প্রাপ্তি

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

শফিক শাহরিয়ার

মানুষ যখন পরাজয়ের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে, তখন তার মুখে ফোটে না জীবনের হাসি। যেন কতকাল ধরে দুঃখের বেসাতি! আকাশে বাতাসে হাহাকার করে দীর্ঘশ্বাস। জীবনের নির্মম আঘাতে ইচ্ছেগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বিষণœ পৃথিবীতে এক পশলা বৃষ্টি ঝরে না। তবু সে আলো-আঁধারিয়ার খেলা খেলতে চায়। জীবনের বাঁক-বদলের দূর অজানা পথে ভীষণ ক্লান্ত পথিক। জুয়েলও তেমনি অদেখা আলোর মিছিলে ছুটে চলে অহর্নিশ।

পানিশাইল গ্রামের ছেলে জুয়েল। খুব মেধাবী ছাত্র। গ্রামেই কাটে প্রাইমারি, হাইস্কুল ও কলেজ জীবন। উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশে শহরে গমন করে। নওগাঁ সরকারি কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবার। দিনগুলো প্রতিনিয়ত অভাবের কশাঘাতে পিষ্ট হতে থাকে। তার বাবাকে পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। এক বছর যেতে না যেতেই আবার গ্রামে ফেরে। সেখান থেকেই পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে চাকরির মহাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

চাকরির জগৎ মানেই কঠিন সংগ্রাম। এখানে টিকে থাকা চাট্টিখানি কথা নয়। হয়তো কেউ সফল হয়, আবার কেউ দুর্ভাগ্যক্রমে আলোর মুখ দেখে না। জুয়েল যদিও একটি বছর চাকরির পড়াশোনার তাগিদে ঢাকা গিয়েছিল। এখানকার অধ্যবসায়ী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা দেখে সে প্রথমত তালকানা হয়ে যায়। তার মনের মধ্যে একটা জিদ চেপে বসে। আমিও পারব। সে তাদের অনুকরণ-অনুসরণ করতে লাগল। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দিল। অদ্যাবধি সফলতার দ্বারপ্রান্তে যেতে পারেনি। অল্প সময়ের প্রস্তুতি তার অনুক‚লে ছিল না। জীবনে দীর্ঘ অধ্যাবসায় থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। দেখতে দেখতে সরকারি চাকরির বয়স পেরিয়ে গেল তার।

তারপর আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে গ্রামে ফেরে। ঢাকা শহর তার বুক পকেটে শুধু হতাশাই দেয়নি। দিয়েছে অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা। সেখান থেকে সে বুঝেছে পড়ালেখা কারে কয়। এও বুঝেছে বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করা তার পক্ষে এক্কেবারে অসম্ভব। সেখানে এতদিন বন্ধুদের কাছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা জেনেছে। এসব চাকরিতে চব্বিশ ঘণ্টা কঠিন পেরেশানি নিয়ে থাকতে হয়। সে অনেক ভেবেচিন্তে বেকার বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে একটি ‘কিন্ডারগার্টেন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে। নতুন স্কুলে বছরের শুরুতেই অনেক ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়। গ্রামবাসী স্কুলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রতি বছরই স্কুলের ছাত্রছাত্রী বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অবশেষে জুয়েল ও তার বন্ধুরা হতাশার গøানি মুছে ফেলে। সবাই স্কুলের জন্য অগাধ পরিশ্রম করে। এখন গ্রামের ছেলেমেয়েদের দূরের স্কুলে যেতে হয় না। অল্প খরচে তারা গ্রামের স্কুলে পড়তে পারছে। খুব ভালো ফলাফল করছে। ছেলেমেয়ে শিক্ষিত হচ্ছে। এটাই তাদের বড় প্রাপ্তি। জীবনে এর চেয়ে আর কিই-বা বড় প্রাপ্তি আছে!

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj