আনোয়ারা সৈয়দ হকের

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

গ্রামগঞ্জের গভীরে

পবিত্র সরকারআমরা যারা বাংলাদেশের বাইরে থাকি এবং বাংলাদেশের সাহিত্যের অন্দরমহলের খবর তত রাখি না, তারা সৈয়দ শামসুল হককে যতটা জানি, আনোয়ারা সৈয়দ হককে- তিনি প্রয়াত সব্যসাচী স্রষ্টার সহধর্মিণী- এই সাধারণ পরিচয়ের বাইরে ততটা জানি না। আর একটু এগোলে হয়তো জানতে পারি যে, তিনি নিজের ক্ষেত্রে এক সফল মনোচিকিৎসক। সে তো হতেই পারে, অনেক লেখকের স্ত্রী নিজেও সমর্থবৃত্তি ভিত্তি তৈরি করেছেন, এমন তো প্রায়ই দেখা যায়। সে ঘটনা নিশ্চয়ই সম্ভ্রমযোগ্য, কিন্তু তা আর বেশি মনোযোগের দাবি করে না। কিন্তু যখন দেখি, তিনি নিজেও লেখিকা, গ্রন্থ প্রকাশ করছেন, তখন মনে নানা ধরনের খটকা লাগে। প্রথমত, পুরুষতন্ত্রের দুর্জয় সংস্কার থেকে ভাবি, তিনি কি তাঁর স্বামীর সঙ্গে পাল্লা দেয়ার চেষ্টা করছেন নিজের স্বাভাবিক পরিচয়ে সন্তুষ্ট না থেকে? এই সংশয় তৈরি হয় তাঁর পূর্বাপর ইতিহাস কবে থেকে তিনি লিখছেন, তাঁর লেখায় তাঁর নিজস্ব কোনো পরিচয় ফুটে উঠেছে কিনা- এসব আনুপূর্বিক বৃত্তান্ত না জানার ফলে।

দ্বিতীয় সংশয়, তাঁর স্বামী এবং অন্যান্য লেখকের সঙ্গে তুলনার অবধারিত সম্ভাবনা জেগে ওঠে- তিনি কেমন লেখেন? তা কি নিজের পায়ে দাঁড়াবার যোগ্য, নাকি তিনি তাঁর স্বামীর খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠাতে একটা ভৎবব ৎরফব নেয়ার চেষ্টা করছেন? এটাও মূলত পুরুষতন্ত্রের সংশয়। তাই সৃষ্টির যে কোনো ক্ষেত্রে মেয়েদের সমানে-সমানে পাল্লা দেয়া, কখনো পুরুষদের ছাড়িয়ে যাওয়া, একটার বাইরে একাধিক আত্মপরিচয় গড়ে তোলার ইচ্ছাকে আমরা সন্দেহের চোখে দেখি। আরো সন্দিগ্ধ হই যদি তা স্বামীর আত্মপরিচয়ের কাছাকাছি যেতে চায়। এরকম একটা মনোভাব দাঁড়ায় যে, সৈয়দ হকের স্ত্রী না হলে কোনো অসুবিধা ছিল না, তাঁকে কেউ প্রশ্ন করত না। কিন্তু যেহেতু তিনি বাংলাদেশের একজন প্রতিভাশালী স্রষ্টার স্ত্রী, তাঁর কী প্রয়োজন ছিল লেখক হওয়ার? তাঁর অধিকারের একটা সীমা আমরা বেঁধে দিতে চাই। যেন একজন প্রখ্যাত মানুষের স্ত্রী হওয়াই যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিল তাঁর পক্ষে, সফল মনোচিকিৎসক হওয়া যথেষ্টর চেয়েও বেশি। কিন্তু তারও পরে লেখক? আমরা বাইরের লোকরা তাঁর বিষয়ে নানা অজ্ঞতা নিয়ে এসব ভাবনা-বিড়ম্বনায় ভুগি। অবশ্যই বাংলাদেশের পাঠকরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানেন, তাঁরা অনেকেই অনেক আগে এসব প্রশ্ন ও সংশয়ের মোকাবেলা করেছেন এবং আনোয়ারা সৈয়দ হককে তাঁর যথাপ্রাপ্য দাবি ও মর্যাদায় গ্রহণ করেছেন। আর আমার মতো একজন গল্প-উপন্যাসের প্রান্তিক পাঠক, যে আনোয়ারা সৈয়দ হকের প্রথম গ্রন্থ হাতে নিয়েছে পাঠ এবং সমালোচনার জন্য, তার মনে এ ধরনের বহু প্রশ্ন ওঠাই তো স্বাভাবিক। অজ্ঞ লোকের নির্বোধ প্রশ্ন, কিন্তু তাও সঙ্গত উত্তর দাবি করে।

বইটি যখন পড়তে শুরু করি, তখন আস্তে আস্তে সংশয়কে ঠেলে বিস্ময় এসে জায়গা দখল করে। শেষ গল্পও মৃত্যু হচ্ছে পাপ- এ বাড়ির মালিকের দ্বারা সদ্য ধর্ষিত সতেরো বছরের কাজের মেয়ে রাহেলার ভাবনার একটু বর্ণনা পড়ি :

‘পুলিশের কথা শুনেই রাহেলার গায়ের ঘাম শুকিয়ে যায়। পুলিশ তাদের গ্রামের অঞ্জনাকে পথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রামের পথের মোড়ে মেরে ফেলে রেখে ভয় দেখিয়েছিল গ্রামবাসীদের। এই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার হাত, ওই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার বুক, এই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার পা, ওই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার পেট, এই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার ফুসফুস, ওই মোড়ে পড়ে ছিল অঞ্জনার কলিজা, এই মোড়ে পিত্তথলি, ওই মোড়ে চোখ, এই মোড়ে…। অঞ্জনা এক পুলিশের বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেয়ার অভিযোগ করায় এই ব্যবস্থা হয়েছিল তার শাস্তির। অঞ্জনা পুকুরঘাটে গোসল সারতে গিয়েছিল, তখন সেই পুলিশ…। না, রাহেলা আর ভাবতে পারে না। তার শরীর জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল। আর তার আত্মা শরীর থেকে বেরিয়ে জমাট বেঁধে যাওয়া শরীরটাকে চোখ মেলে দেখছিল। মশা ঘুরছিল সেই শরীরের ওপর, পিঁপড়ে সার বেঁধে উঠছিল, তেলাপোকারা শুঁড় নাড়িয়ে বারবার পরীক্ষা করে দেখছিল রোমক‚পগুলোকে। অঞ্জনার চেহারা ঘুরতে লাগল তার চোখের ওপর। কোথায় এখন অঞ্জনা? তারই বয়সী অঞ্জনা কোথায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল তার খণ্ডবিখণ্ড দেহটিকে? ভাবতে গিয়ে দুনিয়াটা ছোট হয়ে এলো তার। এত ছোট যেন আংটির ভেতর দিয়ে দুনিয়াটাকে এসপার-ওসপার করা যেতে পারে।’

আমি আনোয়ারা হকের অন্য কোনো বই পড়িনি, কাজেই বাংলাদেশের নিয়মিত সাহিত্যপাঠক ও সমালোচকদের তুলনায় আমার দুর্বলতা অতিশয় প্রকট। আমি অস্পষ্টভাবে জানি যে, আনোয়ারা প্রথম থেকেই গভীর সাহিত্যপ্রীতি পোষণ করেছেন এবং প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় সাহিত্যের সূত্রেই। সুতরাং তাঁর আখ্যান রচনার ভাষায় যে একটা পরিপক্বতা থাকবে তাতে, স্মৃতি হাতড়ে নানা সূত্র বের করার পরে, আমি আশ্চর্য হই না। মনে পড়ে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য রচনা করেছেন এবং নিজের ভাষাকে ক্রমাগত পরিশীলিত করেছেন। তাতে তাঁর নিজস্বতা এবং সমকালীনতার চিহ্ন একই সঙ্গে ফুটে উঠেছে। তাঁর শৈলীকে ইংরেজি ংসধৎঃ কথাটা দিয়ে বোঝানো যায়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভাবি, তার মধ্যে তাঁর চরিত্রগুলোর প্রতি যে গভীর মানবিক সহানুভূতি জড়িত আছে, ওই ংসধৎঃ কথাটায় যেন তা স¤পূর্ণ অর্থ পায় না। যেমন এই অংশে (পারুলীর উড্ডয়ন) ‘এদিকে অন্ধকার হয়ে এলো বটে চারদিক, আজন্ম বিশ্বাসঘাতক শরফু নামক স্বামীটির দেখাও নেই। সেই কোন সকালে গঞ্জে গেছে পারুলীর জন্য ওষুধ আনতে। ব্যথায় খিঁচে উঠছে এখন পারুলীর শরীর, অথচ সে একা। আর কোত্থেকে যে ঝাঁপিয়ে নেমেছে বৃষ্টি, শান দেয়া বৃষ্টির ফলা লাফিয়ে নামছে ফুটো টিনের চালে, পাগলের মতো তাথৈ তাথৈ করে শব্দ করছে, ফেটে পড়ছে অট্টহাসিতে, ঝম ঝম, গম গম, শোঁ শোঁ করছে চারদিক। অনেক কষ্টে কুপি জ্বালিয়েছিল একটা পারুলী, কখন তা নিভে গেছে। পারুলী এখন এই অন্ধকারে নিঃশ্বাসও যেন টানতে পারছে না ভালো করে। নানি, নানি বলে ডেকে কতবার যে চেঁচিয়ে গলা ভেঙেছে সে। আল্লাগো, রসুলগো বলে চেঁচিয়েছে। তার সব ডাক প্রকৃতির এই তাণ্ডবলীলার ভেতরে কোথায় হারিয়ে গেল- পারুলীই বলতে পারবে না।’ এ গ্রন্থের যে কোনো গল্প থেকে এ ধরনের উদ্ধৃতি দিয়ে ভাষার এই মানবিক উজ্জ্বলতা দেখানো যায়। কিন্তু যেহেতু আনোয়ারা সৈয়দ হকের জীবনের কেবল প্রধান ক্ষেত্রগুলোকে জানি, আমি অবাক হয়ে ভাবি যে, দীর্ঘদীন ইংল্যান্ডে বাস করা, পরে ঢাকার নাগরিকতায় যোগ দেয়া এই মানুষটি বাংলাদেশের গ্রামকে এমন করে কীভাবে জানলেন, কখন জানলেন। এবং শুধু বাইরে থেকে জানা নয়, গ্রামের আধিপত্যের যে কঠিন এক পর¤পরা আছে, তার একেবারে তলার দিকে থাকা নিরুপায় অসহায় নারী-পুরুষের দিকে তাঁর দৃষ্টি কী করে নিবদ্ধ হলো, নিজের শ্রেণির গণ্ডি পার হয়ে গিয়ে- তাও আমার কাছে আর এক বিস্ময়।

এ বই শুধু যে সাহিত্যপাঠকদের জন্য, তা আদৌ নয়। সমাজবিজ্ঞানী, সমাজকর্মীরা এ বই পড়লে উপকৃত হবেন, আরো বেশি উপকৃত হবেন প্রশাসক-রাজনীতিবিদরা। কোথায় তাঁদের কাজ করা দরকার তার একটি পরোক্ষ কিন্তু সুস্পষ্ট নির্দেশ এই গল্পগুলো থেকে উঠে আসছে। কোথাও প্রচার নেই, শিক্ষা বা উপদেশ দেয়ার চেষ্টা নেই, আছে শুধু গ্রামগঞ্জের তলবর্তী করুণ অস্তিত্বের নানা সুনির্মিত ও পাঠকের মনে বিপর্যয় জাগানো ছবি। না, প্রতিরোধ আর সংগ্রামের ছবিও কিছু আছে। এ গল্পগুলো পড়ার জন্য এবং পড়ার পরে নিছক পাঠক হয়ে আর থাকা সম্ভব হয় না; পাঠক ছাড়া আরো অনেক কিছু হয়ে উঠতে হয়। আগামী ৫ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সয়েক হকের জন্মদিন। জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj