ঋত্বিক ঘটক : চলচ্চিত্রের ধ্রæবতারা

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

ইরা সামন্তঠোঁটে পাতার বিড়ি আর হাতে বাংলা মদের বোতল। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, গালভরা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে ধূলিমলিন পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা কিন্তু সে চোখে কৌতুক মেশানো ধারালো দৃষ্টি। ‘তিনি কে’ এই প্রশ্ন কেউ করলে কোনোরকম হেঁয়ালি না করেই সরাসরি জবাব দিয়ে দেবেন- ‘আমি এক মাতাল। ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’। নিজের নির্মিত সিনেমার মধ্য দিয়ে নিজেকে এভাবেই দেখিয়েছেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক।

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এবং জীবনমুখী সাহিত্য ধারায় ঋত্বিক ঘটক এক বিশিষ্ট শিল্পী। তার কর্ম ও সৃজনক্ষেত্রের পরিধি কেবল চিত্র পরিচালনা ও কথাসাহিত্যে নয়, এসবের পাশাপাশি ভারতের পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘকাল। প্রথম জীবনে কবি ও গল্পকার তারপর নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, অবশেষে চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

ঋত্বিক ঘটকের লেখাপড়া শুরু হয় ময়মনসিংহের মিশন স্কুলে। পরবর্তী সময়ে কলকাতার বালিগঞ্জ স্কুলে তিনি ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন কোর্স সম্পন্ন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু এমএ সম্পূর্ণ না করেই তিনি পত্রিকায় লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন। কারণ তাঁর কাছে ডিগ্রির চেয়ে লেখক হওয়া বেশি জরুরি ছিল। সে সময় তিনি দেশ, শনিবারের চিঠি, অগ্রণী বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির কাজ শুরু করেন।

পত্রিকার পাশাপাশি মঞ্চ নাটককে তিনি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রথম নাটক লিখেন ‘কালো সায়র’। ১৯৫১ সালে ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। তিনি অসংখ্য নাটক রচনা করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন এবং অভিনয়ও করেছেন।

১৯৫২ সালে তিনি ‘দলিল’ শিরোনামে একটি নাটক নির্মাণ করেন; নাটকটি ১৯৫৩ সালে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন এক্সিবিশনে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটকের আবির্ভাব পরিচালক নিমাই ঘোষের হাত ধরে।

১৯৫০ সালে এ পরিচালকের বাংলা সিনেমা ‘ছিন্নমূল’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক ঘটে তার। চলচ্চিত্রটিতে তিনি একইসঙ্গে সহকারী পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন। বাংলা সিনেমায় বাস্তবতা প্রদর্শনের চলচ্চিত্রিক ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা। দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে শরণার্থী হয়ে কলকাতায় চলে আসা একদল কৃষকের গল্পই এই ছবির বিষয়বস্তু। এই সিনেমায় শিয়ালদহ রেলস্টেশনকে লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এখান দিয়েই দেশভাগের পরবর্তী সময়ে শরণার্থীরা শহরে প্রবেশ করত।

১৯৫১ সালে ঋত্বিক ঘটক প্রথমবারের মতো পরিচালকের দায়িত্ব পান। বেদেনী নামের এই সিনেমাটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে, কিন্তু স্টুডিওতে আগুন লেগে যাওয়ায় পরবর্তীতে মূলত অর্থনৈতিক কারণে সিনেমাটির শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। নির্মল দে’র পরিচালনায় এটি নির্মিত হচ্ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নাগিনী’ নামের ছোটগল্প থেকে। পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর ঋত্বিক এর গল্প ও চিত্রনাট্য নতুন করে লেখেন এবং নাম দেন অরূপ কথা। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে প্রায় ২০ দিন ধরে শুটিং করা হয় কিন্তু ক্যামেরার যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে ফিল্ম এক্সপোজ না হওয়াতে সিনেমাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

ঋত্বিকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’ ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায়। সুবোধ ঘোষের একটি ছোটগল্প থেকে তিনি এটা নির্মাণ করেন। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সৃষ্ট সম্পর্ক নিয়েই তৈরি এই সিনেমাটি। এতে দেখানো হয় : বিমল নামের ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের একজন ট্যাক্সিচালককে। এ জগতে আপন বলতে তার আছে শুধু ১৯২০ সালের একটি পুরনো ট্যাক্সি, যাকে সে আদর করে নাম দিয়েছে জগদ্দল। জগদ্দলকে সে যন্ত্র বলে মেনে নিতে নারাজ, তাই সে বলে, ‘জগদ্দলও যে একটা মানুষ, সেটা ওরা বোঝে না’। জানা যায়, যে বছর বিমলের মা মারা যায়, সে বছর থেকেই জগদ্দল বিমলের সঙ্গে আছে। জগদ্দল যেন তার মায়ের মতো, অসময়ে-দুর্দিনে বিমলকে আগলে রাখে। কিন্তু যন্ত্রেরও দিন ফুরায় একদিন, মানুষের মতোই থেমে যায় তার হৃদস্পন্দন। অসহায় বিমলের সামনে দিয়ে জগদ্দলকে ভেঙেচুরে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যায় লোহালক্কড় ব্যবসায়ীরা। এ সময় ফ্রেমে গোরস্থানের ক্রুশ দেখিয়ে যেন যন্ত্রের শবযাত্রার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন ঋত্বিক। আশা-ভরসাহীন বিমলের সামনে যখন হতাশার অন্ধকার, তখনই ঋত্বিক তার বৃত্ত সম্পূর্ণ করেন। বিমলকে অবাক করে দিয়ে একটি শিশুর হাতে ভাঙা গাড়িটির পরিত্যক্ত হর্নটি বেজে ওঠে। এই ঘটনাটি সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে, একটি নতুন শুরুর কথা ঘোষণা করে যেটা শেষ দৃশ্যে বিমলের অভিব্যক্তিতে সঞ্চারিত হয়।

সেসময় পুরো ভারত জুড়েই অন্যরকম আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এই সিনেমাটি। অযান্ত্রিক প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘ঋত্বিক ঘটকের দ্বিতীয় ছবি অযান্ত্রিক যারা দেখেছিলেন, তারা ঋত্বিকের অসামান্য বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকতার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়েছিলেন’।

ঋত্বিক ঘটকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’ হলেও প্রথম নির্মিত চলচ্চিত্র কিন্তু এটি নয়। ঋত্বিক ঘটক নির্মিত প্রথম সিনেমা নাম ‘নাগরিক’। ১৯৫২ সালে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল তার মৃত্যুর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে।

ঋত্বিক ঘটক তার জীবনের প্রত্যেকটি নির্মাণই করেছেন নিজের সবটুকু দিয়ে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম। কিন্তু তা হয়ে উঠলো না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হয় বাঁচব, না হলে বাঁচব না। তবে এই ভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না।’

অযান্ত্রিকের পর তিনি একে একে নির্মাণ করেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’।

তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখাকে বাংলা চলচ্চিত্রে আলাদা মর্যাদা দেয়া হয়। এই তিনটি চলচ্চিত্রকে ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ আর ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পরে শরণার্থীদের অস্তিত্বের সংকট তার এসব চলচ্চিত্রে উপস্থিত ছিল। শরণার্থীদের আশ্রয় নেয়া কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রূঢ় বাস্তবতাই মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখায় চিত্রিত হয়েছে। তবে কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখার ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে ষাটের দশকে আর কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এ সময় ঋত্বিক ঘটক স্বল্প সময়ের জন্য পুনেতে বসবাস করেন। ১৯৬৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি সেখানকার ভাইস-প্রিন্সিপাল হন। এখানে থাকা অবস্থায় তিনি শিক্ষার্থীদের নির্মিত দুটি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত ছিলেন।

এর প্রায় এক যুগ পর ১৯৭২ সালে আবার চলচ্চিত্রে ফেরেন তিনি। এ সময় তিনি অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন করেন। ১৯৭৩ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। আর ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। কাহিনীর ছলে তিনি নিজের কথা বলে গেছেন এ ছবিতে। ছবিটিতে নিজের রাজনৈতিক মতবাদকেও দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। যুক্তি তক্কো আর গপ্পোকে ঋত্বিকের আত্মজীবনীমূলক সিনেমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সুবর্ণরেখার পর থেকেই ঋত্বিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন। দীর্ঘদিন তিনি কোনো কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না। হতাশার কারণে বাড়তে থাকে মদ্যপান। সাথে সাথে স্বাস্থ্যও খারাপ হতে থাকে। এক সময় আর কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। তারপরও তিনি শেষ দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। তার সমালোচকরা বলতেন, ঋত্বিক সিনেমার নেশায় কি পড়বে? বাংলা মদ আর বিড়ির ধোঁয়ার নেশায়ই তো বুঁদ হয়ে আছে। তবে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা তাকে বরাবরই সমীহ করতো।

১৯৬৯ সালে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৫ সালে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ কাহিনীর জন্য ভারতের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

পরিচালনার পাশাপাশি তিনি কাহিনী ও চিত্রনাট্যতেও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যে সিনেমাগুলোর চিত্রনাট্য লিখেছেন সেগুলো হলো : মুসাফির (১৯৫৭), মধুমতী (১৯৫৮), স্বরলিপি (১৯৬০), কুমারী মন (১৯৬২), দ্বীপের নাম টিয়ারং (১৯৬৩), রাজকন্যা (১৯৬৫) ও হীরের প্রজাপতি (১৯৬৮)।

সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি বেশকিছু শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন ঋত্বিক ঘটক। তার নির্মিত শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্রগুলো হলো : দ্য লাইফ অফ দ্য আদিবাসিজ (১৯৯৫), প্লেসেস অফ হিস্টোরিক ইন্টারেস্ট ইন বিহার (১৯৫৫), সিজার্স (১৯৬২), ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান (১৯৬৩), ফিয়ার (১৯৬৫), রঁদেভু (১৯৬৫), সিভিল ডিফেন্স (১৯৬৫), সায়েন্টিস্টস অফ টুমরো (১৯৬৭), ইয়ে কওন (হোয়াই/দ্য কোয়েশ্চন) (১৯৭০), আমার লেলিন (১৯৭০), পুরুলিয়ার ছৌ (দ্য ছৌ ড্যান্স অফ পুরুলিয়া) (১৯৭০), দুর্বার গতি পদ্মা (দ্য টার্বুলেন্ট পদ্মা) (১৯৭১)।

ঋত্বিক ছিলেন সিনেমার বিপ্লবী। সিনেমা বানানো তার কাছে শুধু শিল্প ছিল না, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এবং দুখী মানুষের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশের মাধ্যম। রঙিন কোনো অবাস্তব চমক তিনি দেখাতে চাননি, বরং নিজের চোখে যা প্রত্যক্ষ করেছেন সেটাই দর্শককে দেখাতে চেয়েছেন। নিজে ভেবেছেন, আমাদেরও ভাবাতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অভাব-অনটন, ঝড়-ঝঞ্ঝা ছিল, কিন্তু তিনি নিজের দর্শনের সঙ্গে আমৃত্যু আপস করেননি। কাজের স্বীকৃতি সীমিত হলেও তিনি তার সৃষ্টির তাড়না থেকে বিচ্যুত হননি কখনো।

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম ধ্রæবতারা বলা হয় ঋত্বিক ঘটককে। তিনি জনপ্রিয়তার মোহে চলচ্চিত্র তৈরি করেননি। কাজ করেছেন নিজের মতো করে। বাঙালির জনজীবনের অসাধারণ রূপকার হিসেবে তিনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj