প্রস্থান

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯

নাজমুল মৃধা

ওকে ভীষণ ভালোবাসি। আজ ওকে খুব মিস করছি। ও আমার কতটা জায়গা জুড়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

আমার মা আমায় অনেক বেশি ভালোবাসেন, আমিও মাকে। মায়ের কোনো কথাই ফেলে দেয়ার মতো সাহস আমার কোনোদিন হয়নি। আজো না। মা বললেন- দেখেই যা ওকে।

ওকে দেখতে যাচ্ছি শেষবারের মতো। বাসের জানালার কালো কাচের বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আকাশে মেঘ জমে নিকষ কালো হয়ে উঠেছে পৃথিবী। কালো কাচ আর মেঘের মিতালি যেন অন্ধকারের সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে। মনে হচ্ছে যেন মহাসমুদ্রের কোনো নৌকায় ভাসছি! এই নৌকা কোথাও ভিড়বে না! ওকে মনে পড়ছে ভীষণ।

নিপা আমার ছোটবেলার সাথী, বেড়ে ওঠা একইসঙ্গে। ও আমার বয়সে ছোট হলেও আমার জীবনের সেরা বন্ধু। বলা যায়- আমাদের সম্পর্ক জীবাত্মা-পরমাত্মার! আমার আত্মীয়াও সে।

বড় হতে হতে আমাদের দুজনের শারীরিক দূরত্ব বাড়লেও মনের দূরত্ব বাড়েনি। আমি ভালো ছাত্র হলেও ও ততটা মেধাবী ছিল না। তবে ওর মধ্যে আশ্চর্য কিছু ভালো গুণ ছিল।

পারিবারিক নানা সংস্কার ও বিধিনিষেধের জন্য আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুব কম পেতাম। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দুজনের পুরনো সেই বন্ধুত্বের গভীরতা থাকলেও একসঙ্গে বসে আড্ডা দেয়ার সুযোগ আমাদের দুই পরিবারই খুব কম দিত। পরে দুই বছর আমি কলেজের পড়া শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চলে আসি শহরে। এই দিনগুলোতে চুপিচুপি নিপা ওর বাবার ফোন থেকে আমায় ফোন দিত। প্রায় রাত ১১টা থেকে বারোটার মধ্যে আমার ফোনে রিংটোন বেজে উঠত। ১৫ দিনে চার/পাঁচবার আমায় ফোন দিতে পারত। আমার সঙ্গে ওর যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে ততদিনে তার বাবা-মা জেনে ফেলেছিল। এ জন্য নিপার মা ওকে সবসময় নজরে রাখত।

আমি তখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে। প্রায় ১৫ দিন নিপা আমায় ফোন দেয় না। আমি ওর বাবার ফোনে মেসেজ পাঠাতে থাকি যেন ওর দৃষ্টিগোচর হয়। তবুও নিপা আমায় ফোন দেয়নি। ভীষণ একাকিত্ব আর অস্তিরতার মধ্যে দিনগুলো কাটতে লাগল।

এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন আমার ফোনে একটা কল আসে আমার ছোট খালামনির নম্বর থেকে।

আমার কলিজাটা নাড়া দিয়ে ওঠে। ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। খালামনির ফোনটা রিসিভ করলে তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন- ‘আজ নিপার বিয়ে’। আমি আর কোনো কথা বলতে পারিনি। ফোনটা খালামনি একাই কেটে দেন।

বলা ভালো, নিপা কেবলই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে।

খালামনির ফোনে আমি একটু পরে নিজেই ফোন দেই, কিন্তু খালামনি আমার ফোনটা আর ধরেননি। একদিন… দুই দিন… তিনদিন… আমি নিপার বাবা এবং ওর ভাবির নম্বরে ফোন দেই। কিন্তু দুটো নম্বরই বন্ধ দেখায়।

এই কয়েকদিন আমার মধ্যে যা ঘটে চলেছিল তা আমি মাকেও জানতে দেইনি। তিনদিন পর একদিন সন্ধ্যায় মা আমায় ফোন দিয়ে বলল- জানিস পরশু নিপার বিয়ে হয়ে গিয়েছে! ছেলের বাবার অনেক টাকা, একটাই ছেলে। বাবা-মা মারা গেলে সব সম্পত্তি ওর।

মাকে নিচু স্বরে কেবল বললাম- ভালোই তো! নিপা ভালো থাকুক।

এই বিশ-পঁচিশ দিন নিপার সঙ্গে আমার কথা হয়নি! আমি যে দিন থেকে নিপাকে চিনি এবং নিপা আমায় চিনে সে দিনগুলোর মধ্যে এত দীর্ঘ সময় কথা হয় না, এবারই প্রথম।

খালামনির কথাটা সে দিন ততটা বিশ্বাস করিনি। কেননা খালামনি প্রায়ই আমায় এসব বলে ভয় দেখাতেন, যেন আমি নিপাকে ভুলে যাই। উফ, নিপার পাত্র আমার খালামনিরই ঠিক করা!

মা যখন বলল নিপার বিয়ে হয়ে গিয়েছে তখনো আমার মন বলছিল নিপা কেবলই আমার!

এরপর থেকে নিপাকে খুব খুঁজেছি আমার হৃদয়ে। আমার ভাঙা একটা ফোন ছিল সেই ফোনটাতে কেবল নিপাই ফোন দিত। এমনিতেও আমি ফোনে অন্যদের সঙ্গে খুব কম কথা বলতাম। এরপর থেকে ফোনটাতে আর কোনোদিন রিংটোন বাজেনি, ফোনটাও আমায় আর কোনোদিন আকর্ষণ করেনি। আজ পর্যন্তও না! আমার ব্যাগে করে আজ সেই পােনো ফোনটা নিয়ে নিচ্ছি নিপাকে দেখাবো বলে।

অবশ্য নিপার বিয়ের বয়স প্রায় পাঁচ বছর হলো। এর মধ্যে আমারও গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়ে গিয়েছে। স্কলারশিপ পেয়েছি, জার্মানি যাব আর এক মাস পর।

নিপার সঙ্গে এই পাঁচ বছর এক মিনিটের জন্যও দেখা হয়নি। অবশ্য নিপা আমার থেকে চলে যাওয়ার পর আমি এর মধ্যে বাড়িতেও যাইনি কোনোদিন। মা বুঝতেন কেন বাড়ি যাই না। মাও নিপাকে খুব পছন্দ করতেন। নিপার পরিবার ওকে জোর করে বিয়ে দেয়ার পর থেকে মা আর ওর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন না।

এবার নাকি নিপা আমায় দেখতে চেয়েছিল! আমিও জানতান নিপা আমায় দেখতে চাইবে একদিন। তবে আজ আমিই কেবল নিপাকে দেখব- ও চিরঘুমে আচ্ছন্ন, আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। ও আমাকে অনুভব করবে না! কেবল আমার বুকে রক্তক্ষরণ হবে! বিচ্ছেদের, চিরপ্রস্থানের! অথচ কথা ছিল ও ঘুমাবে আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেব আমাদের ভালোবাসার রাজ্যে।

কাল সকালেই নিপাকে সমাহিত করা হবে, শুনেছি ওর স্বামী ওর গায়ে আগুন দিয়েছিল। আমারও আগুন লেগেছে, মনে!

বাস এগিয়ে যাচ্ছে আমার গন্তব্যে।

ওকে ভীষণ মিস করছি! ভীষণ!

:: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj