সৃজনে দর্শনে ঋত্বিক ঘটক এখনো অনন্য

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

অনুপম হাসান

ঋত্বিক ঘটকের (১৯২৫-৭৬) জন্ম ঢাকায়; শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষানগরী রাজশাহীতে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি ময়মনসিংহ মিশন স্কুলে পড়া-লেখা শুরু করলেও পিতা সুরেশচন্দ্র ঘটকের বদলির চাকরির কারণে কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি হন। পরে রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজিয়েট স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁকে তৎকালীন শিল্পাঞ্চল খ্যাত কানপুরের টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করা হয়। এখানে তিনি ঐ বয়সেই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, ওভার টাইম শ্রমের পারিশ্রমিক প্রভৃতি আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ফলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাঁকে কলকাতার পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশনে ভর্তি করে দেয়া হয়। ঋত্বিক এখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। ১৯৪১ সালে তিনি পরিবারের সাথে পুনরায় রাজশাহী আসেন। এখানে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষা দেন। পরে কে এম কলেজ থেকে ১৯৪৮ সালে তিনি বিএ পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েছিলেন বটে কিন্তু পরীক্ষা দেয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। ১৯৪৮-৫১ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাথে ঘনিষ্ঠসূত্রে সম্পৃক্ত থেকে নাটক লিখেছেন এবং অভিনয়ও করেছেন। বলার অবকাশ রাখে না, ঋত্বিক ঘটক ছিলেন নানাগুণে ঋদ্ধ সংস্কৃতিমনা মানুষ। আজকের ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্রকার হিসেবেই পরিচিত হলেও তিনি শুরু করেছিলেন অসংখ্য বাঙালি লেখকের মতো কবিতা দিয়ে শিল্পচর্চা। তবে তিনি দ্রুতই নিজেকে গল্প মাধ্যমে আবিষ্কার করেন।

১৯৪৭-৪৮ সময়পর্বে তাঁর লেখা অনেক গল্প ‘শনিবারের চিঠি’, ‘গল্পভারতী’, ‘অগ্রণী’, ‘নতুন সাহিত্য’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং তিনি পাঠকমহলেও গল্পকার হিসেবে প্রশংসিত হন। কিন্তু ঋত্বিকের শিল্পাত্মা ছোটগল্পের সীমায় নিজেকে পূর্ণ প্রকাশ করতে না পেরে নাট্যরচনায় ঝুঁকে পড়েন। ১৯৫০ সালে ঋত্বিক তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জ্বালা’ শীর্ষক নাটক রচনার মধ্য দিয়ে ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থান করেন। এছাড়া ঋত্বিক অভিনয় করেন উৎপল দত্তের পরিচালনায় শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ এবং ‘বিসর্জন’ ছাড়াও পানু পালের ‘ভোটের ভেট’ শীর্ষক নাটকে। তাঁর লেখা ‘দলিল’ শীর্ষক নাটকটি গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় বোম্বে সম্মেলনে প্রথম পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়াও তিনি ‘সাঁকো’ ও ‘সেই মেয়ে’ শীর্ষক দুটো নাটক রচনা করে মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত শোষিত শ্রেণির মানুষের চালচিত্র উপস্থাপন করেন। নাট্যরচনার সময় তিনি ঘনিষ্ঠভাবে অভিনয়ের সাথেও জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর মনে হয়, বক্তব্যকে আরো বড় ক্যানভাসে উপস্থাপনের উৎকৃষ্ট মাধ্যম হতে পারে চলচ্চিত্র। কেননা শিল্পের আর কোনো মাধ্যমই চলচ্চিত্রের মতো সর্বগ্রাসী ও বিশাল প্রেক্ষাপটের নয়। ফলে তিনি পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ‘তথাপি’ (১৯৫০) চলচ্চিত্রের সহকারী পরিচালক হিসেবে তিনি শিল্পের এই মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন।

তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে ব্যয়িত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও ঋত্বিক ঘটক ৭টি চিত্রনাটক রচনা করেছিলেন অন্য পরিচালকদের জন্য। অভিনয় করেছেন ৫টি চলচ্চিত্রে।

জীবনের নানা সময় তিনি ২১টি চলচ্চিত্রের চিত্রনাটক বা এর খসড়া তৈরি করেছিলেন, যা কখনো পূর্ণ চলচ্চিত্রের রূপ পায়নি। তা ছাড়া চলচ্চিত্র বিষয়ে তিনি ইংরেজি ও বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছিলেন। ‘নাগরিক’ (১৯৫২-৫৩) ঋত্বিকের নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলেও এটি মুক্তি লাভ করেছিল তাঁর মৃত্যুর পর। তবে তাঁর পরিচালিত ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮) মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি চলচ্চিত্র বোদ্ধামহলে নন্দিত হন চলচ্চিত্রকার হিসেবে। ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে : ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩), ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪)। ঋত্বিক জীবনব্যাপী শিল্পমাধ্যমে নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত-বঞ্চিত এবং সমাজের অপাঙ্ক্তেয় মানুষের কথা প্রকাশের ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, তিনি শিল্পের মাধ্যম বদলেছিলেন শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার জন্য। ঋত্বিক মনে করতেন, তাঁর কথা তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই সর্বাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন। চলচ্চিত্র নির্মাণে ঋত্বিক ঘটক বিস্ময়কর যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তারই ছাপ পাওয়া যায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে। ঋত্বিক ঘটক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ শীর্ষক চলচ্চিত্রের কাহিনী গ্রহণ করেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস থেকে।

বাংলাদেশের নদী তীরববর্তী জেলে সম্প্রদায় ‘মালো’দের জীবনভাষ্য ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। এ চলচ্চিত্রে উপন্যাসের ঘটনাকে পরিচালক ঋত্বিক নদীর সমান্তরালে একটি সম্প্রদায়ের মানুষের অসহায়ত্ব, তাদের যাপিত জীবনের ইতিকথা বয়ন করেছেন। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো ‘দুঃসহ সমাজবাস্তবতা তুলে ধরে তিনি প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রেই মানুষের মঙ্গল কামনা করেছেন। সব পরাজয়, ব্যর্থতা ও ধ্বংসের পরেও প্রাণ ও সভ্যতার প্রবহমানতার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন সব সৃষ্টিতে, সব সমাপ্তির শেষে।’ তিতাস নদীর তীরবর্তী গ্রামের জেলেপাড়ায় জীবন বাস্তবতার পটভূমিতে গড়ে ওঠা চলচ্চিত্রের ঘটনায় তিতাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে তিতাসের সাথে তার পারের জেলে সমাজের ভাগ্যও জড়িত। জেলে সম্প্রদায়ের যে সভ্যতা এবং সংস্কৃতি তা তিতাসকে ঘিরেই বিকশিত এবং পরিবর্তিত হয়েছে। তিতাস শুকিয়ে গেলে এর পারের জেলেদের জীবনেও নেমে আসে বিপর্যয়। অসামান্য দক্ষতায় এ চলচ্চিত্রে পরিচালক ঋত্বিক ঘটক তিতাস নদীপারের জেলেদের জীবন, আশা-আকাক্সক্ষা, সংগ্রামের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। ঋত্বিক তাঁর সব চলচ্চিত্রেই সমাজজীবনের সত্যস্পর্শী ঘটনা সেলুলয়েডের ফিতাবন্দি করেছেন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj