পুঁজিবাজার ও আমাদের বিনিয়োগ ভাবনা

সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ পুঁজিবাজার। একটি দেশের শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা বজায় রাখতে শক্তিশালী পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোনো দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ব্যাপক বিনিয়োগ। জনগণের ক্ষুদ্র সঞ্চয়গুলো একীভূত করে দেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব। বিনিয়োগের আরেকটি উপায় হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ, দেশের ভেতর বিনিয়োগ সক্রিয় থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ সহজে আকৃষ্ট হয়। বিনিয়োগের দুটি ক্ষেত্রেই পুঁজিবাজার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। পুঁজিবাজারকে আমাদের দেশে শেয়ারবাজার বলা হয়। বড় বড় কোম্পানি যেমন তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মালিকানার কিছু অংশ বিক্রি করে পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে, তেমনি কম-বেশি শেয়ার কিনে নিয়ে বৃহৎ কোনো কোম্পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিকানার অংশ পায় সাধারণ জনগণ। পরবর্তী সময়ে কোম্পানি সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে উপার্জিত আয় লভ্যাংশ আকারে সাধারণ জনগণ পেয়ে থাকে। এভাবেই সাধারণ জনগণ তাদের জমানো অলস অর্থ দিয়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে তাদের পছন্দমতো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে নিজের ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত বিশ বছর ধরে প্রশংসনীয় সাফল্য ধরে রেখেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দেশ সামাজিক বিভিন্ন সূচকেও উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৩ শতাংশ, দশ-এগারো বছর আগে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.০৫ শতাংশ, যা এই অর্থবছরে (২০১৯-২০) ৮.২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিগত ৪৮ বছরে বাংলাদেশে কখনো ঋণাত্মক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। উল্লেখ্য, বিগত প্রায় দেড় দশক ধারাবাহিকভাবে ৬.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন সংস্থা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা বর্ণনা হলেও এর প্রতিবিম্ব কি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে? দেশের উন্নয়ন হলে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন হয় অথবা পুঁজিবাজারকে কাজে লাগিয়ে দেশে উন্নয়ন সম্ভব। আমরা কি সেটা করতে পেরেছি অথবা পারব? আমাদের পুঁজিবাজার নতুন নয়। ১৯৫৪ সালে শুরু হলেও মূলত গত দুই দশকে বিস্তার লাভ করেছে।

পুঁজিবাজারের উত্তরোত্তর উন্নতি, অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতে এর ব্যাপকতা অনুধাবন করে ১৯৯৩ সালে ‘সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন’ (এসইসি) গঠিত হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে সংগ্রহ করে জনগণের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে নিশ্চিত করে সম্পদের কাম্য বণ্টনের প্রক্রিয়াই পুঁজিবাজার করে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশের পুঁজিবাজার কি সেই ভূমিকা রাখতে পেরেছে? আমরা জানি ২০১০-১১ সালের ভয়াবহ উত্থান-পতনের পর পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের দেশের পুঁজিবাজার খুবই ছোট। বর্তমান দেশের প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৩১৯টি, যেখানে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ এন্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। প্রতি বছর কয়েক হাজার নতুন কোম্পানি নিবন্ধিত হয়। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১৪-১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা আমাদের মতো অর্থনীতির দেশ ও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ১৯৯৩ সালে ডিএসইর তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, বর্তমানে এই বাজার মূলধন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা বা ৪১.১০ বি. মার্কিন ডলার, যেখানে আমাদের জিডিপি ৩১৪ বি. ডলার। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের জিডিপি ২.৯৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিএসই সেনসেক্স ইন্ডেক্সের বাজার মূলধন ২ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি, যা তাদের জিডিপির প্রায় ৭৫ শতাংশ, বুরশা মালয়েশিয়ার বাজার মূলধন ৪১০ বি., যা তাদের জিডিপির ১০৯.৮১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন জিডিপির ৪৬.৬১ শতাংশ, ফিলিপাইন স্টক এক্সচেঞ্জ ৮০.৪২ শতাংশ, সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জ ১৯৪ শতাংশ, তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জ ১৭৩ শতাংশ, জাপান স্টক এক্সচেঞ্জ ১০৮ শতাংশ। এই তথ্য প্রমাণ করে আমাদের বাজার মূলধন টু জিডিপির অনুপাত অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা কম, যা পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থাহীনতার পরিচয়।

বাজার বিনিয়োগযোগ্য কিনা তার অন্যতম অনুপাত হলো পিই বা মূল্য-উপার্জন অনুপাত। পিই রেশিও হলো শেয়ারের বাজার মূল্যের সঙ্গে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ের অনুপাত, গড়ে যে পুঁজিবাজারের পিই রেশিও কম সেই পুঁজিবাজার বিনিয়োগযোগ্য বলে ধরে নেয়া হয়। আমাদের ডিএসইর বর্তমান পিই রেশিও ১৩.৫০, ভারতীয় বিএসই সেনসেক্স থার্টি ইনডেক্স ২৮.২৯, থাইল্যান্ড স্টক এক্সচেঞ্জ ১৮.৪৯। সুতরাং পিই রেশিও বিবেচনায় আমাদের পুঁজিবাজার যথেষ্ট আকর্ষণীয়। পুঁজিবাজার বিনিয়োগযোগ্য কিনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হলো ডিভিডেন্ড ইল্ড বা লভ্যাংশ উৎসারণ অনুপাত। এটা একটি কোম্পানির নগদ লভ্যাংশের ওপর নির্ভর করে। বিনিয়োগকারী বিনিয়োগকৃত টাকার ওপর বার্ষিক কত শতাংশ লভ্যাংশ আকারে পেয়ে থাকে সেটা হলো ডিভিডেন্ড ইল্ড। এটা দেখে সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে, যদিও আমাদের পুঁজিবাজারে বিভিন্ন কারণে বিদেশি বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। এই ডিভিডেন্ড ইল্ড আমাদের ডিএসই এক্স ইনডেক্সে ৪.২৪ শতাংশ এবং ডিএসই থার্টি ইনডেক্সে ৪.৭০ শতাংশ, বিএসই সেনসেক্স থার্টি ইনডেক্সে ডিভিডেন্ড ইল্ড ১.২১ শতাংশ, দ্য স্টক এক্সচেঞ্জ অব থাইল্যান্ডে ২.৯৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩.৩৬ শতাংশ। এই থেকে বোঝা যায় আমাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যারা নগদ লভ্যাংশ দেয়, বর্তমান বাজার মূল্যে এই শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বেশি লাভ পাওয়া যায়।

সরকার এই বাজেটে বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্কারের মধ্য দিয়ে নতুন আইনকানুন, বিধিমালা ও নীতিমালা প্রবর্তন করে পুঁজিবাজারের একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করেছে। তারপরও আমাদের পুঁজিবাজার অবমূল্যায়িত। ২০১০-১১ সালে বাজার পতনের পর এই ৮-৯ বছরে যে নতুন কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং পুরনো কোম্পানিগুলো বোনাস ও রাইট শেয়ার দেয়ার পর যে বাজার মূলধন বেড়েছে, তা বর্তমান বাজার মূলধন থেকে বাদ দিলে আমাদের বর্তমান ডিএসই এক্স ইনডেক্স তিন হাজারে নেমে আসবে, যা ২০১০-১১ ধস পরবর্তী সময় ছিল। তাহলে আমরা এই ৮-৯ বছরে এই পুঁজিবাজার থেকে কী শিখলাম? আমরা শিখেছি, বিনিয়োগকারীরা প্রতিদিন হাউসে গিয়ে তাদের শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করে। পৃথিবীর এমনকি কোনো অর্থশাস্ত্র আছে? যেখানে বলা আছে প্রতিদিন নতুন নতুন কোম্পানি কিংবা সেক্টরে বিনিয়োগ করলে বা মালিকানা পরিবর্তন করলে লাভবান হওয়া যাবে। যদি পুঁজিবাজার বিনিয়োগের জায়গা হয়ে থাকে তাহলে আমরা কী বিনিয়োগ করি? বিনিয়োগ কি এত স্বল্প সময়ের জন্য হয়? এজন্যই আমাদের বাজার এত ভঙ্গুর এবং অস্থিতিশীল।

আমাদের দেশে বিনিয়োগকারী সাধারণত দুই ধরনের, যেমন- প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, কিন্তু আচরণগত দিক দিয়ে উভয়ই একই রকম। আমরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করি না, স্বল্প মেয়াদি বিনিয়োগে অভ্যস্ত এবং দ্রুত লাভ করতে চাই, যা পুঁজিবাজারের মূল ভাবনা বা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও সম্পূর্ণ বিপরীত। কেউ কেউ মনে করেন শেয়ার বা আর্থিক সম্পদের বেচাকেনা করা কিংবা এগুলোতে বিনিয়োগ করে অর্থ উপার্জন করা এক রকম জুয়াখেলা। যদি কোনো বিনিয়োগকারী নিয়মনীতি অবজ্ঞা করে খেয়াল-খুশি মতো বিনিয়োগ করেন তাহলে তিনি লাভ-লোকসানের সম্ভাবনাকে জুয়াখেলার লাভ-লোকসানের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। বিনিয়োগকারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে শেয়ার ব্যবসাকে কেউ কেউ জুয়াখেলার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। শেয়ারবাজারকে জুয়ার সঙ্গে তুলনা করা নিতান্ত অজ্ঞতা, কিন্তু এটা অস্বীকার করা যায় না শেয়ার ব্যবসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, প্রায়ই কারসাজি হয়, যেহেতু আমাদের শেয়ারবাজারে তুলনামূলক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বেশি। তারা গুজবে বিনিয়োগ করে থাকে তাই খুব সহজেই কারসাজির ফাঁদে পড়ে তারা নিঃস্ব হয়। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এক কথায় বললে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতা এবং শেয়ারবাজার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।

আর্থিক শিক্ষা এমন একটি শিক্ষা, যা নিজের ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা শেখায়। এ শিক্ষা আর্থিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক সুরক্ষার পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করে। আর্থিক বাজারে যেসব বিনিয়োগযোগ্য পণ্য রয়েছে সেসব পণ্যে বিনিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জিত হয় আর্থিক শিক্ষার মাধ্যমে। ভোক্তারা এ শিক্ষার মাধ্যমে উপকৃত হলে তা সার্বিক অর্থনীতির জন্যও সুফল বয়ে আনবে। আমাদের পুঁজিবাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমাদের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বাজারের ঝুঁকির বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। যদি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন না হন তাহলে তারা গুজব ও অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এর ফলে শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বাজারের মৌলিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের বাজার বহুলাংশে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। কাজেই বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক শিক্ষা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুতরাং এটি বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, বিনিয়োগকারীদের আর্থিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে নজর দেয়ার এটিই গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমাদের পুঁজিবাজারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অর্থনীতিই সবচেয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই পুঁজিবাজারের জন্য একটি অভিজ্ঞ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো দক্ষ বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী তৈরির বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রæতিবদ্ধ, যার মাধ্যমে আমাদের বাজার আরো বেশি উপকৃত হবে।

মনিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

কতিপয় ছাত্র এমন উচ্ছৃঙ্খল হয় কেন?

Bhorerkagoj