জনপ্রিয় হচ্ছে হ্যালোইন উৎসব

রবিবার, ৩ নভেম্বর ২০১৯

সুমাইয়া আহমেদ

যাপিত জীবনে হ্যালোইন উৎসব সময়ের ট্রেন্ড। যারা উৎসবে মেতে ওঠে, তাদেরও ঠিক ধারণা নেই এ উৎসবের উৎস সম্পর্কে। গল্পনির্ভর এ উৎসব পশ্চিমা সমাজে অনেক পুরনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবর্তন ঘটেছে। গত ৩১ অক্টোবর হয়ে গেল হ্যালোইন উৎসব। হ্যালোইন শব্দটি শুনলেই অদ্ভুতুড়ে সব পোশাক, বিশাল সব মিষ্টি কুমড়া, ট্রিক অর ট্রিট ইত্যাদির কথা ঘোরে মাথায়। পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ হলেও, ইদানিংকালে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে হ্যালোইন উৎসব, তবে বেশ সীমিত পরিসরে আর তা শুধু অভিজাত এলাকা কেন্দ্রিক। এর পেছনে কারণ হিসেবে দাঁড়া করানো যায় বিদেশি মুভি আর টিভি সিরিজের প্রভাবকে। যেগুলো নিয়মিত দেখবার কারণে হ্যালোইনের ধারণাটিকে এখন বেশ পরিচিতই মনে হয়।

উৎস কথা

আজ থেকে ২ হাজার বছর আগে শুরু হয়েছিল হ্যালোইন। যদিও হ্যালোইন উপলক্ষে এখন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয় প্রতি বছর পশ্চিমা বিশ্বে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অভিজাত গোষ্ঠীর লাইফস্টাইলেও জায়গা করে নিচ্ছে হ্যালোইন উৎসব। সেটা কতটুকু বিস্তৃত হয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটাই দেখবার বিষয়। তবে হ্যালোউইন বা হ্যালোইন হচ্ছে ‘অল হ্যালোজ ইভ’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ‘হ্যালো’জ ইভনিং’ বা ‘হ্যালোড ইভনিং’ অর্থ ‘পবিত্র সন্ধ্যা’। এ ছাড়াও এটি অলহ্যালোইন, অল হ্যালোজ ইভ কিংবা অল সেইন্টস ইভ হিসেবে পরিচিত। এটি একটি বার্ষিক উদযাপন যা প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে ৩১ অক্টোবর পালিত হয়। আরবান ডিকশনারিতে যার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে ঠিক এভাবে- এটি শিশু-কিশোরদের একটি বাৎসরিক উপলক্ষ, যেখানে তারা ইচ্ছেমতো পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি হানা দিতে পারে।

জানা যায়, হ্যালোইন শব্দের উৎপত্তি ১৭৪৫ সালের দিকে। খ্রিষ্টান স¤প্রদায়ের মধ্যে এর উৎপত্তি। এর বাংলা মানে হলো পবিত্র বিকেল বা রাত। এটা স্কটিশ শব্দ, যার মানে হলো ‘সবকিছু পবিত্র’/ ‘অল হ্যালোস’ থেকে এসেছে, যা পবিত্র বিকেল বা রাতের পূর্ববর্তী দিবসকে বোঝাত। আধুনিক হ্যালোইন ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেল্ট ভাষাভাষি দেশের অধিবাসীদের লোকাচার ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত ধর্মাশ্রয়ী সামাজিক সংস্কৃতি। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন এ সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মে (ইহুদি, খ্রিষ্টান বা ইসলাম) বিশ্বাস করে না এমন পৌত্তলিকবাদীর সূত্র থেকে উত্থিত হয়েছে। জনৈক লোকাচারবাদী লেখকের মতে, পুরো আয়ারল্যান্ডে লোকাচার ও বিশ্বাসের সঙ্গে খ্রিষ্টানধর্মপূর্ব আইরিশদের লোকাচার ও বিশ্বের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর সমঝোতা ছিল। ঐতিহাসিক নিকোলাস রজার্স হ্যালোইনের উৎপত্তি খুঁজতে গিয়ে বলেন, রোমানদের প্রাচুর্যময় ফলের দেবী পোমানার সম্মানে ভোজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হ্যালোইন। এ প্রসঙ্গে আরো নানা ধরনের পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। তবে আধুনিক হ্যালোইন লোকাচারকে খ্রিষ্টীয় ধর্ম মতবাদের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। ৩১ অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের ১ ও ২ তারিখে ইউরোপ-আমেরিকার অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী হ্যালোইন উৎসব পালন করে। স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড থেকে আগত অভিবাসীরা হ্যালোইনকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন।

এবার আসা যাক হ্যালোইনের প্রথায় পৌত্তলিক প্রভাব নিয়ে, যেটি নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষণা, অনেকের মনেই আছে এ নিয়ে প্রশ্ন। সেটি বোঝবার আগে আমাদের জানতে হবে কেল্টিকদের নিয়ে। কেল্টিক ভাষায় যারা কথা বলেন তাদের বসবাস মূলত পশ্চিম ইউরোপের ছয়টি অঞ্চলে- ওয়েলস, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, কর্নওয়াল, ব্রিটানি এবং আইল অফ ম্যান। সম্মিলিতভাবে এদের বলা হয় কেল্টিক (বা সেল্টিক) অঞ্চল। কেল্টিক ভাষার একটি শাখা হলো গেলিক ভাষা- স্কটিশ, ম্যানক্স ও আইরিশদের ভাষার একটি মিলিত রূপ। এ ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ১৯ লাখ।

কেল্টিক জাতির নানা পৌত্তলিক বা প্যাগান উৎসবের প্রভাব পড়েছিল সদ্য খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর। তাই প্যাগান কিছু প্রথার ছায়া দেখা যায় হ্যালোইনে। ইতিহাসবিদ নিকোলাস রজার্সের এ বিষয়ে গবেষণা করে মন্তব্য করেন যে কেবল কেল্টিকই নয়, আরো কিছু প্যাগান ধর্ম অনুসারীদের প্রথাতেও আছে হ্যালোইনের উৎসব প্রথার শিকড়। তার মাঝে প্রধান তিনটি হলো-

১) পোমোনা ভোজ

প্যাগান রোমানদের প্রাচুর্যের দেবী পোমোনা। তিনি ছিলেন ফলের গাছ, বাগান ইত্যাদিরও দেবী। অনেক রোমান দেব-দেবীর গ্রিক অস্তিত্ব থাকলেও পোমোনা কেবলই রোমান দেবী ছিলেন। তার স্মরণে যে ভোজের অনুষ্ঠান হতো, তাতে প্রচলিত কিছু প্রথার সাথে মিল পাওয়া যায় হ্যালোইনের।

২) সাউইন

এটি একটি গেলিক ছুটির দিন। গেলিক জাতির ফসল ঘরে তোলা শেষে যে উৎসব হয় তার নাম সাউইন, প্রাচীন আইরিশ ভাষায় যার অর্থ ‘গ্রীষ্মের ইতি’। সূর্যাস্ত হবার সঙ্গে কেল্টিকদের নতুন দিন গণনা শুরু হয়। ৩১ অক্টোবর সূর্য ডুবে গেলে তাদের সাউইন শুরু, আর একইসঙ্গে সূচনা হয় শীতের। প্রাচীনকাল থেকেই কেল্টিক বা গেলিক প্যাগানদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ দিনটি। এ দিন তারা বনফায়ার জ্বালাতো, যা বর্তমানে হ্যালোইন উৎসবেও করা হয়। নবম শতকে পশ্চিমা চার্চ অল সেইন্টস ডের তারিখ মে মাস থেকে সরিয়ে ১ নভেম্বরে নিয়ে আসে পোপ চতুর্থ গ্রেগোরির নির্দেশে। ধীরে ধীরে সাউইন আর এই অল সেইন্টস ডে মিলিত হয়ে তৈরি হয় আধুনিককালের হ্যালোইন। ঐতিহাসিকরা গেলিক হ্যালোইনকে বোঝাতে সাউইন শব্দটা ব্যবহার করতেন উনিশ শতক পর্যন্ত।

৩) প্যারেন্ট্যালিয়া

প্রাচীন রোমে ৯ দিন ধরে উদযাপিত হতো প্যারেন্ট্যালিয়া উৎসব। ১৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ উৎসবে সম্মান জানানো হতো পূর্বপুরুষদের। তবে এ তিনটির মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাউইন বছরকে দুই ভাগ করে তারা এক ভাগ বা ঋতুকে বলত উজ্জ্বল ঋতু, যা আসলে গ্রীষ্ম। আর পরের ভাগ হলো শীত, যা আঁধারের ঋতু। এই আলো-আঁধারির সংযোগ মুহূর্ত ৩১ অক্টোবর সাউইন বা হ্যালোইন। উনিশ শতকের আয়ারল্যান্ডেও এ প্রথা প্রবলভাবে প্রচলিত ছিল। বিংশ শতাব্দীতে এসে ধীরে ধীরে নানা রকমের অদ্ভূত পোশাক বা কস্টিউম পরে হ্যালোইনের রাতে ঘুরে বেড়ানোর রীতি প্রচলিত হয় ইংল্যান্ডে। একই সময়ে প্র্যাংক বা কাউকে বোকা বানানোর খেলাও শুরু হয় ইংল্যান্ডে, যেটি কি না আরো দুইশ’ বছর আগেই স্কটল্যান্ডে হতো। অষ্টাদশ কিংবা উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকেও আমেরিকাতে হ্যালোইন পালিত হতো না। ১৯ শতকে যখন ব্যাপক হারে স্কটিশ ও আইরিশরা আমেরিকায় বসত গড়তে লাগল, তখনই শুরু হয় হ্যালোইন উৎসব, তবে অভিবাসীদের মাঝেই সীমিত ছিল সেটি। বিশ শতকের প্রথমদিকে এসে পুরো মার্কিন সমাজেই শুরু হলো হ্যালোইন পালন।

হ্যালোইন নিয়ে নানা বিশ্বাস

যুক্তরাজ্যের প্রাচীন অধিবাসীরা বিশ্বাস করত, বছরের শেষ দিন জগতের সব নিয়মকানুন স্থগিত হয়ে যায়। আর তখন মৃত্যুর দেবতা সব মৃত আত্মাকে অনুমতি দেয় জীবিতদের জগতে আসার। তখন বছরের শেষ দিন ছিল ৩১ অক্টোবর। আর ওদের মৃত্যুর দেবতার নাম ছিল ‘সাউইন’। আবার স্কটিশ ও আইরিশদের আরেকটি বিশ্বাস ছিল এ রকম-মৃতরা ছোট ছোট পাহাড়ে পরীদের সঙ্গে থাকে। আর বছর শেষের রাতে ৩১ অক্টোবর তারা জীবিতদের জগতে আসে নতুন দেহ নেয়ার জন্য। কাজেই এই মৃত আত্মাদের হাত থেকে বাঁচতেই হবে। তারাও একরকম উৎসব পালন করত।

হ্যালোইন কস্টিউম

হ্যালোইনের প্রস্তুতির অপরিহার্য অংশ হলো মিষ্টি কুমড়া। ছুরি দিয়ে কুমড়ার গায়ে চোখের আকৃতির ছোট গর্ত করে, ভেতরে বাতি জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় প্রতীকি দৈত্য, জ্যাক ও ল্যান্টার্ন। এ ছাড়াও নানারকম মুখোশ, বিভিন্ন ভৌতিক চরিত্রের পোশাক। ওই পোশাকগুলো পরিধান করে নিজের স্বাভাবিক চেনা চেহারা থেকে ভিন্ন কিছু হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করত মানুষ।

হ্যালোইন মেকাপ

এই রীতি অনুযায়ী হ্যালোইন উৎসবে মেকআপ ও কস্টিউম খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ উৎসবে অন্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে আজব বা ভৌতিক চরিত্রের পোশাকের পার্টি বেশ জনপ্রিয়। শুধু পোশাকই নয়, সাজেও একটা ভৌতিক ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে মেকআপ যে সবসময় ভীতিকর হতে হবে, তা কিন্তু নয়। যেমন কেউ হয় রাজকুমার, কেউবা রাজকুমারি, কেউবা কমিকের কোন চরিত্রে। কেউ হিরো/হিরোইন কেউবা আবার ভিলেন ভূতুড়ে পোশাকে যেমন- ভ্যাম্পায়ার, স্পাইডারম্যান, জম্বি, ডাইনি, পিশাচ, জলদস্যু ইত্যাদি সাজতে পছন্দ করেন।

১. যে কোনো মেকআপের শুরুতে প্রথমেই আসে বেইজ মেকআপ। এটা অনেক ভাল করে করতে হবে যেন পুরু হয়।

২. যেহেতু দীর্ঘ সময় মেকআপ রাখতে হবে তাই খেয়াল করবেন অবশ্যই প্রতিটি প্রসাধনী ওয়াটার প্রæফ যেন হয়।

৩. প্রথমে সারা মুখে ভাল ব্র্যান্ডের প্রাইমার ব্যবহার করুন যেন মেকআপ দীর্ঘস্থায়ী থাকতে পারে।

৪. একটি থিক ব্রাশ দিয়ে লিকুইড ফাউন্ডেশন মুখে লাগান।

৫. এরপর কনসিলার দিয়ে মুখের দাগ এবং চোখের নিচের কালো দাগ ঢেকে দিন।

৬. এবার একটি ও বেøন্ডার বা পাফ দিয়ে পুরো মুখে ভাল করে ব্লু্যান্ড করুন।

৭. ডার্ক ব্রাউন কালার কন্টোরিং প্যালেট দিয়ে পুরো মুখের কন্টোরিং করে নিন।

৮. কোনো চরিত্র বা কোন কাস্টিউম অনুযায়ী সাজবেন সেভাবে আইশ্যাডো, আইল্যাস, কন্ট্রাক্ট লেন্স, কাজল, মাস্কারা ও ব্রাইট বা ৯. শিমারি লুকের জন্য পরিমাণমতো হাইলাইটার ব্যবহার করুন। সবশেষে ব্যবহার করতে ভুলে যাবেন না দীর্ঘ সময় মেকআপ ধরে রাখতে মেকআপ সেটিং স্প্রে।

শেষ কথা

হ্যালোইন উৎসব এখন শুধু ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। এখন এই উৎসব পালন করা হয় বাংলাদেশেও। থার্টি ফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইনস ডে, ফাদার্স ডে কিংবা মাদার্স ডের মতো হ্যালোইন উৎসবও হালের নতুন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ঢাকার পাঁচতারকা হোটেলগুলো বাদেও গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত পাড়াগুলোতে এই উৎসব কেন্দ্র করে বেশ জমজমাট আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj