পাড়ার মাস্তান হতে চেয়েছিলেন জয়া

মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর ২০১৯

শৈশবে তার খুব ইচ্ছে ছিল ক্যাডার (বিসিএস নয়) হওয়ার। বিশেষ করে এলাকার সবচে বড় ক্যাডার (মাস্তান) ‘রকি দা’ ভীষণ টানতো তাকে। কেননা সবাই যে রকি দা’কে দেখলেই সালাম দিত, সম্মান করত, ভয়ে পথ ছেড়ে দিত। দারুণ ঈর্ষা থেকেই তার মতো হওয়ার বাসনা লালন করতেন পিচ্চি বেলা থেকেই। কিন্তু বাস্তবে বড় হয়ে হয়েছেন ফুটবলের ক্যাডার। তার ভাষায়, এক অর্থে আমি তো ক্যাডারই, খেলা পরিচালনার সময় আমি যা বলি, নির্দেশনা দেই সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই বাঁশি, হলুদ কার্ড কিংবা লাল কার্ড ইত্যাদি … বলছিলাম বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) নারী ফুটবলের কোচ জয়া চাকমার কথা। বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে ফিফা রেফারি, ছিলেন দুর্দান্ত ফুটবলার। দৌড়, লংজাম্প, হাইজাম্প, বর্শা নিক্ষেপ, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন কিংবা টেবিল টেনিস সব খেলাতেই ছিল তার সরব উপস্থিতি। খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহের শুরুটা করে দিয়েছিলেন তার বাবা সঞ্জীবন চাকমা। মা মালতি চাকমার আগ্রহে শিখেছেন কারাতেও। ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে জয়ার না বলা অনেক কথা। পাঠকদের জয়ার না বলা কথা তুলে ধরেছেন-আ ত ম মাসুদুল বারী

ভোরের কাগজ : সম্প্রতি ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বাংলাদেশ সফর করে গেছেন এতে আপনার অনুভূতি?

জয়া : তিনি আমাদের নারী ফুটবলের দিকে আরো বেশি নজর দিতে বলেছেন। আরো বিনিয়োগ করতে পরামর্শ দিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে। আমার আরেকটু ভালো লাগতো বয়সভিত্তিক নারী দলটাকে যদি তার সামনে নিয়ে আসা হতো।

ভোরের কাগজ : এ পর্যন্ত আপনার বড় অর্জন কোনটা?

জয়া : আসলে অর্জন তো দুই ধরনের হতে পারে। একটা হচ্ছে- ধরেন আপনাকে ট্রফি দিল। আরেকটা হচ্ছে, মানসিক- যেটা আপনি শান্তি পান। আসলে আমি খুব কষ্ট করি, আজকে অনেক বছর যাবৎ আমি দৌড়াচ্ছি। দিনশেষে টায়ার্ড আমি যখন ঘুমাতে যাই, তখন মনে হয় এই যে আমি এত কষ্ট করছি, এত সহ্য করছি, এতকিছু, সত্যিকার অর্থে আমি সেটাই করছি যেটা আমি ভালোবাসি। আমার কাছে অর্জন এটাই মনে হয়।

ভোরের কাগজ : আচ্ছা আপনার প্রথম ইনকাম বা আয় কত এবং কি করে পেয়েছিলেন?

জয়া : ৫০ টাকা। প্র্যাকটিস করতে গিয়ে পেতাম দৈনিক হিসাবে। সেখান থেকে খেলতে খেলতে আমি খেলাকেই জীবিকা হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তবে কোনো কিছুতেই দমে যাইনি, হতাশ হইনি, মনের জোরে এগিয়ে গিয়ে আজ এই পর্যন্ত এসেছি। এই অবস্থানে আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে।

ভোরের কাগজ : আপনার কোনো কষ্ট বা দুঃখের কথা বলবেন যা আজো ভুলতে পারেননি?

জয়া : ২০১৩ সালে যখন বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করতে প্রথম শ্রীলঙ্কা যাই, সেখানে গিয়ে দেখি বিভিন্ন দেশের মহিলা রেফারিরা আছেন। কিন্তু আমাদের দেশের কেউ নেই। বিষয়টা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। পরবর্তীতে দেখলাম এই সেক্টরে তেমনভাবে কেউ উঠেও আসছে না। তখন থেকেই নিজের মধ্যে একটা জেদ চেপে বসে। তখন থেকেই ফিফা রেফারি হওয়ার জন্য সাধনা করে যাচ্ছিলাম। আমাকে যে করেই হোক সাফল্যের চূড়ায় যেতে হবে।

ভোরের কাগজ : এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ফিফা রেফারি না হয়ে বিয়ে করবেন না’ সে প্রতিজ্ঞা কি বহাল রেখেছেন?

জয়া : ওহ্! আসলে বিষয়টা অনেকটা কমিটমেন্ট টাইপ ছিল আরকি। বলতে পারেন নিজের সঙ্গে নিজের এক ধরনের কমিটমেন্ট যে, ফিফা রেফারি না হয়ে বিয়ে করব না। ধরেন- আপনি আমি কথা বলতে বলতে অনেক কথাই বলে ফেললাম। সব কথা তো আপনি লিখবেন না নিশ্চয়ই কিংবা হেড লাইন করবেন না । তো ওইটা যে হেডলাইন হয়ে আসবে! ভাবিনি, আমি আশাহত হয়েছি কিছুটা। ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে এটা নিয়ে আর আলাপ করিনি।

ভোরের কাগজ : বিশ্বমানে যেতে আমাদের মেয়েদের ফুটবল সঠিক পথে আছে কি?

জয়া : আমার মতে এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। এই কারণে ঠিক আছে যে, তখন থেকেই ধারাবাহিকভাবে রেজাল্ট আসতে শুরু করেছে যখন থেকে প্রাইমারি স্কুল লেভেল থেকে ফুটবল খেলাটা শুরু হয়েছে। তার মানে এটা বোঝা যায় বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন যদি করতে চান তাহলে অবশ্যই গ্রাসরুট লেভেল থেকে শুরু করতে হবে। তার উদাহরণ যেমন বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট।

ভোরের কাগজ : কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের পরিবর্তে মেয়েদের জন্য নারী কোচ হলে কেমন হতো?

জয়া : কোথায় পাবেন? তার সমকক্ষ কি কেউ আছেন বাংলাদেশে নারী কোচ? রব্বানী স্যার আমারও কোচ। তিনিই ঠিক আছেন। আজকে বয়সভিত্তিক বা বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবলার যাদের কথাই বলেন না কেন তার অবদান অনস্বীকার্য। তার চেষ্টা, শ্রম, অধ্যবসায়, মেধার জন্যই মেয়েদের ফুটবল আজকের এই অবস্থানে।

ভোরের কাগজ : আপনার সঙ্গে রেফারি হওয়া সালমা ইসলাম মনি সম্পর্কে কিছু বলুন-

জয়া : সালমা খুবই স্ট্রাগল করে এই জায়গায়টায় এসেছে। খুবই স্ট্রাগল করে, ধরেন আমার স্ট্রাগলের জায়গাটা এক ধরনের। ওর স্ট্রাগলের জায়গাটা আরেক ধরনের। আসলে প্রত্যেকটা মেয়েই একেকটা ফাইটার। এই যে যারা ফুটবল খেলছে কিংবা যারা খেলছে না। যারা বাইরে কাজ করছে, প্রত্যেকটা মেয়েকে প্রত্যেকটা দিন যুদ্ধ করতে হয়- বিশ্বাস করেন। সালমার বিষয়টা আমি জানি, ও তো প্রায় রেফারিং ছেড়েই দিচ্ছিল, ও আর রেফারিং করবেই না। তো ওই জায়গা থেকে আবার সে কামব্যাক করেছে। এখন সে অ্যাসিসট্যান্ট রেফারি হিসেবে নোমিনেটেড হয়েছে।

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj