পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রসঙ্গে

শনিবার, ২ নভেম্বর ২০১৯


বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর-শিলাইদহ-শাহজাদপুর এই তিনটি স্থানের মধ্যে পতিসর ছিল কবির নিজস্ব। অথচ পতিসরই আছে উপেক্ষিত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মদিবসে প্রথমবারের মতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ রবিতীর্থ পতিসর ঘুরে গেছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনে অঞ্চলের গণমানুষ, রবীন্দ্র গবেষক, সংস্কৃতিমনা মানুষরা নতুন করে স্বপ্ন দেখেছেন হয়তো এবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। তাদের চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয়করণ, পতিসরে হাসপাতাল আধুনিকীকরণ, পতিসরে বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজ জাতীয়করণ ইত্যাদি। এ নিয়ে দেনদরবার, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনে-গোলটেবিলে আলোচনার কম হয়নি।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি পতিসর ঘুরে যাওয়ার বছর পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পতিসরবাসীর জন্য ভালো কোনো খবর আসেনি। তবে আশার কথা আমাদের দেনদরবারে এলাকার প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে যাচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে আন্তর্জাতিক রবীন্দ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাজ চলছে। দশ তলাবিশিষ্ট (আব্দুস সোবাহান) একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। প্রয়োজনীয় জায়গা-জমি পতিসরে আছে। তবে ভালো হয়, এলাকার গণমানুষের স্বার্থে তাদের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর উচিত একযোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়ে রবিতীর্থ পতিসরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা। হয়তো তাদের কথা আমলে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পতিসর রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারেন।

১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি কবিগুরু পতিসরে পা রেখেই শিক্ষা বঞ্চিত, হতদরিদ্র মানুষের কথা ভেবে তাদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে এমই স্কুল স্থাপন করে এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন। মাটির দেয়ালের টিন টালির ছাউনিতে স্কুলটির যাত্রা। শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, উপদেশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং শিলাইদহ ও কালীগ্রামে হাতে-কলমে এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন (রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল, পৃষ্ঠা ৩১২)। ১৯০৫ সালে ভারতে স্কুল-কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা, গ্রামাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু বইপত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন পতিসরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামাঞ্চলের মানুষকে যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবে পরিণত হলো স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শাহাজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। খবরটা আমাদের জন্য আনন্দের এবং গর্বের। অপরদিকে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে কবির নিজস্ব জমিদারি পতিসরে আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হয়নি বলে। সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং এ বিষয়ে তাদের যথেষ্ট যুক্তি আছে। ‘শিলাইদহ-শাহাজাদপুর-পতিসর- পূর্ববঙ্গের এই তিন এলাকার জমিদারি কর্মসূত্রে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ও অবস্থানের কথা আমাদের জানা আছে কিন্তু জানা হয়নি কবির কর্মভূমি কীভাবে তার মানুষ ভূমির গড়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল সেটা গভীরভাবে তলিয়ে দেখা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের পরিব্যাপ্ত শিল্প মানস ও জীবনবোধ বুঝার জন্য তার জীবনের এই পর্বের গভীর অনুধ্যান দরকার। এক্ষেত্রে শিলাইদহ শাজাদপুরের ওপর গবেষক, বিশ্লেষক, রবীন্দ্র গবেষকদের গভীর দৃষ্টিপাত ঘটলেও পতিসর ছিল বরাবরই উপেক্ষিত’ (রবিতীর্থ পতিসর আহমদ রফিক)। অথচ এই পতিসরই রবীন্দ্রনাথের পল্লীচিন্তা, শিক্ষা ভাবনা ও স্বদেশ ভাবনার আশ্চর্য সংহতি অর্জন করেছিল কিন্তু রবীন্দ্র গবেষণার অকরুণ পরিণতির ফলে আমরা পতিসরকে জানতে পারিনি। দেশের সত্যিকারের রূপটি কবে যে পতিসরে এসে খুঁজে পেয়েছিলেন তাও আমাদের জানার বাইরে। পতিসরে ঘটেছিল কবিসত্তা ও কর্মিসত্তার এক ভিন্নতর উদ্ভাসন, জমিদার রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ।

১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারদিকে ঘুরেফিরে বেড়িয়েছেন, যেমন নাগর নদীতে ভেসে তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আশপাশে হেঁটে। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে, তাই তাকে বলতে শুনি ‘তোমরা যে পার যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার-সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো’ (রবীন্দ্ররচনাবলি ১০ম খণ্ড পৃ. ৫২০-২১)। এ প্রভাব তার মানবিক চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেই সম্ভবত তাকে সাধারণ মানুষের, দুস্থ গ্রাম্য চাষির জটিল সমস্যা জীবনের গভীরে নিয়ে গেছে স্বাভাবিকতায়।

এমনি এক আত্মিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চরম সত্য উপলব্ধি করে বুঝতে পারেন এই এলাকার প্রজা-চাষিদের দুঃখ-দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা। অন্যদিকে নিজ জমিদারি কালীগ্রামের সহজ-সরল অল্প আয়ের স্বল্প শিক্ষিত মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্য দিয়ে কবি লিখেছেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট-সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষি প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক’ (ছিন্নপত্রাবলি ১১১ সংখ্যক চিঠি)। সেই উপলব্ধি থেকে প্রায় ২০০টি গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা এবং ৩টি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই অঞ্চলের শিক্ষার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

পাশাপাশি স্বাস্থসেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপন অর্থাৎ সমাজ সংস্করণ। আজ থেকে শত বছর পূর্বে পল্লীগঠন, গ্রামোন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসসূচির গোড়াপত্তন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কাজটা শুরু করেছিলেন নিভৃত পল্লী পতিসরে। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করে গরিব চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে দাসত্ব গোলামির জিঞ্জির থেকে কৃষককে মুক্ত করার যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তা তো তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ‘১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, তাদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর’ (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃ. ৪৬২)। আধুনিক চাষাবাদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, খামার ব্যবস্থাপনা, হস্ত ও কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যে ঋণ কর্মসূচি বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের গ্রামোন্নয়ন ও মহাজনকে এলাকা ছাড়ানো। তাই ঘটেছিল মহাজনরা এলাকা ছাড়ল কৃষক ও কৃষির উন্নতি হলো। মোট কথা, তার সাহিত্য সৃষ্টি যেখানে গ্রামের ধুলো কাদা মাটির স্পর্শ নিয়ে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ভালোবাসা দেশপ্রেম প্রতিফলিত হয়েছে, যে মাটির মাঝে মায়ের অস্তিত্ব কল্পনা করে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে স্বর্গকে কল্পনা করেছেন, সেখানে পতিসরের দানই প্রধান। আর সৃষ্টি কর্মের প্রসঙ্গ বাদ দিলে পতিসরের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় এ জন্য যে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সাধনার বাইরে পল্লী পুনর্গঠন কর্মকাণ্ডে যা কিছু সাফল্য তা এই পতিসরে।

এম মতিউর রহমান মামুন : রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

কতিপয় ছাত্র এমন উচ্ছৃঙ্খল হয় কেন?

Bhorerkagoj