নিজের পায়ে নিজের পথে ঋত্বিক

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

রাব্বানী রাব্বি

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে কী কী বলা যায়? বলা যায়, কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। এমনকি নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঋত্বিক শুধু একজন পরিচালকই ছিলেন না, ছিলেন তার চেয়েও বেশি কিছু। বিপন্ন সময়ের ভাজে ছড়িয়ে থাকা কোনো এক ঘুণে ধরা সমাজ কাঠামো কিংবা বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি একেছিলেন ঋত্বিক তার চলচ্চিত্রে। যে সমাজব্যবস্থা আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়। চিন্তাশীল শব্দের মালা গেঁথে দুই হাতে লিখে ছিলেন গল্প-কবিতা-উপন্যাস, কখনো-বা চিত্রনাট্য। রক্তে মাংসে ছিলেন শিল্পের মানুষ। নপুংশক সমাজের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন যিনি নিজস্ব শিল্পসত্তা বা শিল্পবোধ দিয়ে।

ঋত্বিক তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘শিল্পী হিসেবে লড়াই করার একটা প্রশ্ন আছে, সেটাই আমার কাছে বড় প্রশ্ন। নিজের স্বপ্ন নিয়ে লড়াই, সেটাতো বাইরের কাউকে বোঝানো যায় না। বোঝানোর কিছু আছে বলেও আমি মনে করি না।’ তার এই বক্তব্য জানা যায় সন্দীপন ভট্টাচার্যের সংকলিত ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ বইয়ে।

একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারত ভূখণ্ডে ’৪৭-এর দেশ ভাগ, তদুপরি দুই বাংলার আলাদা হয়ে যাওয়া। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে ’৪৩-এর মন্বন্তর; পথে পথে অনাহারি মানুষের করুণ মৃত্যু। এসব নির্মম ঘটনা হৃদয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন ঋত্বিককুমার ঘটক। যন্ত্রণায় ভারী হয়ে উঠা মহাকালের আদ্র বাতাসে পথ চলেছেন চলচ্চিত্রের এই দিকপাল। মাথার ভেতর যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। ছোটবেলায় সাহিত্যের প্রতি প্রবল ঝুঁকে শুরু করেছিলেন গল্প-কবিতা লেখা। ধীরে ধীরে শিল্প-সাহিত্যের সকল মাধ্যম, কবিতা-গল্প-নাটক সবকিছুকে সঙ্গী করে নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র দিয়ে করেছেন বিপ্লব। কলেজে পড়াকালীন জড়িয়ে ছিলেন রাজনীতিতে। এক সময় তথাকথিত রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গেও তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার অনেক আগেই ঋত্বিকের সঙ্গে তার পার্টির সম্পর্কচ্ছেদ হয়। কিন্তু আজীবন তিনি মার্ক্সিজম ও তার নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শের সংমিশ্রণে পথ চলেছেন। যেসব কথা উঠে এসেছে তার সিনেমা কিংবা গল্পে। তার ‘কমরেড’ গল্পে পার্টির নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুনা যায়, ‘চোখে রয়েছে ভীতি, বুকে রয়েছে লোভের লোভ, আর কামিজের জেবে রয়েছে টাকা’। যে কথা এখনো কোনো কোনো নেতা সম্পর্কে মানিয়ে যায়। যারা টাকার সঙ্গে আপস করে চলে। কিন্তু এই পথ ঋত্বিকের নয়, ঋত্বিক সেখান থেকে পালিয়ে আসা একজন। যার কাছে টাকার সঙ্গে আপস মানে মৃত্যু।

ঋত্বিক সবসময় তার আদর্শিক জায়গা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। চলচ্চিত্র দিয়ে লড়াই করেছেন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। তার নির্মিত চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা। দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত শ্রমজীবী মানুষের পাশে থেকে কথা বলে গেছেন আজীবন। যেসব কথা বলতে তার চলচ্চিত্র নির্মাণ। ঋত্বিকের মতে, ‘মাধ্যম কোনো প্রশ্নই না। আমার কাছে মাধ্যমের কোনো মূল্য নেই। আমার কাছে বক্তব্যের মূল্য আছে।…বক্তব্য বলার চেষ্টা বা পৃথিবী সম্বন্ধে জানা বা মানুষের প্রতি মমত্ববোধের প্রশ্নটাই প্রথম কথা’। তার নির্মিত চলচ্চিত্রেও দেখি আমরা সেই রূপ। ‘সুবর্ণরেখা’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ এই তিন চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই, দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবার বা মানুষের জীবনযুদ্ধ। তার মধ্যেও পরস্পরের প্রতি প্রেম বা মায়া। পরিবারে নিতার (সুপ্রিয়া চৌধুরী) দশভুজা হয়ে ওঠা কিংবা অনিশ্চিত জীবন জেনেও সীতা (মাধবী মুখার্জী) ও অভিরামের (সতীন্দ্র ভট্টাচার্য) প্রেম থেকে পরিণয়। মূলত সেই পঞ্চশ বা ষাটের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি অন্য একটা বাঁক নেয়। যে কালে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক তার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। দেশ ভাগের ফলে তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে দেশান্তরিত হয়ে মানুষের কলকাতায় চলে যাওয়া, কলকাতায় শুরু হওয়া বেকার সমস্যা। বলতে গেলে, নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের সব টানাপড়েন মূর্ত হয়ে ফুটে উঠে ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে। বিমূর্তে আমাদের চারপাশের বাস্তব জীবন। তবে সেই সময় ঋত্বিক যে ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তা ছিল তখন সাধারণ মানুষের ভাবনার বাইরে। চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ ওঠা নিয়ে পড়তে হতো ভাবনায়। অর্থাভাব, এমনকি শারীরিক অসুস্থতাও তাকে পথ ছাড়েনি। আবার কখনো তাকে নিয়ে করা আশপাশের মানুষদের বিদ্রƒপাত্মকও তাকে ভাবিয়েছে। ‘যুক্তি-তক্কো-গপ্পো’তে দেখা যায় নীলকণ্ঠ বাবুকে উদ্দেশ্য করে মানুষের মন্তব্য, ‘ব্যাটা ত্রিশটি বছর ধরে দুই বাংলার মিলন মিলন করে চেঁচিয়ে গেল। ঘটনাটি যখন খুব কাছাকাছি এসে গেছে তখন ব্যাটা লস্ট ইন দ্য সি অব অ্যালকোহল’; এভাবে কখনো কখনো নিজেই নিজের ক্রিটিক হয়ে ধরা দিয়েছেন মহাত্মা ঋত্বিক কুমার ঘটক।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj