শব্দকুঠি জন্মেই আওয়াজ দিলো আগামীর

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

‘‘শব্দকুঠি’ সদ্য-জন্মা শিল্প সাহিত্যের ত্রৈমাসিক ছোট কাগজ। জন্মের বয়স গুনলে জুলাই-২০১৯-এ আলোর মুখ দেখা কাগজ (লিটলম্যাগ) এটি। রুকসানা রহমান সম্পাদিত বর্ষ-০১, সংখ্যা-১। বয়সে বা প্রকাশে নবীন ‘শব্দকুঠি’ জন্মেই আওয়াজ দিলো আগামীর। কাগজটিতে নতুনের কাঁচা-রঙ ছাপিয়ে প্রবীণ-পক্বতার দেখা মিলে প্রতিটি পর্বে। ‘এটি একটি নতুন ছোট কাগজ’ এই ধারণাটি মাথায় না নিয়ে পড়তে শুরু করলে ধারণা করাই কষ্ট হয়ে যায়- কাগজটি নতুন না পুরাত! জানি, পাঠক মাত্রই নতুন না পুরাতন, নবীন না প্রবীণ এত সব ভাবনায় নিয়ে পাঠ গ্রহণ করেন না। যিনি পাঠক তিনি পাঠ করেন আগে, তারপর গুণ বিচার করেন- মানহীন না মনোত্তীর্ণ। বাজারে ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ একটি-দুটি-তিনটি নয়, শতাধিক লিটলম্যাগের মধ্য থেকে সত্যি কঠিন এ কথা বলা যে, এই কাগজটি ভালো, ওই কাগজটি খারাপ। ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ আন্দোলন আমাদের দেশে বা অঞ্চলে এখনো শেষ হয়নি। এখনো এর পায়ের নিচে তৈরি হয়নি শক্ত পাটাতন। তাই চেষ্টাটাও ফুরায়নি। যে যার মতো করে উত্তীর্ণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেধা-যোগ্যতা-বিচক্ষণতা-সাহস মিলিয়ে; তবে পাস করা কতটা হয়ে উঠছে তা একবাক্যে বলে দেয়ার সময় হয়নি এখনো। কারো কারোটা ভালো। কারো কারোটা মন্দ। কারো কারোটা ভালো ও মন্দের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ধারাকে ভেঙে নতুনত্ব নিয়ে অগ্রে উজ্জ্বল হওয়ার ক্ষেত্রে পারঙ্গমতা দেখাতে কিছুটা অপারগ অধিকাংশ। কারো কারোটা যে আবার অনেক দূর এগিয়ে গেছে সে কথাটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রচেষ্টার ঘাটতি নেই একবিন্দু, ভালোবাসার কমতি নেই কোথাও। যার যা আছে তাই দিয়ে সাহিত্যের মিছিলকে এগিয়ে নেয়ার প্রাণপণ কাজ করে যাচ্ছেন তারা। সেখানেও হয়তো ছোট ছোট কিছু ফাঁক আছে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও সাহসের নিষ্ঠ এ কর্মকাণ্ডকে স্যালুট জানাতেই হয়। বর্তমানে আধগলা সময়ে হাজার হাজার তারুণ্য, যুবক যখন মোটা মোটা টাকা খরচ করে নেশা আর নষ্ট চর্চার ভেতর প্রবেশ করে উড়িয়ে দিচ্ছে জীবন তখন সাহিত্য-প্রেমের কিছু তরুণ তথা মানুষ যখন চা-পান-সিগারেট-হুইস্কি-ভোতকা না ছুঁয়ে কষ্টের টাকা জমিয়ে শুধু সাহিত্য আর সাহিত্যের গতিশীলতা বজায় রাখতে ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছেন নিভৃতে তখন ভালো-মন্দের বিচার অনেক পরে, সর্বাগ্রে সাধুবাদ নবজাতক ‘শব্দকুঠি’ ও এর সম্পাদক ‘রুকসানা রহমান’-এর মতো নবীন ও প্রবীণ সম্পাদকদের প্রতি। শ্রদ্ধা অবিরত। তবুও যেহেতু শিল্পের চর্চা সেহেতু কিছু দাবি থাকে, কিছু দায় থাকে। কেননা, শিল্প ও সাহিত্যের শ্রম তো দায়ের শ্রম। ‘শব্দকুঠি’ সাহিত্যের ত্রৈমাসিক লিটলম্যাগটি পাঠ শেষে উপলব্ধি নিংড়ে বলা যায়- লিটলম্যাগটির সুযোগ ছিল আরো ভালো করার, সুযোগ ছিল বিষয়ের মান নির্বাচনে আরো সতর্ক থাকার, সুযোগ ছিল প্রতিটি লেখার ভেতর প্রবেশ করে আরো সম্পাদনার। হয়তো সুযোগ ছিল লেখাও নির্বাচনের। সবগুলো লেখা তাই বলে মানে দুর্বল সে কথা মোটেই না। কেননা, মজিদ মাহমুদ-এর প্রবন্ধ ‘বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ’ না পড়লে জানা হতো না জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর সম্পর্ক ও জীবনানন্দ দাশের উদয় পেছনে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবসহ আরো অনেক অজানা বিষয়। জানি না, প্রবন্ধটি এটাই প্রথম প্রকাশ কিনা, যদি হয় তবে পাঠক এই দুই লেখকের মধ্যকার এক নতুন জানা-শোনাকে আবিষ্কার করবে। হাসানুজ্জামানের ‘লোক কবি পাগলা কানাই ও তাঁর রচিত ধুয়া গান’ প্রবন্ধে ‘ধুয়া’ গানের অতীত, বর্তমান ও লোক কবি ‘পাগলা কানাই’র সৃষ্টির জগৎ সম্পর্কে জানা যায়; যা আধুনিক সময়ে পিছিয়ে পড়া সঙ্গীতের অবয়বকে স্পষ্ট করে নতুন প্রজন্মের কাছে। এই প্রাবন্ধিক চমৎকার করে ফুটিয়ে তুলেছেন ধারাটিকে। জানিয়েছেন না-জানা নানান দিক। ‘ওমর আলীর সংলাপধর্মী কবিতা’ এই প্রবন্ধটিও বিজ্ঞ প্রাবন্ধিক, গবেষক আশরাফ পিন্টুর বয়ানে উঠে এসেছে পারিপাটিভাবে। সারাংশ রূপে বলা যায়- প্রবন্ধটি থেকে কবি ‘ওমর আলী’কে যেমন জানা যায় তেমনি তার ভিন্ন আঙ্গিকের সংলাপধর্মী কবিতার গড়ন-গঠন সম্পর্কেও পাওয়া যায় আভাস, চেনা যায় নিভৃতচারী নিষ্ঠ এই কবিকে। অন্যদিকে কবি ‘আবিদ আজাদ’কে নিয়ে অর্থাৎ তার কবিতা নিয়ে কবি ‘মামুন মুস্তফা’র কম কথায় বিশদ আলোচনা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে সাধারণ দৃষ্টির বাইরে আরেক ‘আবিদ আজাদ’কে দেয়া যায়। মামুন মুস্তফার পাঠের গভীরতা থেকে যেমনভাবে কবি ‘আবিদ আজাদ’কে তুলে আনা হয়েছে তা কেবল সিদ্ধতা ছাড়া গা-ভাসানো পাঠ থেকে পাওয়া সম্ভব নয় বলে ‘আবিদ আজাদ এক গায়ক পাখির নাম’ প্রবন্ধটি আসলেই মন ভরিয়েছে। শিশির মল্লিক-এর প্রবন্ধ ‘শিল্প সমালোচনার দৃষ্টিকোণ- প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ প্রবন্ধটি কয়েকবার পাঠ ছাড়া বোধে নেয়া কঠিন, তবে পাঠ শেষে পাঠক-ভাবনাকে খুশি করে। ‘ফকির লালন সঁইিজীর দেহতত্ত্ববাদ : ধারণার অস্পষ্টতা’ অনুপম হীরা মণ্ডলের রচনাটি (প্রবন্ধ) অমায়িক লাবণ্য নিয়ে শুরু হলেও শিরোনামের দ্বিতীয় অংশের নামটির মতোই শেষ হয়। শেষের দিকে বারবার ঘুরেফিরে একই কথা টেনে যেন স্পষ্ট করতে যেয়ে অস্পষ্টতাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বেশি; অজান্তে।

প্রবন্ধগুলোর বাইরে, কিছু ব্যতিরেকে তেরটি কবিতায় বা পাঁচটি গল্পে সম্পদক ‘রুকসানা রহমান’র বিচক্ষণতা চোখে পড়ে। মুক্ত গদ্যেও ডুবে যাওয়ার মতো আছে মোহ। গ্রন্থ আলোচনায় বানান বিভ্রাট চোখে পড়ে দু’এক জায়গায়। প্রথম প্রকাশ হিসাবে ‘শব্দকুঠি’কে পাশ কাটার মতো মনে করি না; এই লিটলম্যাগটিকে বুক-সেল্ফের সামনের সারিতে না হোক, সামনের সারির পাশে তুলে রাখা যায় শুধু প্রবন্ধ ক’টির জন্যই। …কবিতা বা গল্প আমরা বেশি পড়ি বলে, পড়তে যেয়ে পূর্বপাঠের অতিক্রম কিছু না পেলে তার গুণ-গাইতে খটকা লাগে- এখানেও তাই। তবে এক পাঠকের পাঠোক্তি মানেই তা সব পাঠকের- তা কিন্তু নয়! এই পাঠকের যা ভালো লাগলো অন্য পাঠকের তা মন্দ লাগতে পারে; এই পাঠকের যা অতিভালো লাগলো না, তা অন্য পাঠকের কাছে খুব ভালো লাগতে পারে- এটা পাঠক মাত্র স্থান, সময়, পরিস্থিতি, মন, মর্জির ওপরও অনেক সময় নির্ভর করে।…ওই যে প্রথম বলেছি চেষ্টার কথা! চেষ্টার ত্রুটি চোখে পড়েনি নবজাতক হিসেবে তবে সময় পেরিয়ে আজকের শিশুটি দিন থেকে দিনে শিশু ও কৈশোরতা পেরিয়ে যৌবনতায় পরিপক্ব হয়ে প্রবীণ বৃক্ষ-রূপে ছায়া ছড়াবে সেটা আশা। অতিশেষে এই বলা যায়, একটি গ্রন্থের সবক’টি রচনা মনোপূত হয় না বেশির ভাগ সময় কিন্তু দুচারটি লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উজিয়ে থাকে; এই লিটলম্যাগ ‘শব্দকুঠি’রে তা আছে। আছে প্রবন্ধে, আছে কয়েকটি কবিতায়, দু’একটি গল্পে; যা পাঠকের মনের কোণে আটকে থাকবে অনেক দিন।…এই আটকে থাকাটাই ম্যগাজিনটিকে এগিয়ে নেবে অনেকদূর; সে সম্ভাবনা দেখা যায় বলেই ভালোলাগার অনুভূতিটুকু প্রকাশ করা মাত্র। শুভ হোক ‘শব্দকুঠি’-এর ও সমকক্ষ পরিশ্রমের।

শব্দকুঠি (লিটলম্যাগ), সম্পাদক : রুকসানা রহমান, প্রচ্ছদ : শিশির মল্লিক, মূল্য : ৫০ টাকা।

-জুবায়ের মিলন

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj