শেষ দেখার সে দিন

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

আফিয়া খানম রোমা

খুব অনুনয় বিনয় করেই দেখা করবার কথা বলেছিলাম তাকে। সৌজন্যতা বোধ তার অনেক বেশি, সে জন্যই হয়তো না করতে পারেনি আমাকে। অবশ্য কোনো আবদারে বেঁকে ঝেঁকে বসলে, না সে খুব কমই করে। শুধু প্রতিউত্তরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল- কত সময় লাগবে তোমার?

আমি জানাই- আপনি যেখানে যতটুকু দেন, আমার ততটুকুতেই চলবে।

উত্তরটা তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ছিল ঠিক তা-না, কারণটা ছিল বাড়তি কোনো চাওয়া কোনোকালেই ছিল না আমার। আরে কাল বলছি কেন, তার সঙ্গে কাল অতিক্রম হয়নি আমার। কিছু মুহূর্ত ছিলাম, একে অন্যের অবচেতন মস্তিষ্কে।

নাম দেয়ার মতো কোনো সম্পর্ক আমাদের মধ্যে ছিল না। আর যেটা ছিল সেটাও কোনো সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ করবার জন্য যথেষ্ট ছিল না। সে কোনো প্রতিশ্রæতি আমাকে দেয়নি। তবু মনে হয় অগণিত লুকায়িত প্রতিশ্রæতি ভরপুর ছিল। পরিচয়ের দেড় বছরে কোনো সম্পর্ক দাঁড় করাতে পারিনি আমরা। অবশ্য দাঁড় করাতে পারিনি এটা বললে ভুল হবে; এটা বলা যায়, হয়তো চাইনি দাঁড় করাতে। শুরুটা বোধহয় বন্ধুত্ব দিয়ে হয়েছিল। আর শেষটা অগোচরে রয়ে গেল। তখন প্রথমবারের মতো শুনতে পারলাম, সে অন্য নগর খুঁজছে পাড়ি জমাবে বলে। বুঝতে আর বাকি রইল না, তার আর আমার সম্পর্কে নাম দেয়াটা হয়তো আর জগতের নিয়মে সম্ভব হয়ে উঠল না।

বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষদিন। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি, আর ভাবছি প্রতিবার দেখা হলে কীভাবে দৃষ্টি বিনিময় হতো। এখন তো সেভাবে দৃষ্টি বিনিময় যাবে না। তাই নিজেকে নিজে বুঝিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছিলাম। বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষার পর সে এল। সামনে আসার পরই একদিকে যেমন বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছিল, অন্যদিকে কেমন যেন এক সুশীতল হাওয়া বইছিল। সে হাঁটছিল আর পিছু পিছু আমি। খুব করেই টের পাচ্ছিলাম, আমি তার সঙ্গে হাঁটার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি।

একটা জুতোর দোকানে প্রবেশ, সঙ্গে আমিও। ও হ্যাঁ, দোকানে প্রবেশের আগে অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল- কোথায় বসতে চাই। উত্তরে বলেছিলাম- তার খুশি।

আমি প্রথমেই ভেবে নিয়েছিলাম একদম হাসব না। আর হাসির কথা বলছি বা কেন? হাসি আসবে কোত্থেকে! ভেতরে তো ঝড় হচ্ছিল। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া।

কিছু সময় পর বলল- কথা বলছো না কেন, বিরক্ত হচ্ছো নাকি?

সঙ্গে সঙ্গে জোরপূর্বক ঠোঁটের কোণে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বললাম- আরে কি বলছেন এসব! বিরক্ত হব কেন? আমিই তো ডেকে আনলাম আপনাকে।

তার ও তার বাবার জন্য জুতো পছন্দ করে দিতে বলল আমাকে। আমিও নিজের পছন্দ জুতো জোড়া ইশারায় দেখিয়ে দিলাম। দেখলাম তার পছন্দ আর আমার পছন্দ কাছাকাছিই।

জুতো কেনা শেষে অন্য দোকানে নিয়ে গেল। শার্ট ও প্যান্ট পছন্দ করার দায়িত্বটা আবারো আমার ওপরই পড়ল। তিনটি শার্ট দেখলাম, এর ভেতর দুটি সাদা। সাদা মানে পুরো সাদা না, সাদার মধ্যে হালকা আকাশি ছাপ আর অন্য একটি স্টেপ। ট্রায়াল রুমে গিয়ে যখন পড়ে দেখছিল; মনে মনে ভাবছিলাম, হয়তো আমাকে ডেকে আর দেখাবে না। বলবে না দেখো, কেমন মানিয়েছে, বুড়ো বুড়ো দেখাচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু না। এবারো বেশ বুঝতে পারছি, আমার সাপোর্ট চাচ্ছে। বেশ সুন্দর, ভালো মানিয়েছে- বলে বাহাবা দিলাম। আর তাতেই সিলেক্ট হয়ে গেল প্যাকিংয়ের জন্য। বারবার মনে হচ্ছিল আগে শপিংয়ে গেলে কত দুষ্টুমিই না করতাম। আর এখন কাছে থেকেও কত দূরত্ব।

শপিং শেষে আবার বাসস্ট্যান্ডে। এবার দুজনের গন্তব্য দুদিকে। আমি উত্তরে আর সে দক্ষিণে। তারপর বায়না ধরলাম আমিও যাব। সে বলছিল- মার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে, আগামীকাল বের হবো। আজ চলে যাও। অফিস করে আসছো, বাসায় যাও, রেস্ট নাও।

বললাম- শুধু বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে চাই।

বাচ্চাদের মতো বুঝাচ্ছিল- এ গরমে যাওয়ার দরকার নেই, কাল তো দেখা হবেই।

দক্ষিণে যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, আর সে বাসের অপেক্ষা করছে। অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার আর্জি করলাম। সে মেনে নিল। অনেক সময় পর একটি বাস এলে সে উঠে পড়ল। তবে আমি উঠলাম না। তাকিয়ে রইলাম। তারপর ‘এসো’ বলে ওর গলার স্বর শুনতে পেলাম। আর দৌড়ে বাসে উঠে পড়লাম। বাসের সর্বশেষ পেছনে দুটি সিট খালি ছিল। ওইখানটায় বসলাম। ওর কাঁধে মাথা রেখে হাতটা ধরলাম। সাত-পাঁচ না ভেবে কত ধরনের অনিয়মের কথাই না বলছিলাম। কখনো কখনো শিশুসুলভ আচরণ। জানতাম ওই কাঁধটাতে শেষবার। বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস নিয়েছিলাম। হাতের আঙুলগুলোকে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খেলেছিলাম। রাস্তায় অনেক জ্যাম দেখে তার কণ্ঠে বিরক্ত ছিল। কিন্তু আমার ছিল মহোৎসব। এর মধ্যেই জীবন ও বাহন থেকে নামার সিগন্যাল পড়ে গেল!

নেমে উত্তরে আসার বাসে উঠে পড়লাম। উল্টো পথে বেশি সময় থাকা যায় না। তাই আমিও পারিনি। ক’ফোঁটা অশ্রæ ঝরেছিল মনে নেই। তবে আজো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। বাসে থাকা অবস্থায় শুধু একটি কল এসেছিল। বলেছিল এখনো ওই জায়গাতেই জ্যামে পড়ে আছে, যেখানে আমি রেখে এসেছি। জ্যাম ঠেলে সে এখন বহুদূরে, অন্য নগরে তার বসবাস। সেই আগামীকাল আজো আসেনি, যে দিন বের হওয়ার কথা। সেই শেষ দেখা হয়েছিল চৈত্রের কোনো এক বৃহস্পতিবার।

:: ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj