গোখরা ও দাঁড়াশের বাজি

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

কবির কাঞ্চন

হিজলতলী গ্রামের পশ্চিমের ঝোপে দুটো সাপ বাস করত। খুব সুখেই তাদের দিন কাটছিল। তাদের একটি ছিল দাঁড়াশ সাপ অপরটি গোখরা। গ্রামের অধিকাংশ লোক কৃষিকাজ করত। সেই সুবাদে জন্মের পর থেকে এই গ্রামের মায়া ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে তাদের ইচ্ছে করেনি। এখানে বেঁচে থাকবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার তারা পেয়েছে। তার ওপর চারদিকে যে গাছগাছালি আছে তাতে অনায়াসে লুকিয়ে থাকতে পারে। শুধু মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে তাদের মনে যত ভয়। কোনো মানুষের সামনে একবার এসে পড়লে শেষ রক্ষা হবে না। সেক ারণে তারা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে।

আজ সকাল থেকে আকাশের এককোণে ঘনকালো মেঘ জমেছে। যে কোনো মুহূর্তে ভারী বৃষ্টি নামতে পারে। দাঁড়াশ সাপটি ঝোপের মধ্য থেকে তার মাথাটা বাইরে বের করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কিছু দূরে গোখরা সাপকে দেখে বুকে ভর দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে।

দাঁড়াশ সাপটিকে আয়েশি ভঙ্গিতে আসতে দেখে গোখরা মুচকি হেসে বলল- কি ব্যাপার! তোমাকে আজ বেশ খুশিখুশি দেখাচ্ছে। কোনো সুখবর আছে নাকি?

– না, এমনিতেই। এই কয়দিনের গরমে খুব অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। তোমায় দেখে বেরুবার একটু সাহস পেলাম।

– এত ভয় কিসের?

– মানুষ! ওই মানুষদের যত ভয়। ওরা খুব খারাপ। সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে ওরা যাচ্ছেতাই করছে। কারণে-অকারণে আমাদের পৃথিবী ছাড়া করছে। তাই আজকাল খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হই না।

দাঁড়াশ সাপের মুখ থেকে ‘মানুষ’ কথাটা শোনার পর গোখরাটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- হ্যাঁ, বন্ধু, তুমি ঠিক কথা বলেছো। মানুষজাতিকে চেনা দায়। পৃথিবীতে তারা পারে না এমন কাজ নেই বললেই চলে। স্রষ্টা তাদের বুদ্ধি-বিবেক অন্যসব প্রাণীর চেয়ে বেশি দিয়েছেন। অথচ তারা তা কল্যাণে ব্যয় না করে বেশিরভাগই সৃষ্টির অকল্যাণে ব্যয় করছে। শান্তির পৃথিবীতে চির অশান্তি সৃষ্টি করছে। তারা স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না।

– স্বার্থের জন্য তারা সব করতে পারে। আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে যখন দেখি বাবা-মার সঙ্গেও তারা স্বার্থের হিসেব করে।

এ কথা শুনে গোখরা চিন্তিত হয়ে বলল- তোমার কথার মানে বুঝলাম না। বাবা-মার সঙ্গে আবার কিসের স্বার্থের হিসেব। বাবা-মার সঙ্গে পৃথিবীর আর কারোর তুলনা হয় না। বাবা-মা তো বাবা-মাই। খোদার পরে তাদের ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে আমাদের আগমন। হঠাৎ এই প্রসঙ্গে বললে কেন?

– সে কথাই আসছি। গতকাল খাবারের জন্য পাশের বাড়িটির দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কান্নার আওয়াজ পেয়ে সেদিকে ছুটে গেলাম। নিরাপদ দূরত্বে থেকে কান পেতে সব শুনলাম। নীরবে অঝোরে কাঁদলাম।

– সেখানে কী ঘটেছিল?

– বৌয়ের কথা শুনে গর্ভধারিণী মায়ের গায়ে হাত তুলেছে ছেলে! বিশ্বাস কর, এই ঘটনা দেখে আমার ইচ্ছে করছিল সেখানে গিয়ে ঐ কুলাঙ্গার সন্তানকে পৃথিবী ছাড়া করি। কিন্তু তিন/চারজন লোক দেখে বিষহীন শরীরে এগুতে সাহস পাইনি।

– ওহ্ খোদা! মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে পারে এমন কুলাঙ্গারও পৃথিবীতে আছে।

এই কথা বলে রাগে গোখরাটি কয়েকবার ফণা তুলে মাটিতে ছোবল মারে।

পাশ থেকে দাঁড়াশ আবেগী হয়ে বলল- তুমি কাঁদছো, বন্ধু! আর কেঁদো না। ঐ ছেলেটিকে আমি দেখেছি। তোমার তো দেহে বিষ আছে। তোমার বিষ দিয়ে তুমি ওকে পৃথিবী ছাড়া করবে। ঐ অমানুষরাই আমাদের বেশি ক্ষতি করে।

– আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে এ কথা সত্য যে, ওরা সব সময় আমাদের শত্রু মনে করে। আমাদের দেখলেই যেন ওদের রাগ জমে যায়। অথচ ওরা বুঝতে চায় না, আমরা অকারণে গাছের একটা পাতাও ছিঁড়তে চাই না। কেউ আমাদের গায়ে এসে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য আমরা ওদের ছোবল দিই। সে মুহূর্তে তা না করে আমরা আর কিই বা করতে পারি? এদিক দিয়ে আমি কিন্তু তোমার চেয়েও সৌভাগ্যবান। আমার শরীরে যথেষ্ট বিষ থাকায় লোকজন আমায় ভয় পায়। ভয়ে পালিয়ে যায়। এই সুযোগে আমিও নিরাপদ স্থানে পাড়ি দিই। তোমার দেহে তো আবার বিষ নেই। তাই যত বড় লম্বা হও না কেন লোকেরা তোমায় দেখে তেমন ভয় পায় না। মারতে তেড়ে আসে।

এই কথা বলে গোখরা সাপটি বেশ কয়েকবার ফোঁস ফোঁস করে ফণা তুলে। দাঁড়াশ মন খারাপ করে আনমনে কিছু ভাবতে লাগল। গোখরা আরো কাছে এসে বলল- কি আমাকে ভয় পেয়ে গেলে? কিছু বলছো না যে!

দাঁড়াশ সাপটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- তোমার কথাগুলো নিয়ে ভাবছি।

– আমি কি মিথ্যা কিছু বলেছি?

– না, সে কথা বলছি না। তবে তুমি কি জানো? মানুষের মৃত্যুর একমাত্র কারণ তোমার বিষ নয়। মনের ভয় অনেকাংশে দায়ী হয়।

– তোমার এ কথা আমি মানতে পারলাম না।

– না মানার কি আছে? কোনো মানুষকে তুমি দংশন করলে মৃত্যু নাও হতে পারে। আবার আমি দংশন করলেও মৃত্যু হতে পারে।

গোখরা সাপটি তাকে উপহাস করে বলল- লম্বাদেহে একফোঁটা মরণবিষ নেই। তোমার কামড়ে মানুষ মরবে! বড় হাসালে বন্ধু।

– এখানে হাসির কিছু নেই। আমার কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয় তবে আমার সঙ্গে বাজিতে এসো। আমি নিশ্চিত, বাজিতে আমিই বিজয়ী হবো।

– আমি তোমার বাজি গ্রহণ করলাম।

– এক্ষেত্রে আমার একটি শর্ত তোমাকে মানতে হবে। শর্তটি উভয়ের জন্য কার্যকর হবে।

– আবার কি শর্ত?

– প্রথমে তুমি ছোবল দেবে। ছোবল দিয়ে তুমি নিজেকে লুকিয়ে নিবে। আর আমি তখন আহত লোকটির সামনে দিয়ে গড়াগড়ি খেয়ে পালিয়ে যাব। যেন লোকটি মনে করে আমিই তাকে ছোবল মেরেছি। আবার আমি যখন ছোবল দেব তখন আমি লুকিয়ে গেলে তুমি লোকটির সামনে গড়াগড়ি খেয়ে পালিয়ে যাবে।

– তাতে কী হবে?

– লোকটি তখন মনে করবে তার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া সাপটিই তাকে ছোবল মেরেছে। সে খুব ভয় পেতে শুরু করবে। এই ভয় তার মন থেকে শরীরে ক্রিয়া করবে। তারপর সেই ভয়ে তার মৃত্যু হবে।

গোখরা সাপটি সহজেই এই শর্তে রাজি হলো। এরপর পাশের গ্রামের আরো কয়েকটি সাপকে ডাকা হলো। সবার মধ্য থেকে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সাপটিকে বিচারকের দায়িত্ব দেয়া হলো।

সেইপথে একজন লোককে আসতে দেখে দাঁড়াশ সাপটি গোখরাকে উদ্দেশ্য করে বলল- দেখ, দেখ ওই ছেলেটাই তার মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। ভালোই হয়েছে। ওকে দিয়েই আমাদের বাজি শেষ করব। প্রথমে তোমার পালা।

মেঠোপথটি উর্বর ঘাসে ঢাকা। সেপথ দিয়ে হেঁটে যেতেই গোখরা সাপটি তার পায়ে ছোবল দিয়ে লুকিয়ে গেল। দাঁড়াশ সাপটি তখন ছেলেটির সামনে দিয়ে গড়াগড়ি খেতে খেতে পালিয়ে গেল। ছেলেটি দাঁড়াশ সাপটি দেখে মনে মনে ভাবলো- দাঁড়াশ সাপের তো তেমন বিষ নেই। কিছুই হবে না।

এই ভেবে আক্রান্ত স্থানে হাত দিয়ে মুছে বাড়ির দিকে চলে গেল।

বাড়ি এসে স্ত্রীকে জানালো তাকে দাঁড়াশ সাপে ছোবল দিয়েছে। স্ত্রীকে বেশি উদ্বিগ্ন হতে দেখে বলল- এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। দাঁড়াশ সাপের বিষ থাকে না। দেখ, আমার কিছুই হবে না।

স্বামীর এমন কথাও স্ত্রী মানতে নারাজ। সে পাশের বাড়ির মজুমদার ওঝাকে এনে দ্রুত তার বিষ নামাল। এরপর দৃঢ় মনোবল নিয়ে লোকটি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে থাকল।

সাতদিন পর দাঁড়াশ সাপটি গোখরাকে ডেকে বলল- কই তোমার ছোবলে তো ছেলেটি মরেনি। এক সপ্তাহ পরও সে দিব্যি বেঁচে আছে। বলেছি না, তোমার ছোবলে লোকে মরে না। মরে তাদের মনের ভয়ে।

গোখরা সাপটি মাথা নিচে নামিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল- তাই তো দেখছি। তোমার তো বিষ নেই। দেখি, এবার তোমার ছোবলে কী হয়?

– আচ্ছা, দেখা যাক।

এরপর আগের মতো করে পাশের গ্রামের আমন্ত্রিত বিচারক সাপ ও দর্শকের উপস্থিতিতে দাঁড়াশের পালা এল। দাঁড়াশ ও গোখরা মেঠোপথের একপাশে ঘন ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে রইল। অন্য সবাই পাশের ঝোপে লুকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর সেই পথ দিয়েই হেঁটে আসতে লাগল মায়ের গায়ে হাত তোলা ছেলেটি। সুযোগ বোঝে দাঁড়াশ সাপটি তাকে ছোবল মেরে পাশের ঝোপে পালিয়ে গেল। আর গোখরা সাপটি শর্ত মোতাবেক তার সম্মুখে বারবার ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ছেলেটি গোখরা সাপ দেখে চিনতে পেরে খুব ভয় পেয়ে যায়। ভয় ভয় চোখে নিজের পায়ের দিকে তাকায়। পায়ে রক্তের চিহ্ন দেখে সে আরো ভয় পায়। তারপর সোজা বাড়ি এসে স্ত্রীকে সব খুলে বলে।

স্ত্রী তাকে শান্ত হতে বললে সে বলে ওঠে- তোমরা আমাকে মাফ করে দিও। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। আমাকে এবার গোখরা সাপে ছোবল দিয়েছে। এটা বিষধর সাপ। এ সাপে কাটলে মানুষ বাঁচে না। আমার মাকে একটু ডেকে দাও। আমি মায়ের সঙ্গে সে দিন খুব অন্যায় করেছি। হয়তো আমার ওপর মায়ের বদদোয়া লেগেছে। নইলে পরপর আমাকে সাপে দংশন করবে কেন? তুমি একটু মাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।

স্ত্রীও কাঁদো কাঁদো গলায় বলল- তুমি ঠিক বলেছো। আমি আম্মাকে নিয়ে আসি।

এই কথা বলে দ্রুত বাড়ির সম্মুখে পরিত্যক্ত ঘর থেকে শাশুড়িকে নিয়ে আসে সে। ছেলেকে ব্যথায় কাতরাতে দেখে মা যেন পাগলের মতো দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। সন্তানকে বাঁচাতে মায়ের আর্তনাদ দেখে ছেলেটি লজ্জায় মুখ লুকাতে চায়। মা তার পাশে বসলে মায়ের আঁচলে মুখ লুকায় সে।

ওদিকে স্ত্রী ওঝাকে আনতে চাইলে ছেলেটি তাকে বারণ করে বলে- কোনো লাভ হবে না। আমার খুব খারাপ লাগছে। এ সময় তুমি, মা আমার পাশে থাকো। তোমরা আমায় শক্ত করে ধরো। আমার খুব খারাপ লাগছে। আর পারছি না।

ছেলেটির চিৎকারে পুরো বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়।

ধীরে ধীরে এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের লোকজন খবর পেয়ে তাকে দেখার জন্য ছুটে আসে। প্রচণ্ড ভয়ে ধীরে ধীরে সে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে সে স্ট্রোক করে বসে। এক সময় নাকে মুখে ফেনা ছেড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছেলেটির আত্মীয়-স্বজনের কান্নার আওয়াজে আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

সে আওয়াজ সাপদের কানেও পৌঁছে যায়। এরপর দাঁড়াশকে দেখে মাথা নিচু করে ঝোপের দিকে চলে যায় গোখরা।

:: আফাজিয়া বাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj