মানুষদের কোনোরকম হানাহানি, মারামারি, একে অন্যের ক্ষতি করা- এ ধরনের কিছুরই মোকাবেলা করতে হয়নি কখনো।

কিন্তু কি দিয়ে কী হলো, গ্রামের সেই শান্তি-শৃঙ্খলা হঠাৎ উধাও হয়ে গেল একদিন।

তখন ১৯৭১ সাল। তখন এই জনপদেও সারাদেশের মতো দেশ বাঁচাবার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। মুক্তির সে যুদ্ধে এ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত করে নিয়েছে নিজেদের। নিজের ঘর-হারানোর প্রশ্ন যেখানে, তার মাঝে আর কিছু থাকতে পারে বলো?

টুসি মাথা ঝাঁকায়, না থাকতে পারে না।

দাদি আবার বলতে থাকেন, কারণ কি বলো তো? কারণ এখানে সবাই অত্যাচারের শিকার। পাকিস্তানি শাসকদের এই অন্যায়-অত্যাচার কেউই মানতে পারে না। ফলে জানবাজি রেখে যে যার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করতে শুরু করল। সেখানে বয়স নির্দিষ্ট ছিল না। কে ছেলে, কে বুড়ো, কে শ্রমিক, কে মজুর, কে ছাত্র, কে শিক্ষক- ছিল না এসবের বাছবিচার। কারণ, দেশ তো সবার। সবাই এখানে নিজের দেশে টিতে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে।

একদিন ভোরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল পাকিস্তানি বাহিনী। ঘরে ঘরে আগুন দিতে লাগল তারা। সঙ্গে থাকা কিছু বাঙালি রাজাকার লুটপাটে জড়িয়ে পড়ল। অনেক যুবককে ধরে নিয়ে গেল। কাউকে কাউকে ঘর থেকে বেরুতেই দিল না। আগুনে পুড়িয়ে মারল। গুলি করে মারল অনেককে।

এক ছেলে ছাড়া এই গ্রামের বৃদ্ধা আঙুরবালার তিন কুলে আর কেউ ছিল না। বিপুল নামের ছেলেটাই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন। এই গোবেচারা ছেলেটাও একদিন দিনেদুপুরে নাই হয়ে গেল। আঙুরবালার সামনে দিয়েই হার্মাদ বাহিনী বিপুলকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল। কোনোভাবেই তা ঠেকাতে পারেনি সে। চোখের সামনে দিয়ে প্রাণপ্রিয় ছেলেকে নিয়ে যেতে দেখে তার বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল। বোবাকান্না তাকে এমনভাবে জাপটে ধরেল, যে তার মুখ দিয়ে একটি কথাও বের হয়নি আর। আঙুরবালার জন্য এ এক অসহায় আত্মসমর্পণ বলতে পারো।

সবাই দেখল তাদের আঙুরবালা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। কারো সঙ্গে কথা বলে না। কোথাও যায় না। ঠিকমতো মুখে কিছু দেয় বলেও মনে হয় না।

মনে মনে কী যেন বিড়বিড় করতে থাকে। ঘরের বারান্দায় বসে উদাস চোখে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে। ছেলেকে হারানোর পর থেকে বিছানায় মাথা দেয় না আঙুরবালা। ঘরের বারান্দায় বসে বা ধুলোপড়া মেঝেতেই গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। গোসল হয় না বললেই চলে। চুলে তেল পড়ে না কতদিন। তাই চুলেও জট ধরেছে। মোটামুটি ধুলোমলিন চেহারা এখন আঙুরবালার। হঠাৎ দেখলে তাকে চিনতেই পারবে না কেউ।

গ্রামের প্রায় সব বাড়ির অবস্থাই এক। কে কার খোঁজ রাখবে? আঙুরবালারও তাই কেউ সংবাদ রাখতে পারে না।

পাকিস্তানি বাহিনী ঢোকার পর থেকে নিশ্চিন্তপুর গ্রামটাই যেন মরে গেছে।

একদিন ভোর। কুয়াশা তখনো কাটেনি। সূর্য উঠতে তখনো বেশ দেরি।

আঙুরবালা ঘরের বারান্দায় শুয়ে আছে। হঠাৎ তার মনে হলো, তারই নাড়িছেঁড়া ধন বিপুল এসেছে। তার কাছে এসে মাথাটা বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল, মাগো, এ কী হাল হয়েছে তোমার? তোমারে তো চেনাই যাচ্ছে না! এভাবে পড়ে থাকলে তুমি তো মরে যাবে মা!

তুমি ওঠো। সূর্য উঠতে বেশি দেরি নেই। তোমার ছেলের মতো হাজারো সোনার ছেলের রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে।

এই নিশ্চিন্তপুরের শান্তি আবার ফিরে আসবে মা। কেবল আমিই তোমার কোলজুড়ে থাকতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো তুমি। তবে আমি নেই তো কী হয়েছে? এক ছেলে হারিয়ে তুমি হাজার ছেলে পাবে। যারা তোমায় ‘মা মা’ ডেকে আমার কথা ভুলিয়ে দেবে। ভালো থেকো মা।…

এরপর ধড়মড় করে জেগে উঠল আঙুরবালা। ঘটনার আকস্মিকতায় চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল সে। অনেকদিন কথা না বলা কণ্ঠ সকল নির্জনতা কাঁপিয়ে আর্তনাদ করল।

তারপর কানখাড়া করে শুনতে পেল, অনেক মানুষের মিছিল। বিজয়ের মিছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই আনন্দে আকাশ-বাতাস মুখরিত।

আঙুরবালা চোখ মুছল। ছেলে বিপুল তাকে কাঁদতে নিষেধ করেছে। তাই সে আর কাঁদবে না। দেশ শত্রুমুক্ত করে ছেলেরা ফিরেছে। ওদের না-খাওয়া পেটে দেয়ার মতো কিছু তো জোগাড় করা চাই…।

গল্পের এটুকু বলে দাদি থামলেন। আঙুরবালার গল্প শুনে টুসিরও চোখ ভিজে উঠেছে।

দাদি ওর চোখ আঁচলে মুছে দিয়ে বললেন, পাগলি মেয়ে। এখন তো যুদ্ধ তোমাদের। ভালো করে লেখাপড়া শিখে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার তাড়িয়ে দিতে হবে। দুষ্টু লোকেদের শাস্তি দিতে হবে। তবেই না বিপুলদের মতো হারিয়ে যাওয়া লাখো প্রাণ শান্তি পাবে।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj