ইউটিউব ‘ভিউ’ বিচারে তারকা

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

বর্তমান সময়ে পরাণের গহীনে কোনো গান আর গেঁথে থাকছে না। সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে আবার কালের গহŸরে হারিয়ে যাচ্ছে গানগুলো। একজন শিল্পীকে তার গান কিংবা গায়কীর চেয়ে গানটির ইউটিউব ভিউ কত হলো তা দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। শ্রোতারা গান শোনার চেয়ে দেখাকে প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। বলা হচ্ছে শিল্পমানসম্মত ও কালের স্রোতে টিকে থাকার মতো গান হচ্ছে না। এ বিষয়ে সঙ্গীতাঙ্গনের তারকাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। লিখেছেন আহমেদ জামান

ইমরান

চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ থেকে উঠে আসা ইমরান অডিও ও প্লেব্যাকে বেশ জনপ্রিয়। হালের ইউটিউব জগতেও তার একচ্ছত্র আধিপাত্য। তিনি নিজেই জানালেন এখন পর্যন্ত তার ২২টি গান ইউটিউবে এক কোটি ভিউয়ের মাইলফলক পার হয়েছে। তার ‘বলতে বলতে’ প্রথমে কোটি ভিউয়ের ঘরে পৌঁছায়। এ ছাড়া কোটি ভিউ পাওয়া গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘রাতভর’, ‘আমি নেই আমাতে’, ‘জনম জনম, ‘বাহু ডোরে’, ‘দিল দিল’, ‘এমন একটা তুমি চাই’, ‘ফিরে এসো না’, ‘এ জীবনে যারে চেয়েছি’, ‘মেঘের খামে’ ইত্যাদি। ইমরানে সুরে অন্য শিল্পীদের গানও একই সফলতা পেয়েছে। এর মধ্যে তাহসানের গাওয়া ‘কেউ না জানুক’ উল্লেখযোগ্য।

ভালো গানের চেয়ে মানহীন গান ভিউ হচ্ছে বেশি- এমন প্রশ্নে ইমরান বলেন, ভালো শিল্পীর গান কিন্তু সবসময় ভিউ দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। হয়তো গানের জনপ্রিয়তা বিচার করা সম্ভব। একটা গান জনপ্রিয় হওয়া মানেই ভালো, তা কিন্তু না। ভালো-মন্দ দুরকম গানই জনপ্রিয় হয়। ভালোর পাশাপাশি বাজারি গানেরও ভিউ হচ্ছে। এর সঙ্গে মানের কোনো স¤পর্ক নেই।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টা হচ্ছে টিকে থাকা। একজন শিল্পী ধুম করে এসে অনেক ভিউ পেল। এরপর তিন মাস পরে হারিয়ে গেলাম। ওটার কিন্তু কোনো দাম থাকবে না। আপনাকে টিকে থাকতে হবে, ভালো গায়কী দিয়ে কণ্ঠ দিয়ে।

গান যেভাবে আগে অনুভব করত এখন করে না। ইমরান বলেন, বিষয়টার সঙ্গে পুরোপুরি একমত না আমি। ভিডিও দেখেই শুনক বা অডিও- গানটা মানুষ অনুভব করে দেখেই শুনে বা দেখে।

কনা

চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক ও ভিডিও গানে সমাদৃত তিনি। ভিউ বিচারে এখন দেশের নারী কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে তিনি। তার গাওয়া ‘রেশমি চুড়ি’ গানটি ইউটিউবে প্রায় আড়াই কোটিবার দেখা হয়েছে। ‘ইচ্ছেগুলো’ গানটিও দুই কোটির উপরে ভিউ হয়েছে। এ ছাড়া ইমরানের সঙ্গে তার গাওয়া ‘ও হে শ্যাম’, ‘প্রেমেরও বাক্স’, ‘কে কত দূরে’ গানগুলোও কোটি ভিউয়ের ঘর পার করেছে।

ইউটিউবে গান শোনা ও দেখাকে পজেটিভলিই দেখতে চান কনা। তিনি বলেন, এখনকার অধিকাংশ মানুষই গান শুনে ইউটিউবে। আগে যেমন টেলিভিশন চ্যানেল ছিল ওখানেও গান প্রচার হতো সেখানে দর্শক গান দেখত। সেটার হয়তো হিসাব পাওয়া যেত, যা এখন পাওয়া যায়। এটাকে খারাপ চোখে দেখার তো কিছু নেই। এ সময়ে এসে এ বিষয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই।

কনা আরো বলেন, এখন ইউটিউব ছাড়া গান শোনার কোনো অপশন আছে? তাহলে না দেখে উপায় আছে? এখন তো অডিও প্লেয়ারই নাই। আপনাকে মোবাইলে শুনতে হবে, ভিডিও দেখতে হবে। যেখানে লিরিক্যাল ভিডিও বা একটু পর পর শিল্পীদের ছবি ভেসে উঠে। একটু হলেও দেখতে হচ্ছে। শিল্পীর মূলায়নেরও কিছু নেই। যে গান ভালো হবে, সে গান ছবি দিয়ে হলেও মানুষ দেখবে শুনবে।

গান টিকে থাকা বা কালজয়ের ব্যাপারে এ শিল্পী বলেন, একটা গান যখন বের হয় তখন কিন্তু বোঝা যায় না গানটা টিকে থাকবে কিনা। গানটাকে সময় দিতে হয়। দশ-বারো বছর পরেও যদি মানুষ গানটা শুনে তাহলে ধরা যায় গানটা কাল জয় করেছে।

ঐশী

বর্তমানে প্লেব্যাকের নিয়মিত শিল্পী। তার গাওয়া ‘চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’র টাইটেল কোটি ভিউয়ের ঘর পেরিয়েছি। তাছাড়া ‘দিল কি দয়া হয় না’ একই মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

ইউটিউবকে নতুন শিল্পীদের জন্য বড় একটা সুযোগ মনে করেন ঐশী। তিনি বলেন, এটা তো সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে এখানে। আর ডিজিটালি গান প্রকাশ হচ্ছে। বেশ কিছু কো¤পানি এখন ভালো গানে বিনিয়োগ করছে। তবে অ্যালবাম প্রকাশ হচ্ছে একেবারেই কম।

ঐশী মনে করেন, জনপ্রিয়তা একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় জিনিস। ইউটিউব ভিউ গানের শিল্পীর জনপ্রিয়তা অনেকটাই জানান দেয়। অনেক মানহীন গান ভালোও ভিডিওর কারণে অনেক বেশি ভিউ হয়। কিন্তু দিনশেষে ভালো গানই টিকে থাকে।

শিল্পীর পারিশ্রমিক ও কাজ পাওয়াও এ ইউটিউব ভিউয়ের ওপর নির্ভর করে এটা মানতে নারাজ ঐশী। তিনি বলেন, আমি এরকম কিছু পাইনি। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করাও ঠিক হবে না।

গানের সঙ্গে আগে একজন শ্রোতা যেভাবে স¤পৃক্ত হয়ে যেতেন এখন সেভাবে হচ্ছেন না। ঐশী বলেন, ‘স¤পৃক্ত না হলে কিন্তু ভিউও বাড়বে না।’

মিনার

‘ঝুম’ গানটি দিয়ে ইউটিউবের কোটিপতি ক্লাবে প্রবেশ করেন মিনার। এরপর তার গাওয়া ‘তুমি তোমার মতো’, ‘আবার’, ‘দেয়ালে দেয়ালে’ গানগুলো কোটির ঘর ফেরিয়েছে। তা ছাড়া ‘যদি তুমি জানতে’, ‘কি তোমার নাম’, ‘তা জানি না’ গানগুলো কোটি ছুঁই ছুঁই করছে।

ইউটিউবের ভিউ নিয়ে মিনার বলেন, আমি কোনো শিল্পী বা তার কাজকে ফেসবুক-ইউটিউব দিয়ে বিচার করি না। অনেক গান কোটি ভিউ হয়েছে। এগুলো কী প্রমাণ করে না মানুষ বাংলা গান শুনছে?

গান শোনার চেয়ে ভিডিও দেখা হচ্ছে বেশি। মিনার বললেন ভিন্ন কথা, আমার তো উল্টো মনে হয় যে, ভালো গান না হলে মিউজিক ভিডিও করে লাভ নেই। তবে মিউজিক ভিডিও একটি বড় মাধ্যম গানকে শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

‘গান টিকে থাকে তার নিজস্ব গুণে। এর জন্য দরকার ভালো কথা, ভালো সুর ও গায়কী’- এমনটাই মনে করেন মিনার।

শিল্পমান শিল্প দিয়েই নির্ধারণ হবে

শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, গীতিকার

কোনো একটা দুর্বল গান, ভালো ভিউ হতেই পারে। কিন্তু একটা গভীর গান, যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথাই বলি। সেটা হয়তো ইউটিউবে ভিউ কম হবে। তার মানে এ না যে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভিউ কম হওয়া গানের চেয়ে দুর্বল। জনপ্রিয়তা কিংবা সংখ্যায় একমাত্র শিল্পমান নির্ধারণ করে না। এখন যেহেতু নতুন প্রযুক্তি এসেছে, এগুলোও চলবে। আবার ভালো গানের কদরও থাকবে। শুধুই দুর্বল গান প্রচার বেশি পাবে তা না ভালো গানও প্রচার পায়। তা আসলে বেশিই পায়। এটা চলতেই থাকবে। শিল্পমান তো আর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ হয় না, এটা নির্ধারণ হবে শিল্পই দিয়েই।

ভিউ নিয়ে সংশয় আছে

বাপ্পা মজুমদার, গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক

অনেক ক্ষেত্রে ভিউ টেম্পারিং করা হয়। বুস্ট দিয়ে বানানো হয়। যেভাবে ভিউ ব্যাপারটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়, এটা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক। ভিউ বেশি হওয়া মানেই মানসম্মত, এটা আমি মানি না। এই ভিউ নিয়ে সংশয় আছে। ভিউ হলেই গানের মান কিংবা শিল্পীর মান ভালো, এটা মানতে পারছি না।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj