নারীর পাশে পুরুষ : ছোট পরিসরে বড় কাজ

সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

সালটা ২০১৫। বলিউডের ‘প্যাডম্যান’ সিনেমা তখনো তৈরি হয়নি। কিংবা এই সিনেমা যে সত্য কাহিনী এবং যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি দক্ষিণ ভারতের সেই অরুণাচলম মুরুগানান্থমের বিষয়টি অনেকের কাছেই ছিল অজানা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের মাসিক ব্যবস্থাপনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নত করার লক্ষ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে বেসরকারি একটি সংস্থা। এই ভাবনাটি যার চিন্তার ফলস তিনি বেসরকারি সংস্থা ‘ডরপ’-এর গবেষণা প্রধান মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান।

যে বিষয়টি নিয়ে নারীও প্রকাশ্যে কথা বলতে সংকোচবোধ করেন কিংবা লজ্জায় মুখই খুলতে চান না এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ শুরুর সময় অনেকেরই ঠাট্টার পাত্র হয়েছিলেন যোবায়ের হাসান। ঠাট্টার ছলে বন্ধুরাও বলতেন, ‘কাজ করার জন্য আর কিছু পেলে না?’, ‘দেশে কি কাজের অভাব?’ কিংবা ‘শেষমেশ স্যানিটারি প্যাড!’ এমন সব কথা। তবে এসব কথা তাকে বিন্দুমাত্রও বিচলিত করেনি। বরং তিনি তার লক্ষ্যস্থির থেকে আরো উদ্যমে কাজে মন দিতেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নারী-পুরুষ উভয়েরই জানা দরকার। সঠিক মাসিক ব্যবস্থাপনা না জানার ফলে একজন নারীর শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে, এটা নারী-পুরুষ সবাইকে বুঝতে হবে। পরিবারের আয়ের একটা অংশ যদি মেয়ের মাসিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয় তবে মেয়েটির প্রজনন স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থ থাকবে।

এ বিষয়ে কাজ করার চিন্তাটা কীভাবে এলো জানতে চাইলে যোবায়ের হাসান জানান, ২০১৪ সালের ‘জাতীয় স্বাস্থ্য পরিচর্যা’ বিষয়ক প্রাথমিক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৫ ভাগ নারী ও কিশোরী মাসিক চলাকালীন পুরনো কাপড় ব্যবহার করেন এবং গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলকভাগে এটি বেশি দৃশ্যমান। মেয়েদের বিদ্যালয়গুলোতে মাসিককালীন পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার চিত্রটি আরো ভয়াবহ। এসব সমস্যার প্রধান কারণ হলো স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিনের সহজলভ্যতা, অপ্রতুলতা, সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কুসংস্কার। এ ছাড়া লক্ষীপুরের রামগতি উপজেলার প্রত্যন্ত চর এলাকায় অবস্থিত বালুরচর উচ্চ বিদ্যালয়ে জরিপে দেখা গেছে, মাসিক চলাকালীন মাত্র ৫ ভাগ ছাত্রী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে এবং বেশিরভাগ ছাত্রী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। এর ফলে তারা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারে না। প্রতি মাসে নগদ টাকা খরচ করা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়ে ও মহিলাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের পুরুষরা মূল আয় করে এবং সে ক্ষেত্রে মেয়েদের নিজস্ব ব্যবহারের উন্নয়ন হিসেবে প্রতি মাসে ৩০-৪০ টাকা এ খাতে পারিবারিক বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, একজন স্বামী ও কন্যা সন্তানের পিতা হিসেবে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে। আমি আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমি মনে করি, মেয়ের মাসিক সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য মা-বাবার সমানভাবে অংশগ্রহণ জরুরি।

কাজ শুরুর প্রসঙ্গে যোবায়ের হাসান বলেন, ২০১৪ সালের তথ্য এবং জাতিসংঘের স্বাস্থ্যের অধিকার বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমরা স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম শুরু করি। ডরপ ‘স্বাস্থ্যগ্রাম : ওয়াশ পরিবীক্ষণ প্রেক্ষিত’ কার্যক্রমের আওতায় নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীদের সমন্বয়ে স্কুল ছাত্রী ফোরাম গঠন করা হয়। প্রতি মাসে ছাত্রীদের নিয়ে একজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকার উপস্থিতিতে মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিবেশন পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি ছাত্রীদের মাঝে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ন্যাপকিন বিতরণ করা হয় এবং স্কুলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয়া হয়। এর ব্যবহার বিধি ছাত্রীদের হাতে-কলমে শিখানো হয়। ন্যাপকিন ব্যবহারের পর তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য বিদ্যালয়ে ঢাকনাযুক্ত ঝুড়ি সরবরাহ করা হয়। যাতে ছাত্রীরা সহজে ব্যবহার ও বর্জন করতে পারে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি স্কুলে ন্যাপকিনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে ছাত্রীরা প্রয়োজনে সংগ্রহ করতে পারে। এ কার্যক্রমের ফলে গ্রামের মেয়েরা পুরনো কাপড় ব্যবহার না করে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডরপ গ্রামের নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বানানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘উচ্ছ¡াস’ ন্যাপকিন উৎপাদন করে গ্রামের নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে স্বল্পমূল্যে বিতরণ করছে। এর ফলে এলাকাগুলোতে মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বরগুনার ১৮টি, রামগতির ১৫টি, নেত্রকোনার ৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সিরাজগঞ্জের সরকারি হাসপাতালে, টাঙ্গাইলে গ্রাম্য ডাক্তার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে এই স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়।

যোবায়ের হাসান জানান, ন্যাপকিনের ব্যবহার বাড়াতে তার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রমও করছে। যেমন চারটি স্যানিটারি ন্যাপকিনের খালি মোড়ক জমা দিলে একটি নতুন স্যানিটারি ন্যাপকিন বিনামূল্যে দিচ্ছে। পরিবেশ সচেতনতায় প্লাস্টিকের মোড়কগুলো সংগ্রহ করে ডরপ পুড়িয়ে ফেলছে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত স্কুলে মেলার আয়োজন করে ছাত্রীদের মাঝে সচেতনতা করে যাচ্ছে। এখানে উৎপাদিন ন্যাপকিনগুলো স্বল্পমূল্যের কারণে গ্রামের অনেক দরিদ্র নারীও এটি কিনতে পারছেন।

সংকোচ ভেঙে প্রতিটি নারী তার মাসিক নিয়ে কথা বলবেন। নিজে সচেতন হবেন, অন্যকেও সচেতন করবেন। এবং প্রতিটি মেয়ে যখন উপলব্ধি করবেন মাসিক কোনো লজ্জার বিষয় নয় বরং এটা তাদের অহংকারের বিষয়, সেদিনই তার প্রচেষ্টা সফল হবে বলে বিশ্বাস করেন মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj